কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলায় আবারও দেখা দিয়েছে ব্রহ্মপুত্রের তীব্র ভাঙন। এত বিলীন হয়েছে শতাধিক হেক্টর ফসলি জমি। ভাঙন হুমকির মুখে রয়েছে কয়েক শত পরিবার, ফসলি জমি, চর গেন্দার আলগা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহসরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন স্থাপনা। এতে আতঙ্কে রয়েছেন পুরো এলাকার মানুষ। ভাঙন রোধে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
স্থানীয়রা জানান, ব্রহ্মপুত্রের পানি বাড়ায় উপজেলার চরশৌলমারী ইউনিয়নের সোনাপুর, চর গেন্দার আলগা, সুখেরবাতি ও পশ্চিম খেদাইমারী এলাকায় তীব্র ভাঙন শুরু হয়েছে। গত তিন সপ্তাহে বিলীন হয়েছে প্রায় শতাধিক হেক্টর ফসলি জমি। ভাঙন আঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন নদের তীরবর্তী বাসিন্দারা। কখন যেন আবারও তাদের বসতবাড়ি নদে বিলীন হয়ে যায়। এ নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তারা। এছাড়াও দশ মাস আগে একই ইউনিয়নের সুখেরবাতি, ঘুঘুমারী, চর গেন্দার আলগা, গেন্দার আলগা, সোনাপুর, নামাজের চর এলাকার অন্তত ৭২০ পরিবারের বসতবাড়ি ও ফসলি জমি নদে বিলীন হয়ে গেছে। এতে নিঃস্ব হয়েছেন ভাঙনের শিকার ওইসব পরিবার। ঝুপড়ি ঘর তুলে রাস্তার ধারে, অন্যের জমিতে ঠাঁই নিয়ে কোনোমতে জীবন-যাপন করছেন নদী ভাঙনের শিকার ওইসব মানুষ।
স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘ দিন ধরে ভাঙন অব্যাহত থাকলেও এখন পর্যন্ত নেওয়া হয়নি কোনো ব্যবস্থা।
সেনাপুর এলাকার নদী ভাঙনের শিকার শুকুর আলী বলেন, ‘আমার এই বয়সে পাঁচবার বাড়ি ভাঙছে। আমার এখন বাড়িঘর নাই। যা একটু আছি, মানষের বাঁশ ঝাড়ের তলায় রাখছি। যে ভাঙন শুরু হইছে, মনে হয় এহনতাও থাকতে পারতাছি না। এহনেও যদি থাকতে পারতাম, তাও একটু বাঁচতাম।’
রুপচান আলী বলেন, ‘আমার বসতবাড়ি ইতোপূর্বে চারবার নদে ভেঙে হয়ে গেছে। এখন অন্যের ভিটায় আশ্রয় নিয়ে কোনোমতে বসবাস করছি। ব্রহ্মপুত্র নদে আবারও নতুন করে ভাঙন শুরু হয়েছে।’
ভাঙন ঠেকাতে জরুরি ভিত্তিতে কাজ করার দাবি জানান তিনি।’
চর গেন্দার আলগার সুন্দরী খাতুন বলেন, ‘আমি নদীর কান্দায় থাকি, আমার বসতবাড়ি ভেঙ্গে গেছে পাঁচবার। আমি কিভাবে গুদা বাচ্চা (শিশুসন্তান) নিয়ে থাকি। নাই খাবার, এহন (এখন) আমি কিভাবে চলি, আমার স্বামী অসুস্থ। আমি যেখানে যাই, হেখানেই সরাইয়া দেয়। ক্যাইরো (কারো) জায়গা নাই। আমি এহন কোনে যাই। অনেক কষ্টে রইছি।’
চর গেন্দার আলগা এলাকার বৃদ্ধ সোরমান আলী বলেন, ‘আমার এই বৃদ্ধ বয়সে চার, চারবার বসতবাড়ি নদের গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। বর্তমানে খুবই অসহায়, অন্যেও জমিতে কোনো রকমভাবে ঘর তুলে আছি।’
তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে আরও বলেন, ‘বাবারে আমার এই দুঃখের কথা বলে দিনও যায় না, রাতেও যায় না। এখন যে অবস্থায় নদী ভাঙ্গে আসতেছে, আর যদি আমার এই ঘরটুকু ভেঙ্গে যায়, তাহলে যাওয়ার মত আমার আর কোনো জায়গা নাই।’
তাই নদী ভাঙন রোধে দ্রুত কাজ করার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানান এ বৃদ্ধ।
চর গেন্দার আলগা এলাকার নদী ভাঙনের শিকার আফজান বেগন বলেন, ‘আমার বসতবাড়ি তিনবার ভাঙছে। পরে অন্যের জায়গায় যাই, এহেন থ্যাইকা সরাইয়া দেয়। এহন সড়কে কোনো রহম ধাপড়ি বাইন্দা (ঝুপড়িঘর) পয়পোলাহান নিয়ে রইছি। আমার আর কোনো উপায় নাই। নদীর কাজটি দ্রুত বইন্দা দেন।’
স্থানীয় ওয়ার্ড সদস্য সমসের আলী বলেন, ‘চর গেন্দার আলগা এলাকাসহ বেশ কয়েকটি এলাকা প্রায় দশমাস আগে ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে অন্তত ৭২০ পরিবারের বসতবাড়ি ও ফসলি জমি বিলীন হয়ে গেছে। আবার দুইসপ্তাহ ধরে চর গেন্দার আলগাসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় তীব্র ভাঙন শুরু হয়েছে। কিন্তু ভাঙন রোধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।’
নদী সংগঠক মহিউদ্দিন মহির বলেন, ‘ক্ষমতার পালা বদল হয় কিন্তু নদী ভাঙনের দুঃখ ও নদী ভাঙন শেষ হয় না। তাই ভাঙন রোধে অতি দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।’
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডেও নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, ‘ঊধ্বর্তন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। বরাদ্দ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে জরুরি কাজের জন্য এখন কোনো বরাদ্দ নেই।’
কেকে/এমএ