মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬,
২ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬
শিরোনাম: সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর      ভারতের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনারকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব      বাতিল হচ্ছে সরকারি চাকরিজীবীদের ‘বিশেষ সুবিধা’      ভারতের ভিসা অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে নতুন নির্দেশনা      ২০ জুলাইয়ের মধ্যে এসএসসির ফল প্রকাশ: শিক্ষামন্ত্রী      দিল্লিতে রাষ্ট্রীয় সফর বাতিল করে দেশে ফিরলেন তথ্য উপদেষ্টা      দেশে ফিরেছেন ৫৬ হাজারের বেশি হাজি      
বাতিঘর
বাংলার কিংবদন্তি এ কে ফজলুল হক
খোলা কাগজ প্রতিবেদক
প্রকাশ: সোমবার, ২৭ এপ্রিল, ২০২৬, ১১:৫৮ এএম

এ কে ফজলুল হক ছিলেন উপমহাদেশের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ ও জননেতা, যিনি ‘শেরে বাংলা’ নামে পরিচিত। আইন পেশা ও প্রশাসনিক জীবনের পর তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় হন। মুসলিম লীগ, কংগ্রেস এবং খেলাফত আন্দোলনে যুক্ত থেকে তিনি ব্রিটিশবিরোধী ও গণমানুষের অধিকার আন্দোলনে ভূমিকা রাখেন। পরে কৃষক আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে কৃষক-প্রজা পার্টি গঠন করেন। 

১৯৩৭ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি বাংলার প্রধানমন্ত্রী হন এবং শিক্ষা বিস্তার, জমিদারি প্রথা সংস্কার ও কৃষকদের অধিকার রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেন। ১৯৪০ সালে লাহোর প্রস্তাব উপস্থাপনের মাধ্যমে তিনি ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর তিনি অ্যাটর্নি জেনারেল, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৮ সালে রাজনীতি থেকে অবসর নেন। 

বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিমণ্ডলে আবুল কাসেম ফজলুল হক এক গুরুত্বপূর্ণ ও স্বতন্ত্র নাম। তিনি মূলত একজন প্রাবন্ধিক, চিন্তাবিদ ও শিক্ষক হিসেবে পরিচিত হলেও তার পরিচয়ের বিস্তার আরও অনেক দূর পর্যন্ত। সাহিত্য, সমাজ, রাজনীতি ও দর্শন এসব বিষয়ের ওপর দীর্ঘদিন ধরে তার বিশ্লেষণধর্মী লেখালেখি তাকে দেশের অন্যতম প্রভাবশালী বুদ্ধিজীবীতে পরিণত করেছে। যুক্তিনির্ভর চিন্তা, সমাজবাস্তবতার গভীর পর্যবেক্ষণ এবং স্পষ্ট বক্তব্য তার লেখার প্রধান বৈশিষ্ট্য।

১৯৪০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রদেশের কিশোরগঞ্জ জেলার পাকুন্দিয়ায় তার জন্ম। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন মেধাবী ও অনুসন্ধিৎসু। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা শেষে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকায় আসেন এবং শেষ পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তিনি প্রগতিশীল ও সমালোচনামূলক চিন্তার সঙ্গে পরিচিত হন, যা পরবর্তীতে তার লেখালেখির ভিত্তি গড়ে দেয়। শিক্ষাজীবনের এই অভিজ্ঞতা তাকে শুধু একজন ভালো ছাত্রই নয়, বরং একজন সচেতন চিন্তাবিদ হিসেবে গড়ে তোলে।

পেশাজীবনে তিনি দীর্ঘদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর বাংলা বিভাগে অধ্যাপনা করেছেন। শিক্ষক হিসেবে তিনি ছিলেন অনুপ্রেরণাদায়ক, আর তার পাঠদান ছিল বিশ্লেষণধর্মী ও চিন্তাশীল। বহু শিক্ষার্থী তার কাছ থেকে শুধু পাঠ্যজ্ঞানই নয়, বরং চিন্তা করার পদ্ধতি শিখেছেন। শিক্ষাদানের পাশাপাশি তিনি নিয়মিত লেখালেখি চালিয়ে গেছেন এবং সমাজের নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মত প্রকাশ করেছেন। ১৯৮২ সাল থেকে তিনি ‘লোকায়ত’ নামের একটি সাহিত্যপত্র সম্পাদনা করছেন, যা সমালোচনামূলক ও প্রগতিশীল লেখার জন্য পরিচিত।

তার সাহিত্যকর্ম মূলত প্রবন্ধনির্ভর। সমাজ, রাজনীতি, ইতিহাস, সাহিত্য ও দর্শনের নানা বিষয় তার লেখার উপজীব্য। ‘মুক্তির সংগ্রাম’, ‘একুশে ফেব্রুয়ারি আন্দোলন’, ‘মানুষ ও তার পরিবেশ’, ‘রাজনীতি ও দর্শন’, ‘সাহিত্যচিন্তা’সহ তার বিভিন্ন গ্রন্থে তিনি সমাজের বাস্তবতা, রাজনৈতিক সংকট এবং বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ করেছেন। তার লেখায় আবেগের চেয়ে যুক্তি বেশি গুরুত্ব পায়, এবং তিনি পাঠককে চিন্তা করতে বাধ্য করেন। সমাজের অসঙ্গতি ও রাজনৈতিক দুর্বলতা নিয়ে তার স্পষ্ট সমালোচনা তাকে একজন সাহসী বুদ্ধিজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

অনুবাদক হিসেবেও তার অবদান উল্লেখযোগ্য। তিনি ব্রিটিশ দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল-এর গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ বাংলায় অনুবাদ করেছেন, যার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক চিন্তাধারা বাংলাভাষী পাঠকের কাছে সহজভাবে পৌঁছে গেছে। তার অনুবাদ শুধু ভাষান্তর নয়, বরং চিন্তার রূপান্তর- যা পাঠকদের নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দেয়। এই কাজের মাধ্যমে তিনি জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রকে আরও বিস্তৃত করেছেন।

সমাজ ও রাজনীতি সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল স্পষ্ট ও যুক্তিনির্ভর। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি সুস্থ সমাজ গঠনের জন্য প্রয়োজন মুক্তচিন্তা, গণতন্ত্র ও মানবিক মূল্যবোধ। তার লেখায় বুদ্ধিজীবীদের দায়িত্ব, রাষ্ট্রের চরিত্র, নাগরিক অধিকার এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের বিষয়গুলো বারবার উঠে এসেছে। তিনি সাম্প্রদায়িকতা ও অন্ধবিশ্বাসের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে যুক্তিবাদী ও মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার পক্ষে কথা বলেছেন।


ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন সাদাসিধে ও নীতিবান। তার জীবনেও দুঃখজনক ঘটনা এসেছে তার ছেলে ফয়সল আরেফিন দীপন ২০১৫ সালে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। এই মর্মান্তিক ঘটনা তার ব্যক্তিজীবনে গভীর প্রভাব ফেললেও তিনি তার চিন্তাচর্চা ও লেখালেখি থামাননি। বরং আরও দৃঢ়ভাবে তিনি মুক্তচিন্তা ও মানবিক মূল্যবোধের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

সাহিত্য ও গবেষণায় অবদানের জন্য তিনি ১৯৮১ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন, যা তার কাজের গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি। সব মিলিয়ে, আবুল কাসেম ফজলুল হক এমন একজন চিন্তাবিদ, যিনি শুধু লেখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; বরং সমাজকে বুঝতে এবং পরিবর্তনের পথ খুঁজতে নিরলস চেষ্টা করেছেন। তার লেখায় যে বিশ্লেষণধর্মী দৃষ্টিভঙ্গি, যুক্তির দৃঢ়তা এবং মানবিক আবেদন পাওয়া যায়, তা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে তার অবদান দীর্ঘদিন ধরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবেন।

প্রাথমিক জীবন

এ কে ফজলুল হক ১৮৭৩ সালের ২৬ অক্টোবর বরিশাল বিভাগের ঝালকাঠি জেলার রাজাপুর উপজেলার সাতুরিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা কাজী মুহম্মদ ওয়াজেদ এবং মাতা সাইদুন্নেসা খাতুন। শৈশবে তার শিক্ষাজীবন শুরু হয় বাড়িতে, পরে তিনি গ্রাম্য পাঠশালায় ভর্তি হন এবং গৃহশিক্ষকের কাছে আরবি, ফার্সি ও বাংলা ভাষায় পারদর্শিতা অর্জন করেন। ১৮৮১ সালে তিনি বরিশাল জিলা স্কুলে ভর্তি হন এবং শিক্ষাজীবনে অসাধারণ মেধার পরিচয় দেন। ১৮৮৯ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় ঢাকা বিভাগের মুসলমান শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করেন।

উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি কলকাতায় গিয়ে প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন। ১৮৯১ সালে এফএ এবং ১৮৯৩ সালে গণিত, রসায়ন ও পদার্থবিদ্যায় অনার্সসহ বিএ প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হন। পরবর্তীতে অঙ্কে এমএ পরীক্ষায়ও প্রথম শ্রেণি অর্জন করেন, যা তার অসাধারণ মেধার প্রমাণ। শিক্ষাজীবনের পাশাপাশি খেলাধুলার প্রতিও তার গভীর আগ্রহ ছিল; বিশেষ করে ফুটবল, দাবা ও সাঁতারে তিনি সক্রিয় ছিলেন এবং পরবর্তীতে মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।

পারিবারিক জীবন

এ কে ফজলুল হকের পারিবারিক ইতিহাস ছিল সমৃদ্ধ ও সম্ভ্রান্ত ঐতিহ্যে ভরপুর। তার পূর্বপুরুষরা আঠারো শতকে ভারতের ভাগলপুর অঞ্চল থেকে পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার বিলবিলাস গ্রামে বসতি স্থাপন করেন। এই বংশের অন্যতম ব্যক্তিত্ব ছিলেন কাজী মুর্তজা, যার উত্তরসূরিরা শিক্ষায় ও পেশায় কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। তার পিতা কাজী মুহম্মদ ওয়াজেদ ছিলেন শিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত আইনজীবী। তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যয়ন করেন এবং বাংলার মুসলমানদের মধ্যে অন্যতম প্রাথমিক গ্রাজুয়েট হিসেবে স্বীকৃতি পান। ১৮৭১ সালে তিনি বি.এল. ডিগ্রি অর্জন করে আইন পেশায় যুক্ত হন। তার মা সাইদুন্নেসা খাতুন ছিলেন সম্ভ্রান্ত পরিবারের কন্যা।

ব্যক্তিজীবনে ফজলুল হক একাধিকবার বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। এম.এ. পাসের পর তিনি নবাব আবদুল লতিফের পৌত্রী খুরশিদ তালাত বেগমকে বিয়ে করেন, যিনি দুই কন্যাসন্তানের জননী ছিলেন। তার মৃত্যুর পর তিনি জিনাতুন্নেসা বেগমকে বিয়ে করেন, তবে তিনি নিঃসন্তান অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। 

পরে ১৯৪৩ সালে তিনি মীরাটের এক ভদ্র মহিলাকে বিয়ে করেন। এই দাম্পত্য থেকে জন্মগ্রহণ করেন এ. কে. ফাইজুল হক, যিনি পরবর্তীতে রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করেন।


কর্মজীবন 

এ কে ফজলুল হকের কর্মজীবন ছিল বহুমাত্রিক এবং অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ। ১৮৯৭ সালে তিনি কলকাতার রিপন কলেজ থেকে বি.এল. ডিগ্রি অর্জনের পর আশুতোষ মুখার্জির অধীনে শিক্ষানবিশ হিসেবে কলকাতা হাইকোর্টে আইন পেশায় যুক্ত হন। দুই বছর শিক্ষানবিশ শেষে ১৯০০ সালে তিনি স্বাধীনভাবে আইন ব্যবসা শুরু করেন। পিতার মৃত্যুর পর ১৯০১ সালে তিনি বরিশালে ফিরে এসে আদালতে প্র্যাকটিস শুরু করেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই নিজেকে দক্ষ আইনজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। 

১৯০৩-০৪ সালে তিনি বরিশাল বার অ্যাসোসিয়েশনের সহকারী সম্পাদক নির্বাচিত হন।

এই সময় তিনি রাজচন্দ্র কলেজে অঙ্কশাস্ত্রের অধ্যাপক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তবে ১৯০৬ সালে তিনি আইন পেশা ছেড়ে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন এবং পূর্ববাংলার গভর্নর ব্যামফিল্ড ফুলার তাকে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নিয়োগ দেন। তিনি ঢাকা, ময়মনসিংহ, জামালপুর ও মাদারীপুরে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন। জামালপুরে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে তার ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।

চাকরিজীবনে তিনি কৃষক ও সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্ট কাছ থেকে দেখেন, যা তার চিন্তাধারাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। ১৯১১ সালে সমবায় বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি গ্রামীণ অর্থনীতি সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। তবে সরকারের সঙ্গে মতবিরোধের কারণে তিনি অল্পদিনের মধ্যেই চাকরি ছেড়ে দেন এবং পুনরায় কলকাতা হাইকোর্টে আইন পেশায় ফিরে যান, যেখানে তাকে নাগরিক সংবর্ধনা দেওয়া হয় এবং সভাপতিত্ব করেন খাজা সলিমুল্লাহ।

সাহিত্য-শিল্প-সংস্কৃতি

এ কে ফজলুল হকের কর্মজীবন ছিল বহুমাত্রিক এবং অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ। ১৮৯৭ সালে তিনি কলকাতার রিপন কলেজ থেকে বি.এল. ডিগ্রি অর্জনের পর আশুতোষ মুখার্জির অধীনে শিক্ষানবিশ হিসেবে কলকাতা হাইকোর্টে আইন পেশায় যুক্ত হন। দুই বছর শিক্ষানবিশ শেষে ১৯০০ সালে তিনি স্বাধীনভাবে আইন ব্যবসা শুরু করেন। 

পিতার মৃত্যুর পর ১৯০১ সালে তিনি বরিশালে ফিরে এসে আদালতে প্র্যাকটিস শুরু করেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই নিজেকে দক্ষ আইনজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। ১৯০৩-০৪ সালে তিনি বরিশাল বার অ্যাসোসিয়েশনের সহকারী সম্পাদক নির্বাচিত হন।

এই সময় তিনি রাজচন্দ্র কলেজে অঙ্কশাস্ত্রের অধ্যাপক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তবে ১৯০৬ সালে তিনি আইন পেশা ছেড়ে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন এবং পূর্ববাংলার গভর্নর ব্যামফিল্ড ফুলার তাকে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নিয়োগ দেন। তিনি ঢাকা, ময়মনসিংহ, জামালপুর ও মাদারীপুরে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন। জামালপুরে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে তার ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।

চাকরিজীবনে তিনি কৃষক ও সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্ট কাছ থেকে দেখেন, যা তার চিন্তাধারাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। ১৯১১ সালে সমবায় বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি গ্রামীণ অর্থনীতি সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। তবে সরকারের সঙ্গে মতবিরোধের কারণে তিনি অল্পদিনের মধ্যেই চাকরি ছেড়ে দেন এবং পুনরায় কলকাতা হাইকোর্টে আইন পেশায় ফিরে যান, যেখানে তাকে নাগরিক সংবর্ধনা দেওয়া হয় এবং সভাপতিত্ব করেন খাজা সলিমুল্লাহ।

ব্রিটিশ আমলের রাজনৈতিক জীবন

এ কে ফজলুল হকের ব্রিটিশ আমলের রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় বরিশাল পৌরসভা নির্বাচনের মাধ্যমে, যেখানে অশ্বিনীকুমার দত্তের আহ্বানে তিনি কমিশনার পদে নির্বাচন করে বিজয়ী হন। এরপর ১৯১৩ সালে বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়ে তিনি দ্রুত একজন প্রভাবশালী নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন এবং মুসলমানদের শিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

রাজনীতির বৃহত্তর অঙ্গনে তিনি নিখিল ভারত মুসলিম লীগের সঙ্গে যুক্ত হন এবং ১৯১৯ সালে এর সভাপতি নির্বাচিত হন। একই সঙ্গে তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে যোগ দিয়ে ১৯১৮ সালে সেক্রেটারি জেনারেল হন। তিনি খেলাফত আন্দোলনেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ১৯২৪ সালে বাংলার শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিলেও রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে পদত্যাগ করেন।

পরবর্তীতে তিনি কৃষকদের অধিকার রক্ষায় মনোনিবেশ করেন এবং নিখিল বঙ্গ প্রজা সমিতি গঠন করেন, যা পরে কৃষক-প্রজা পার্টিতে রূপ নেয়। ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে তার দল উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করে এবং খাজা নাজিমুদ্দিন-কে পরাজিত করে তিনি বাংলার প্রধানমন্ত্রী হন। তার শাসনামলে প্রাথমিক শিক্ষা বিস্তার, জমিদারি প্রথা নিয়ন্ত্রণ, কৃষক ও শ্রমিকদের সুরক্ষায় নানা আইন প্রণয়ন করা হয়।

১৯৪০ সালে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর সভাপতিত্বে লাহোরে অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগের সম্মেলনে তিনি ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। ১৯৩৫ সালে তিনি কলকাতা করপোরেশনের প্রথম মুসলিম মেয়র হন এবং গোলটেবিল বৈঠকেও অংশ নেন। শেষ পর্যন্ত ১৯৪৬ সালের নির্বাচনের পর তিনি পুনরায় মুসলিম লীগে যোগ দেন, যদিও সেখানে তার ভূমিকা তুলনামূলকভাবে সীমিত ছিল।

পাকিস্তান আমলে রাজনীতি

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর এ কে ফজলুল হক আবারও সক্রিয় রাজনৈতিক ও পেশাগত জীবনে ফিরে আসেন। তিনি ঢাকা হাইকোর্টে আইন ব্যবসা শুরু করেন এবং হাইকোর্ট বারের প্রথম সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৫১ সালে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের অ্যাটর্নি জেনারেল নিযুক্ত হন এবং ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত এ দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে তিনি সমর্থন দেন, যা তার রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও স্পষ্ট করে।

১৯৫৩ সালে তার নেতৃত্বে কৃষক-প্রজা পার্টির নাম পরিবর্তন করে ‘কৃষক শ্রমিক পার্টি’ গঠন করা হয় এবং তিনি এর সভাপতি হন। একই বছর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি যুক্তফ্রন্ট গঠন করেন। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট বড় জয় পায় এবং তিনি পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। 

এই সরকারের ২১ দফা কর্মসূচির মধ্যে বাংলা ভাষার স্বীকৃতি, শহীদ দিবস ঘোষণা, শহীদ মিনার নির্মাণ, পহেলা বৈশাখে ছুটি ঘোষণা এবং জমিদারি প্রথা বিলোপের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ছিল। তবে একই বছরের ৩১ মে কেন্দ্রীয় সরকার যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা বাতিল করে দেয়।

১৯৫৫ সালে তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ১৯৫৬ সালে তিনি পাকিস্তানের গভর্নর হন এবং ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত এই পদে ছিলেন। পরবর্তীতে তাকে অপসারণ করা হলে তিনি সক্রিয় রাজনীতি থেকে অবসর নেন। জীবনের শেষ পর্যায়ে তিনি রাষ্ট্রীয় সম্মাননা লাভ করেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাকে বিশেষ সংবর্ধনা প্রদান করে।

সম্মাননা

এ কে ফজলুল হকের প্রতি শ্রদ্ধা ও স্মরণে বাংলাদেশে নানা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্থাপনার নামকরণ করা হয়েছে। তার স্মৃতিকে ধারণ করে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি আবাসিক হল ‘শেরে বাংলা হল’ নামে নামকরণ করা হয়েছে। একইভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও তার নামে একটি আবাসিক হল রয়েছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে জিন্নাহ হলের নাম পরিবর্তন করে তার নামে করা হয়। কুয়েট-এও ‘ফজলুল হক হল’ নামে একটি ছাত্রাবাস রয়েছে। বুয়েট এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়েও তার নামে হল রয়েছে। পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়েও তার নামে ছাত্রাবাস রয়েছে।

তার নামে ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, যা কৃষি শিক্ষায় বিশেষ ভূমিকা রাখছে। এছাড়া রাজধানীর শের-ই-বাংলা নগর তার নামানুসারে নামকরণ করা হয়েছে, যেখানে জাতীয় সংসদ অবস্থিত।

খেলাধুলার ক্ষেত্রেও তার নাম অমর হয়ে আছে শের-ই-বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামের মাধ্যমে, যা দেশের প্রধান ক্রিকেট ভেন্যু হিসেবে পরিচিত। বরিশালে তার নামে ‘শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

এসব নামকরণ তার রাজনৈতিক, সামাজিক ও জনকল্যাণমূলক অবদানের প্রতি জাতির শ্রদ্ধার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে বিবেচিত হয়।

মৃত্যু

এ কে ফজলুল হক ১৯৬২ সালের ২৭ এপ্রিল, শুক্রবার সকাল ১০টা ২০ মিনিটে ৮৮ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। পরদিন ২৮ এপ্রিল সকাল পর্যন্ত তার মরদেহ ঢাকার টিকাটুলি এলাকার ২৭ কে. এম. দাস লেনের বাসভবনে রাখা হয়, যেখানে বহু মানুষ তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে সমবেত হন।

সেদিন সকাল ১০টা ৩০ মিনিটে পল্টন ময়দানে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজার পর তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় দাফন করা হয়। একই স্থানে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং খাজা নাজিমুদ্দিনের সমাধিও রয়েছে, যা একত্রে ‘তিন নেতার মাজার’ নামে পরিচিত।

তার মৃত্যুতে দেশজুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে। রেডিও পাকিস্তান সেদিন সব অনুষ্ঠান বন্ধ রেখে কুরআন তিলাওয়াত সম্প্রচার করে। জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয় এবং সরকারি সম্মান প্রদর্শন করা হয়। পরে ৩০ এপ্রিল সারা দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শোক দিবস হিসেবে ছুটি ঘোষণা করা হয়।

কেকে/ এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close