টানা বৃষ্টিপাত ও ভারত থেকে আসা ঢলের পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার সবগুলো হাওরের পাকা ধান। ভারীবর্ষণে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে হাওরে প্রবেশ করছে। জলাবদ্ধতায় ইতোমধ্যে উপজেলার দেখার হাওর, জামখলা হাওর, সাংহাই হাওর, জামাইকাটা হাওর, বড়কুল হাওর, খাই হাওর, পাখিমারা হাওরসহ প্রায় সবগুলো হাওরের নিচু জমির ধান তলিয়ে গেছে। বৈরি আবহাওয়া এবং শ্রমিক সংকট থাকায় চোখের সামনেই নষ্ট হচ্ছে কৃষকদের কষ্টের সোনালি ফসল।
কৃষকরা বলছেন, জলাবদ্ধতার কারণে গত সপ্তাহেই হাওরের নিচু জমিতে হারবেস্টার নামানো যায়নি। ফলে ধান কাটা শ্রমিক দিয়েই পাকা ধান কাটাতে হচ্ছে। তবে দৈনিক এক হাজার টাকা মজুরীতেও ধান কাটার শ্রমিক মিলছেনা। এছাড়া রোদের অভাবে ধান শুকাতে না পারায় ধানে চারা গজানোর পাশাপাশি দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।
উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে উপজেলায় ২২ হাজার ৬১২ হেক্টর জমি আবাদকৃত জমির মধ্যে ১০ হাজার ৪২৩ হেক্টর জমির ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে, যা মোট আবাদকৃত জমির প্রায় ৫৭ শতাংশ। এরমধ্যে আজ বুধবার পর্যন্ত উপজেলার চারশ ৫৫ হেক্টর জমি তলিয়ে গেছে।
এই সংকট উত্তোরণে হাওরের পাকা ধান দ্রুত কর্তনে সহায়তা চেয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে উপজেলা কৃষি অফিস।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে জারি করা দাপ্তরিক পত্রে বলা হয়, হাওরবেষ্টিত শান্তিগঞ্জ উপজেলার মানুষের জীবন-জীবিকা মূলত বোরো ধান চাষের ওপর নির্ভরশীল। চলতি মৌসুমে উপজেলার বিপুল পরিমাণ জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। তবে অতিবৃষ্টির কারণে অনেক এলাকায় জমি জলাবদ্ধ হয়ে পড়েছে, ফলে কৃষকরা সময়মতো ধান কাটতে পারছেন না। এই পরিস্থিতিতে দ্রুত ধান কেটে ঘরে তুলতে সকল রাজনৈতিক দল, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যুব সংগঠন এবং স্থানীয় জনগণকে স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে ধান কর্তন কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
বড়কুল হাওরের কৃষক জগলু মিয়া ও জিয়া বলেন, ‘চোখের সামনে পাকা ধান নষ্ট হচ্ছে। এক হাজার টাকা মজুরীতেও শ্রমিক পাচ্ছিনা। কষ্টের ফসল ঘরে তুলতে না পারলে সারাবছর দুর্ভোগ পোহাতে হবে।’
দেখার হাওরের কৃষক হাবিবুর রহমান ও রাজা মিয়া বলেন, ‘রোদের দেখা মিলছেই না। বেশি টাকা দিয়ে ধান কেটেও স্বস্তি নেই। রোদের অভাবে ধান নষ্ট হচ্ছে। সব সংকট একসাথে দেখা দিয়েছে।’
আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস ও জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের বরাত দিয়ে উপজেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানিয়েছে, জেলায় গতকাল মঙ্গলবার সকাল নয়টা থেকে আজ বুধবার সকাল নয়টা পর্যন্ত বৃষ্টি হয়েছে ২২ মিলিমিটার। আগামী ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকবে বলে আশংকা করা হচ্ছে।
শান্তিগঞ্জ উপজেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামান বলেন, আমাদের উপজেলায় পাউবোর বরাদ্দকৃত কোনো বাঁধ ভাঙ্গার ঘটনা ঘটেনি। ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধগুলো সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখা হয়েছে। প্রয়োজনীয় মেরামতের কাজও করা হচ্ছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আহসান হাবিব বলেন, ‘চারশ ৫৫ হেক্টর জমির ধান ইতোমধ্যে তলিয়ে গেছে। কৃষকদের কাটা ধান শুকানোর জন্য আমরা মিল মালিকদের সাথে যোগাযোগ করছি। একইসাথে কৃষকদের ধান যাতে তারা ন্যায্য মূল্যে কিনে সেই ব্যবস্থা গ্রহন করা হচ্ছে।’
শান্তিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহি কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. শাহজাহান বলেন, ‘হাওরের পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক মনিটরিং করা হচ্ছে। হাওরের ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহ করে জেলা অফিসে পাঠাচ্ছি। যেসব স্থানে বাঁধ দিলে হাওরে পানি ডুকবেনা, ফসল রক্ষা পাবে সেসব জায়গায় বাঁধ দিচ্ছি। এখন শিমুলবাঁকের থলেরবন্দের হাওরে আছি।’
কেকে/ এমএস