‘মরতে চাই না আমি। আমাকে বাঁচান, প্লিজ। আবার স্কুলে যেতে চাই। বান্ধবীদের সঙ্গে খেলতে চাই, পড়তে চাই। সেই চিকিৎসা দিন আমাকে।’
কথাগুলো বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ধুবনি কঞ্চিবাড়ী উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী মোছা. মিতু আক্তার। এই বয়সে মৃত্যুভয় বুকে নিয়ে দিন কাটাচ্ছে সে। কারণ একটাই, একটি পাগলা কুকুরের কামড়। সেই কামড়ে ইতোমধ্যে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। মিতু জানে না, সে পরবর্তী কি না।
বাঁচার এই আকুতি কেবল মিতুর একার নয়। গত ২১ এপ্রিল সকালে বজরা কঞ্চিবাড়ী বিষ্ণুময়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাগলা কুকুরের হামলায় সবার আগে আহত হয় মাত্র নয় বছর বয়সী চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী লাবণ্য আক্তার। কুকুরটি তার মুখ ও কপালে কামড় বসায়। এরপর সেই কুকুর কঞ্চিবাড়ী ইউনিয়নের বজরা কঞ্চিবাড়ী, সতিরজান ও কঞ্চিবাড়ী গ্রামে একের পর এক মানুষের ওপর হামলা চালায়। সেদিন শিশু থেকে বৃদ্ধ, নারী থেকে পুরুষ—মিলে আহত হন অন্তত ২১ জন। চিকিৎসা নিয়েছিলেন সবাই। তবুও একে একে পাঁচটি প্রাণ ঝরে গেছে। ঘটনার ২৫ দিন পেরিয়ে গেলেও কোনো বিশেষজ্ঞ দল এখনো ঘটনাস্থলে না আসায় বেঁচে থাকা বাকি আহতরা এখন মৃত্যুর প্রহর গুনছেন।
সেদিন সকাল থেকেই উন্মত্ত হয়ে ওঠে বেওয়ারিশ কুকুরটি। বজরা কঞ্চিবাড়ী গ্রামের পথে-ঘাটে, উঠানে যাকে পেয়েছে তাকেই কামড়িয়েছে। হাতে, মুখে, শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর ক্ষত নিয়ে ছুটে যান আহতরা। আহতদের মধ্যে ছিলেন নন্দ রাম, ফুল মিয়া, ফজিতন নেছা, রুমিনা বেগম, নজরুল ইসলাম, হামিদুল ইসলাম, সুলতানা বেগম, গোলেনুর বেগম, মিতু আক্তার, আতিকুর মিয়া, লাবণ্য আক্তার, আফরোজা বেগম, বিজয় হোসেন, চাঁদনী আক্তার, জয়নাল আবেদীন, কালো রানী, সুবন চন্দ্র বর্মনসহ আরও কয়েকজন। পাশের ছাপড়হাটী ইউনিয়নের মন্ডলের হাট এলাকার রতনেশ্বর কুমার (৫৩)ও সেদিন কুকুরটির হামলার শিকার হন।
এরপর শুরু হয় চিকিৎসার দৌড়ঝাঁপ। কিন্তু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে হতাশ হন আহতরা। সেখানে ভ্যাকসিন ছিল না। বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে বেশি দামে ভ্যাকসিন সংগ্রহ করতে হয়। ততক্ষণে কামড়ের পর ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে।
চিকিৎসা নেওয়ার পরও রক্ষা হয়নি। একে একে প্রাণ হারান নন্দ রানী, রতনেশ্বর কুমার, মো. ফুল মিয়া, মোছা. আফরোজা বেগম ও মোছা. সুলতানা বেগম। এদের মধ্যে তিনজন রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং দুজন নিজ বাড়িতে মৃত্যুবরণ করেন। রংপুর মেডিকেলে মারা যাওয়া তিনজনের মৃত্যু সনদে ভিন্ন ভিন্ন কারণ উল্লেখ রয়েছে। আফরোজা বেগমের ক্ষেত্রে হার্ট অ্যাটাক, রতনেশ্বর কুমারের ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া এবং ফুল মিয়ার ক্ষেত্রে কুকুরের কামড়ের গভীর ক্ষত। বাড়িতে মারা যাওয়া দুজনের কোনো চিকিৎসা নথি এখনো পাওয়া যায়নি। প্রতিটি মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাকি আহতদের বুকে ভয় আরও গভীর হয়েছে।
মিতু আক্তার বলেন, ‘একই দিনে একটা কুকুর আমাদের সবাইকে কামড় দিয়েছিল। চিকিৎসাও নিয়েছিলাম। তারপরও এক-এক করে পাঁচজন মারা গেলেন। কখন জানি আমারও মৃত্যু হয়, এই ভয় সবসময় কাজ করছে। আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে কেউ মিশতেও চাচ্ছে না আমার সঙ্গে।’ তিনি আরও বলেন, ‘পুরোপুরি সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে চাই। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে সঠিক পরামর্শ পাইনি।’
মিতুর বাবা মো. মুনছুর আলী বলেন, ‘বাড়ির পাশেই একজন মারা গেছেন। সেই দৃশ্য দেখে মেয়েকে নিয়ে আরও বেশি ভয় হচ্ছে। টাকার অভাবে মেয়েকে এখনো ভালো চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে পারিনি।’ তিনি প্রশাসনের সর্বাত্মক সহযোগিতার দাবি জানান।
আহত লাবণ্য আক্তারের বাবা মো. খায়রুল ইসলাম লাল মিয়ার চোখেমুখে উদ্বেগের ছাপ স্পষ্ট। তিনি বলেন, ‘আমার মেয়েসহ ২১ জন আহত হয়েছিলেন। সবাই চিকিৎসা নিয়েছেন। তবুও পাঁচজন মারা গেছেন। আমার মেয়ে এখনও পুরোপুরি সুস্থ হয়নি। চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছি আমরা।’
তিনি ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ‘উপজেলা প্রশাসন নিহতদের পরিবারকে ১০ হাজার টাকা করে দিয়েছে। আহতদের চিকিৎসার জন্য ৫ হাজার টাকা দেওয়ার কথা থাকলেও সেই টাকা এখনো দেওয়া হয়নি। অথচ আমাদের দরকার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক।’ তিনি আহতদের সম্পূর্ণ চিকিৎসা ব্যয় সরকার বহন করার দাবিও জানান।
আহতদের অভিযোগ, যথাযথ পর্যবেক্ষণ, সময়মতো বিশেষায়িত চিকিৎসা এবং ধারাবাহিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত না হলে মৃত্যুর ঘটনা আরও ঘটতে পারে। একই সঙ্গে তারা বেওয়ারিশ কুকুর নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি জোরদারের দাবি জানিয়েছেন।
কঞ্চিবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মো. মনোয়ার আলম সরকার বলেন, ‘আহতরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা না পেয়ে জেলা শহরসহ বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসা নিয়েছিলেন। তবুও পাঁচজন মারা গেছেন। বাকিরা আদৌ বাঁচবেন কি না, সেই উদ্বেগে আছেন সবাই।’ তিনি আহতদের জরুরিভিত্তিতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন।
সুন্দরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের রোগ নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা ডা. মো. সাইদুর রহমান বলেন, ‘আহতদের ভয়ের কোনো কারণ নেই। তাদের সচেতন করতে ও খোঁজ নিতে মেডিকেল টিম কাজ করছে।’ তবে এলাকায় একের পর এক মৃত্যু ঘটে যাওয়ার পরও কীভাবে ‘ভয়ের কোনো কারণ নেই’ বলা যায়, সেই প্রশ্নের জবাব মেলেনি।
সুন্দরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. দিবাকর বসাক বলেন, ‘মেডিকেল টিম গঠন করে দেওয়া হয়েছে, তারা নিয়মিত বিষয়গুলো দেখছেন।’ তবে আহতদের শরীরে জলাতঙ্কের জীবাণু এখনো আছে কি না, তা উপজেলা পর্যায়ে পরীক্ষা করা সম্ভব নয় বলেও জানান তিনি। এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলার আশ্বাস দেন।
সুন্দরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ঈফফাত জাহান তুলি বলেন, ‘আতঙ্কিত আহত ও তাদের পরিবারসহ এলাকাবাসীকে সচেতন করতে উপজেলা প্রশাসন কাজ করছে।’ জলাতঙ্ক পরীক্ষার বিষয়ে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে কথা বলার আশ্বাসও দেন তিনি।
আশ্বাস আর প্রতিশ্রুতির ভিড়ে মিতু, লাবণ্যসহ ১৬ জন আহত মানুষ প্রতিটি দিন পার করছেন অনিশ্চয়তায়। ঘটনার ২৫ দিন পেরিয়ে গেছে, বিশেষজ্ঞ দল আসেনি, প্রতিশ্রুত অর্থও মেলেনি। শুধু একটাই চাওয়া তাদের—বাঁচতে চান তারা।
কেকে/এলএ