বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬,
৪ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬
শিরোনাম: বর্তমান সরকার কোনো দলের নয় সবার : প্রধানমন্ত্রী      হাম ও উপসর্গে একদিনে আরও ৪ জনের মৃত্যু      ভারত সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের পরিকল্পনা বিবেচনাধীন: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী      প্রস্তাবিত বাজেটকে ‘লুটপাটের বাজেট’ বললেন আমির হামজা      সংসদে ‘আই হ্যাভ অ্যা প্লান’র ব্যাখ্যা দিলেন প্রধানমন্ত্রী      চালের সরবরাহ পরিস্থিতি স্থিতিশীল: বাণিজ্যমন্ত্রী      বিআরটিএর কর আদায়ে চুক্তির ব্যয় বাড়ল ২১ কোটি ৪২ লাখ টাকা      
দেশজুড়ে
তিস্তা মহাপরিকল্পনা এখনো প্রতিশ্রুতির রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ
নির্মল রায়, গঙ্গাচড়া (রংপুর)
প্রকাশ: সোমবার, ১৮ মে, ২০২৬, ৩:৩৪ পিএম আপডেট: ১৮.০৫.২০২৬ ৩:৩৯ পিএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

নদীভাঙন, খরা ও পানিসংকটে বিপর্যস্ত তিস্তাপাড়ের মানুষের কাছে তিস্তা মহাপরিকল্পনা ছিল দীর্ঘদিনের স্বপ্ন। কিন্তু নানা আলোচনা, সমীক্ষা ও রাজনৈতিক অঙ্গীকারের পরও প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি। সম্প্রতি পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের অনুমোদনের পর উত্তরাঞ্চলে আবারও জোরালো হয়েছে প্রশ্ন—তিস্তার উন্নয়ন কি শুধুই প্রতিশ্রুতিতেই আটকে থাকবে?

উত্তরাঞ্চলের মানুষের কাছে তিস্তা শুধু একটি নদী নয়; এটি জীবন-জীবিকা, কৃষি ও টিকে থাকার প্রতীক। বছরের পর বছর নদীভাঙন, খরা, বন্যা ও পানিসংকটে দুর্ভোগ পোহানো তিস্তাপাড়ের মানুষের আশা ছিল, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বদলে যাবে এই অঞ্চলের অর্থনীতি ও জীবনযাত্রা। কিন্তু দীর্ঘদিন পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পটির বাস্তব অগ্রগতি দেখা যায়নি।

এর মধ্যেই সম্প্রতি একনেকে অনুমোদন পেয়েছে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বড় অবকাঠামো প্রকল্প ‘পদ্মা ব্যারাজ (প্রথম পর্যায়)’। প্রায় ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকার এ প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে এতে নতুন করে প্রশ্ন তুলছেন তিস্তাপাড়ের মানুষ—পদ্মা নিয়ে বড় প্রকল্প অনুমোদন পেলে তিস্তা কেন এখনো অপেক্ষায়?

তিস্তা মহাপরিকল্পনাকে ঘিরে গত এক দশকে দেশের রাজনীতিতে এসেছে অসংখ্য প্রতিশ্রুতি। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে চীনের অর্থায়নে প্রকল্প বাস্তবায়নের আলোচনা শুরু হয়। চীনের প্রতিষ্ঠান পাওয়ার চায়না কনস্ট্রাকশন ২০১৬ সালের পর টানা তিন বছর সমীক্ষা চালায়। শুরু থেকেই চীন অর্থায়নের আগ্রহ দেখালেও ভারতের আপত্তির কারণে সে উদ্যোগ আর এগোয়নি। পরে সরকারিভাবে বলা হয়, তিস্তা প্রকল্পে ভারত কাজ করবে।

পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আবারও চীনের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ায় সরকার। চলতি বছরের জানুয়ারিতে সাবেক পানিসম্পদ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনকে নিয়ে তিস্তা অববাহিকা পরিদর্শন করেন। পরে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতে চীনের রাষ্ট্রদূত জানান, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে বেইজিং প্রস্তুত রয়েছে।

আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে উত্তরবঙ্গের জনসভাগুলোতেও গুরুত্ব পাচ্ছে তিস্তা মহাপরিকল্পনা। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা দ্রুত প্রকল্প বাস্তবায়নের আশ্বাস দিচ্ছেন। উজানের পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করা, পানির সুষম বণ্টন এবং তিস্তা অববাহিকাকে মরুকরণের হাত থেকে রক্ষার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হচ্ছে।

এদিকে চলতি বছরের ১১ মে লালমনিরহাটে এক অনুষ্ঠানে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, সরকার চীনের সহায়তায় দ্রুত তিস্তা মহাপরিকল্পনার কাজ শুরু করতে চায়।

অন্যদিকে ‘জাগো বাহে, তিস্তা বাঁচাই’ স্লোগানে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় তিস্তা নদীর দুই পাড়জুড়ে মশাল মিছিল ও বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। আন্দোলনকারীরা জাতীয় নির্বাচনের আগেই প্রকল্পের কাজ শুরুর দাবি জানান।

জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানও বিভিন্ন জনসভায় তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘ভূ-রাজনৈতিক চাপ উপেক্ষা করেও তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে।’ একই সঙ্গে তিস্তাকে পুনরুজ্জীবিত করে উত্তরবঙ্গকে কৃষি ও শিল্পের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেন তিনি।

তিস্তাপাড়ের মানুষের ভাষ্য, তারা আর নতুন কোনো আশ্বাস শুনতে চান না; এবার বাস্তব কাজ দেখতে চান।

গঙ্গাচড়া উপজেলার লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল হাদী বলেন, ‘তিস্তাপাড়ের মানুষ বছরের পর বছর শুধু আশ্বাস শুনে আসছে। নদীভাঙন, খরা আর বন্যার সঙ্গে যুদ্ধ করেই মানুষের জীবন কাটছে। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে উত্তরাঞ্চলের মানুষের ভাগ্য বদলে যেত।’

রংপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. রায়হান সিরাজী বলেন, ‘সংসদে দেওয়া তার প্রথম বক্তব্যেই তিনি তিস্তা মহাপরিকল্পনার বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তার মতে, এটি এখন আর শুধু আঞ্চলিক দাবি নয়, উত্তরাঞ্চলের মানুষের বাঁচা-মরার প্রশ্ন।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিদেশি অর্থায়নের অপেক্ষা না করে নিজস্ব অর্থায়নেও প্রকল্পটি বাস্তবায়ন সম্ভব, যদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকে।’

তিস্তা বাঁচাও, নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি অধ্যক্ষ নজরুল ইসলাম হক্কানী বলেন, ‘আমরা একনেক সভার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। আশা করেছিলাম, এবার হয়তো তিস্তার জন্য কার্যকর সিদ্ধান্ত আসবে। কিন্তু তিস্তার বদলে পদ্মা ব্যারাজের বাজেট অনুমোদনের খবর আমাদের হতাশ করেছে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা পদ্মা ব্যারাজের বিরোধী নই। কিন্তু প্রশ্ন হলো—পদ্মা নিয়ে বড় প্রকল্প হতে পারে, তাহলে তিস্তা কেন নয়? কেন উত্তরাঞ্চলের মানুষ বারবার বৈষম্যের শিকার হবে?’

বছরের পর বছর ধরে প্রতিশ্রুতি, সমীক্ষা আর রাজনৈতিক বক্তব্য শুনতে শুনতে ক্লান্ত তিস্তাপাড়ের মানুষ। তাদের প্রত্যাশা—তিস্তাকে আর রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে ব্যবহার না করে দ্রুত বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যাবে সরকার। কারণ তিস্তা শুধু একটি নদী নয়; এটি উত্তরবঙ্গের কোটি মানুষের ভবিষ্যৎ, কৃষি ও অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক বাস্তবতার নাম।

কেকে/ এমএস


আরও সংবাদ   বিষয়:  তিস্তা প্রকল্প   বাস্তবায়ন   রাজনীতি  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

দেশজুড়ে- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close