বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬,
৩ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬
শিরোনাম: বর্তমান সরকার কোনো দলের নয় সবার : প্রধানমন্ত্রী      হাম ও উপসর্গে একদিনে আরও ৪ জনের মৃত্যু      ভারত সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের পরিকল্পনা বিবেচনাধীন: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী      প্রস্তাবিত বাজেটকে ‘লুটপাটের বাজেট’ বললেন আমির হামজা      সংসদে ‘আই হ্যাভ অ্যা প্লান’র ব্যাখ্যা দিলেন প্রধানমন্ত্রী      চালের সরবরাহ পরিস্থিতি স্থিতিশীল: বাণিজ্যমন্ত্রী      বিআরটিএর কর আদায়ে চুক্তির ব্যয় বাড়ল ২১ কোটি ৪২ লাখ টাকা      
দেশজুড়ে
মৎস্য খাতে নতুন সম্ভাবনা
মো. নেজাম উদ্দিন, কক্সবাজার
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৯ মে, ২০২৬, ১০:১০ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

কক্সবাজারের সামুদ্রিক মৎস্য খাতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলতে নির্মাণ করা হচ্ছে আধুনিক মৎস্য অবতরণকেন্দ্র। যেখানে এক ছাদের নিচে মিলবে মাছ খালাস, সংরক্ষণ, প্যাকেজিং ও বাজারজাতকরণের আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা। দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত সংকট কাটিয়ে এই প্রকল্প ঘিরে নতুন আশায় বুক বাঁধছেন জেলে, ট্রলার মালিক, শ্রমিক ও মৎস্য ব্যবসায়ীরা। 

অবকাঠামোগত সংকট, ছোট জেটি, অপরিকল্পিত মাছ খালাস ও সংরক্ষণ সমস্যা ছিল। বিশেষ করে-গভীর সমুদ্র থেকে আনা মাছ দ্রুত বাজারজাত করতে না পারায় লোকসানের মুখে পড়তেন জেলে থেকে শুরু করে মৎস্য ব্যবসায়ীরা।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানায়- সংকট কাটিয়ে উঠতেই কক্সবাজারে নির্মাণ করা হচ্ছে আধুনিক মৎস্য অবতরণকেন্দ্র। যেখানে এখন চলছে ব্যাপক নির্মাণযজ্ঞ। বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ১০টি মাছ ধরার ট্রলার এই ঘাটে মাছ খালাস করতে পারে। 

প্রকল্পটি সম্পন্ন হলে সেই সক্ষমতা বেড়ে দাঁড়াবে ৬০টি ট্রলারে। মাছ খালাস থেকে পরিবহনের সময়ও ৪ ঘণ্টা থেকে কমে হবে মাত্র ২ ঘণ্টা। একই সঙ্গে প্রায় ২ হাজার মানুষ সরাসরি এবং ২ লাখ মানুষ পরোক্ষভাবে উপকৃত হবে। 

প্রকল্পের আওতায় নির্মাণ হচ্ছে ৩তলা আধুনিক ফিশ ল্যান্ডিং সেন্টার ভবন। থাকবে মাছ হ্যান্ডলিং এলাকা, ট্রাক টার্মিনাল, ব্যবসায়ীদের অফিস, কনফারেন্স রুম, বিশ্রামাগার ও দুর্যোগকালীন মজুত সংরক্ষণ সুবিধা।

জাইকা গ্র্যান্ড এইড প্রজেক্টের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপক নাসিউল আলম তৌফিক বলেন, এটি মূলত একটি আধুনিক মৎস্য অবতরণ ও বাজার কেন্দ্র। এখানে আধুনিক সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হবে। প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হলে এর সুফল মিলবে।

তিনি জানান, বর্তমানে প্রকল্পের ভবন নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। এছাড়া নদীর পাশের অবকাঠামোগত কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। এখন মূলত ভবনের বিভিন্ন অংশের নির্মাণকাজ এগিয়ে চলছে। প্রতিদিন এখানে প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ জন শ্রমিক কাজ করছেন।

এরই মধ্যে বাঁকখালীর নদীতীরে নির্মিত হয়েছে টেকসই বাঁধ, স্টিলের ২টি জেটি, ২টি পন্টুন ও ২টি গ্যাংওয়ে। নির্মাণ হচ্ছে মাছ বাজার, নামাজ কক্ষ, পাবলিক টয়লেট, গার্বেজ ডিপো এবং আধুনিক পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা। মাছের গুণগত মান ঠিক রাখতে সরবরাহ করা হবে আধুনিক মাছ হ্যান্ডলিং সরঞ্জাম। এর মধ্যে রয়েছে মাছ ধোয়ার বেসিন, কুলার বক্স, মাছের কন্টেইনার, বাছাই ট্রে, ওজন মাপার যন্ত্র ও উচ্চচাপ ওয়াশার।

মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের কর্তৃপক্ষ বলছে- এতে শুধু অবতরণ কেন্দ্রের সক্ষমতাই বাড়বে না, কমবে সংগ্রহোত্তর ক্ষতিও। একই সঙ্গে জেলে ও মৎস্য শ্রমিকদের জন্য নিশ্চিত হবে স্বাস্থ্যসম্মত ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ।

কক্সবাজার মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক আশীষ বৈদ্য বলেন, ‘‘নতুন আধুনিক মৎস্য অবতরণকেন্দ্রে ট্রাক পার্কিং, মাছ প্যাকিংয়ের আধুনিক ব্যবস্থা, ক্রাশিং মেশিন, জেলেদের থাকার ব্যবস্থা, বিনোদন ও ক্যান্টিন সুবিধা রাখা হচ্ছে। পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের জন্য অফিস, সাগরে যাওয়া মাছ ধরার নৌযানের প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের দোকানসহ একটি পূর্ণাঙ্গ বাজার ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।’’

তিনি জানান, ‘‘আগে মাছ বিক্রি না হলে দ্রুত নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকত। তবে এখন এখানে আধুনিক ফ্রিজিং প্ল্যান্ট ও কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণ করা হচ্ছে। ফলে মাছের গুণগত মান ঠিক রেখে দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে এবং ব্যবসায়ীদের লোকসানের ঝুঁকি কমে যাবে। সব মিলিয়ে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে, যেখানে জেলে ও ব্যবসায়ীরা সহজে মাছ খালাস, সংরক্ষণ ও বাজারজাত করতে পারবেন।

আশীষ বৈদ্য বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম আধুনিক মৎস্য বাজার হিসেবে এই কেন্দ্র গড়ে উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে মাছের গুণগত মান ও বাজারমূল্য বজায় থাকবে। আগে সংরক্ষণ সংকটে যে মাছ কম দামে বিক্রি করতে হতো, ভবিষ্যতে সেই সমস্যা থাকবে না। এতে ব্যবসায়ীরা লাভবান হবেন, মাছের অবতরণ বাড়বে এবং সরকারের রাজস্ব আয়ও বৃদ্ধি পাবে।

এদিকে, জেলে, ট্রলার মালিক, শ্রমিক ও মৎস্য ব্যবসায়ীদের আশা, আধুনিক মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র চালু হলে শুধু মাছ খালাস ও সংরক্ষণ ব্যবস্থাই উন্নত হবে না, বরং উপকূলীয় অর্থনীতিতে আসবে নতুন গতি।

জেলে ও মৎস্য শ্রমিক আব্দু রহিম বলেন, ‘‘আগে এখানে পর্যাপ্ত জেটি না থাকায় বড় ট্রলার সরাসরি ভিড়তে পারত না। ফলে ছোট ছোট নৌকায় করে ট্রলার থেকে মাছ খালাস করে তীরে আনতে হতো। অনেক সময় অতিরিক্ত মাছ বহনের কারণে ছোট নৌকা দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে, এতে ব্যবসায়ীদেরও ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে।’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘যেখানে মাছ খালাস করা হতো সেই স্থানও ছিল অপরিষ্কার ও অগোছালো। পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় অনেক সময় ঠিকভাবে মাছ ল্যান্ডিং করা সম্ভব হতো না।’’

আব্দু রহিমের আশা, নতুন মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র ও দুটি আধুনিক জেটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন হলে ক্ষুদ্র থেকে বড়-সব ধরনের ব্যবসায়ী ও শ্রমিক উপকৃত হবেন। এতে মাছ খালাস, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ অনেক সহজ ও নিরাপদ হবে।

মৎস্য ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আলমগীর বলেন, ‘‘আগে এখানে মাত্র একটি পন্টুন থাকায় মাছ খালাসে বড় ধরনের সমস্যার মুখে পড়তে হতো। একসঙ্গে মাত্র এক-দুটি বোট ভিড়তে পারত। ফলে অনেক সময় সমুদ্রের মাঝখানে ট্রলার রেখে ছোট নৌকায় করে মাছ তীরে আনতে হতো, এতে সময় ও খরচ দুটোই বেড়ে যেত।’’

তিনি বলেন, একটি পন্টুন দিয়েই মাছ ওঠানামা, বরফ খালাস এবং মানুষের চলাচল-সবকিছু পরিচালনা করতে হতো। এতে পুরো পরিবেশ ছিল অগোছালো এবং ব্যবসায়ীদের নানা ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে।

তবে নতুন আধুনিক মৎস্য অবতরণকেন্দ্র নির্মাণ হওয়ায় ব্যবসায়ীদের সুযোগ-সুবিধা বাড়বে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। তার মতে, নতুন জেটি ও অবকাঠামো চালু হলে মাছ খালাস ও পরিবহন আরও সহজ হবে, সময় ও খরচ কমবে এবং ব্যবসায়ীরা স্বস্তিতে কাজ করতে পারবেন।

ট্রলার মালিক ও মৎস্য ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘‘আগে মাছ দীর্ঘসময় রোদে রাখতে হতো। এতে মাছের গুণগত মান নষ্ট হয়ে যেত এবং ব্যবসায়ীদের ক্ষতির মুখে পড়তে হতো। এছাড়া আগের পন্টুন ও অবকাঠামো ছিল ছোট ও ঝুঁকিপূর্ণ, ফলে ট্রলার থেকে মাছ খালাস করাও ছিল বেশ কষ্টসাধ্য।’’ 

তিনি বলেন, এখন নতুন করে বড় ও আধুনিক পল্টন নির্মাণ করা হচ্ছে। এর ফলে মাছ আরও নিরাপদ ও তাজা রাখা সম্ভব হবে এবং নষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও কমে যাবে।

রফিকুল ইসলাম আরও বলেন, নতুন ভবন ও আধুনিক সুবিধা চালু হলে মাছ খালাস ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা অনেক উন্নত হবে। এতে জেলে, ট্রলার মালিক ও ব্যবসায়ীরা আরও স্বাচ্ছন্দ্যে কাজ করতে পারবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের মার্চে বাংলাদেশ সরকার এবং জাপান ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশন এজেন্সির মধ্যে এই প্রকল্পের অনুদান চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ২০২৫ সালের ১৭ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে নির্মাণকাজের উদ্বোধন করা হয়। ২০২৮ সালের জানুয়ারিতে এই প্রকল্পের কাজ শেষ হবে।

সংশ্লিষ্টরা জানায়-জাইকার অর্থায়নে প্রায় ২৩২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন এই প্রকল্পকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম আধুনিক মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র হিসেবে দেখা হচ্ছে। যা কক্সবাজারের সামুদ্রিক অর্থনীতিতে যোগ করবে নতুন গতি।

কেকে/ এমএস


আরও সংবাদ   বিষয়:  মৎস্য খাত   নতুন সম্ভাবনা  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

দেশজুড়ে- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close