যত্রতত্র গড়ে ওঠা অটো রাইস মিলের ভয়াবহ পরিবেশ ও বায়ুদূষণের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদে ফুঁসে উঠেছে দিনাজপুরের স্থানীয় জনসাধারণ। মিল থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া, ছাই ও অপরিশোধিত বিষাক্ত বর্জ্যের কারণে আশপাশের মানুষের জীবন এখন চরম দুর্বিষহ। এই জনস্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে এবং পরিবেশ সুরক্ষার দাবিতে জেলায় মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২১ মে) দিনাজপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে এ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশ শেষে আন্দোলনকারীরা জেলা প্রশাসক বরাবর একটি স্মারকলিপি প্রদান করেন।
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া পরিবেশবাদী, সচেতন নাগরিক ও ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের কণ্ঠে ছিল একটাই দাবি—‘পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য ধ্বংস করে কোনো তথাকথিত উন্নয়ন মেনে নেওয়া হবে না।’
সমাবেশে বক্তারা অভিযোগ করেন, রাইস মিলগুলোর চিমনি থেকে প্রতিনিয়ত বাতাসে ছড়াচ্ছে বিষাক্ত কালো ধোঁয়া ও ক্ষতিকর ছাই। এর ফলে মিল সংলগ্ন এলাকার শিশু, বৃদ্ধসহ সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত শ্বাসকষ্ট, ক্রনিক কাশি, চোখ জ্বালা-পোড়াসহ নানাবিধ জটিল শারীরিক সমস্যায় আক্রান্ত হচ্ছেন।
চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে এই দূষণের ফলে ফুসফুসের ক্যানসারের মতো মারাত্মক রোগের ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। বহুমাত্রিক সংকটে দিনাজপুরের পরিবেশ। শুধু বায়ুদূষণই নয়, অটো রাইস মিলগুলোর কারণে দিনাজপুরের সামগ্রিক পরিবেশ এখন এক জটিল ও বহুমাত্রিক সংকটের মুখোমুখি।
পানি ও মাটি দূষণ: মিলের অপরিশোধিত তরল বর্জ্য ও ক্ষতিকর রাসায়নিক সরাসরি মিশছে সংলগ্ন জলাশয় ও কৃষিজমিতে। এতে জমির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে এবং হুমকির মুখে পড়ছে স্থানীয় জীববৈচিত্র্য।
শব্দদূষণ: দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা মিলের ভারী যন্ত্রপাতির বিকট শব্দে আশপাশের আবাসিক এলাকার মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা এবং বয়োবৃদ্ধ ও রোগীদের মানসিক প্রশান্তি চরমভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।
দিনাজপুর পরিবেশ আন্দোলনের সংগঠক মো. রেজাউল ইসলাম বলেন, “অটো রাইস মিলগুলোর অনিয়ন্ত্রিত দূষণে দিনাজপুরের পরিবেশ দিন দিন বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ছে। এখনই যদি প্রশাসন কোনো কার্যকর ও কঠোর ব্যবস্থা না নেয়, তবে অদূর ভবিষ্যতে এই অঞ্চলের জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের ওপর এক বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসবে।”
আন্দোলনে সংহতি প্রকাশ করে দিনাজপুর পরিবেশ আন্দোলনের আরেক সংগঠক মোস্তফা আইয়াজসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ অবিলম্বে প্রশাসনের দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপ দাবি করেন। পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক বদরুন্নাহার সীমা বলেন, “জেলার অটো রাইস মিল হতে নির্গত ধুলা-বালি, ছাই ও বয়লারের পানি পরিবেশ দূষণ করছে, যা জীববৈচিত্র্য ও মানব স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি। দিনাজপুরের সকল অটো রাইস মিলকে নোটিশের মাধ্যমে অবহিত করা হয়েছে। আশা করছি আগামী ২ মাসের মধ্যে এর সুফল পাওয়া যাবে।”
চাউল কল মালিক সমিতির সভাপতি মো. নুরুজ্জামান সরকার বলেন, “আমরা পুলহাটের বিসিক এলাকায় পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্য অনেক দিন ধরে চেষ্টা করছি। পরিবেশ দূষণ কীভাবে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তা চাউল কল মালিক সমিতির আগামী মিটিংয়ে এজেন্ডা হিসেবে রেখে সমাধানের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।”
ক্ষুব্ধ জনতা ও পরিবেশবাদীদের পক্ষ থেকে প্রশাসনের কাছে অবিলম্বে বাস্তবায়নের জন্য ৫টি সুনির্দিষ্ট দাবি উত্থাপন করা হয়েছে।
দাবিগুলো হলো—
আইন অমান্যকারীদের শাস্তি: পরিবেশ আইন অমান্য করে এবং কোনো ধরনের ফিল্টার ছাড়া যেসব মিল চলছে, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার: প্রতিটি অটো রাইস মিলে শতভাগ কার্যকর দূষণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (বর্জ্য শোধনাগার এবং আধুনিক চিমনি) নিশ্চিত করা।
অনুমোদন পুনঃযাচাই: পরিবেশগত ছাড়পত্র ও ফায়ার সেফটি নীতিমালা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে এবং কঠোরভাবে যাচাই করা।
আবাসিক এলাকা মুক্তকরণ: জনবসতি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিকটে অবস্থিত সমস্ত দূষণকারী মিল অবিলম্বে বন্ধ করা অথবা নিরাপদ দূরত্বে স্থানান্তর করা।
শ্রমিক নিরাপত্তা: মিলের ভেতরে কর্মরত শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা, মাস্ক-গ্লাভসের ব্যবহার ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা।
সমাবেশের সমাপনী বক্তব্যে বক্তারা স্থানীয় জেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রতি জোরালো আহ্বান জানিয়ে বলেন, “অনতিবিলম্বে এই জনদুর্ভোগ বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আগামীতে আরও কঠোর ও বৃহত্তর আন্দোলনের ডাক দেওয়া হবে।”
মানববন্ধনে দিনাজপুরের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, গণমাধ্যমকর্মী, তরুণ শিক্ষার্থী ও সর্বস্তরের সচেতন নাগরিক স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন।
কেকে/এজে