১৯৭২ সাল। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ। যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ পেরিয়ে মানুষ তখন আবার নতুন করে বাঁচতে শিখছে। কুড়িগ্রাম শহরের স্কুলগুলোতেও ফিরতে শুরু করেছে শিশুদের কোলাহল। বইয়ের গন্ধ, নতুন খাতার সাদা পৃষ্ঠা আর সকালবেলার প্রার্থনায় ধীরে ধীরে প্রাণ ফিরে পাচ্ছে শহর।
সেই সময় কুড়িগ্রাম শহরের এক প্রাইমারি স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র ছিল আব্দুল্লাহ। শান্ত স্বভাবের, মেধাবী আর স্বপ্নবিলাসী এক কিশোর। একদিন স্কুলে নতুন ভর্তি হলো এক মেয়ে—মমতাজ। তার বাবা ছিলেন সরকারি কর্মকর্তা। বদলিজনিত চাকরির কারণে পরিবারসহ কুড়িগ্রামে এসেছেন।
প্রথম দিন থেকেই মেয়েটিকে আলাদা লাগত আব্দুল্লাহর। সাদা ফ্রক, মাথায় দুই বেণী আর মিষ্টি হাসি—শিশুমনেও যেন এক অদ্ভুত আলোড়ন তুলেছিল। ধীরে ধীরে তারা একই ক্লাসে পড়তে পড়তে চতুর্থ শ্রেণিতে উঠল। মমতাজ ছিল ভীষণ মেধাবী। আব্দুল্লাহও পড়াশোনায় ভালো। কিন্তু পড়ার বইয়ের বাইরে আব্দুল্লাহর মনে তখন আরেকটি নাম লেখা হয়ে গেছে—মমতাজ।
রাতে পড়তে বসলে বইয়ের পাতার মাঝখানে মমতাজের মুখ ভেসে উঠত। কখনো ভাবত, একদিন বলবে—“আমি তোমাকে ভালোবাসি।” কিন্তু ছোট্ট বুকের সেই সাহস আর জোটেনি।
বছর যেতে লাগল। না বলা কথাগুলো বুকের ভেতর জমতে লাগল।
একদিন আব্দুল্লাহ সিদ্ধান্ত নিল—সে প্রেমপত্র লিখবে।
কিন্তু কী লিখবে? কীভাবে লিখবে?
শহরের পুরোনো বইয়ের দোকান থেকে সে কিনে আনল গানের ছোট ছোট চটি বই। সেখানে লেখা ছিল—
“যাও পাখি বলো তারে, সে যেন ভুলে না মোরে…”
এসব লাইন কাগজে লিখে আবার কাটত। মনে হতো, এতটুকুতে মনের কথা সম্পূর্ণ হলো না। তারপর সে খুঁজে আনল প্রেম নিয়ে লেখা উক্তির বই। কবিদের কথা, সিনেমার সংলাপ, কষ্টের গান—সব মিলিয়ে তিন মাস ধরে লিখতে লাগল একটি প্রেমপত্র।
সেই চিঠিতে ছিল শিশুমনের সরল ভালোবাসা, লুকিয়ে রাখা স্বপ্ন আর এক জীবনের কল্পনা। কিন্তু চিঠি লেখা শেষ হলেও দেওয়ার সাহস আর হলো না।
এরই মধ্যে পঞ্চম শ্রেণি শেষ হলো। মমতাজ ভর্তি হলো শহরের নামকরা গার্লস স্কুলে। আব্দুল্লাহ ভর্তি হলো বালক বিদ্যালয়ে। তবুও প্রতিদিন স্কুলে যাওয়ার পথে আব্দুল্লাহ দাঁড়িয়ে থাকত রাস্তার পাশে—এক ঝলক মমতাজকে দেখবে বলে।
কখনো দেখা হতো, কখনো হতো না।
কিন্তু দেখা না হলেও তার ভালোবাসা কমেনি, বরং বেড়েছে।
আব্দুল্লাহ কল্পনায় দেখত—একদিন সে মমতাজকে বিয়ে করবে। পুকুরপাড়ে তাদের ছোট্ট বাড়ি হবে। বিকেলে বারান্দায় বসে দু’জনে চা খাবে। সন্তানদের নিয়ে হাসিখুশি সংসার হবে।
এই স্বপ্নগুলোই ছিল তার গোপন সুখ।
কখনো আবার দুঃস্বপ্ন দেখত। দেখত, মমতাজের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। সে দূর থেকে দাঁড়িয়ে কাঁদছে। সিনেমার মতো বুকভাঙা কষ্ট নিয়ে গাইছে—
“অনেক সাধের ময়না আমার, বাঁধন কেটে যায়…”
স্বপ্নের মধ্যেও তার চোখ ভিজে উঠত।
এভাবেই কেটে গেল আরও কয়েক বছর।
নবম শ্রেণিতে ওঠার পর একদিন আব্দুল্লাহ বুঝতে পারল—অনেকদিন হলো মমতাজকে দেখা যায় না। সে প্রতিদিন সেই রাস্তাগুলো ঘুরে বেড়াত, যেখানে মমতাজ হাঁটত। কিন্তু কোথাও নেই।
কিছুদিন পর জানতে পারল—মমতাজের বাবা বদলি হয়ে দূর শহরে চলে গেছেন।
খবরটা শুনে আব্দুল্লাহর মনে হলো, বুকের ভেতর কেউ যেন নিঃশব্দে একটা দরজা বন্ধ করে দিল।
সে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে ছিল। তারপর আলমারির ভেতর থেকে সেই প্রেমপত্রটা বের করল। হলুদ হয়ে যাওয়া কাগজে তখনও শুকিয়ে আছে তার কিশোরবেলার ভালোবাসা।
চিঠিটা দিতে পারেনি—এই দুঃখ ছিল না সবচেয়ে বড়।
সবচেয়ে বড় দুঃখ ছিল—আর কোনোদিন হয়তো মমতাজকে দেখা হবে না।
সময় থেমে থাকেনি।
আব্দুল্লাহ এসএসসি পাস করল, এইচএসসি শেষ করল, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ল। পরে অধ্যাপনা পেশায় যোগ দিল। একদিন সেও অবসরে গেল।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়—সেই প্রেমপত্রটি আজও সে ফেলে দেয়নি।
বহু বছর পর একদিন হঠাৎ জানতে পারল, মমতাজও কলেজের অধ্যাপনা শেষে অবসরে গেছেন। সংসার হয়েছে, সন্তান-সন্ততি হয়েছে।
অনেক কষ্টে আব্দুল্লাহ জোগাড় করল মমতাজের ঠিকানা আর মোবাইল নম্বর।
অনেক দ্বিধা নিয়ে এক সন্ধ্যায় ফোন করল।
ওপাশে শান্ত কণ্ঠে “হ্যালো” বলতেই আব্দুল্লাহর বুক কেঁপে উঠল।
ধীরে ধীরে বলল—
“মমতাজ… আমি তোমার সঙ্গে স্কুলে পড়তাম। তোমাকে আমি খুব ভালোবাসতাম। কিন্তু কোনোদিন বলতে পারিনি। তোমার জন্য একটা প্রেমপত্র লিখেছিলাম। অনেকবার দিতে চেয়েছি, কিন্তু সাহস পাইনি। চিঠিটা এখনো আমার কাছে আছে…”
কথাগুলো বলতে বলতে আব্দুল্লাহর গলা ভারী হয়ে গেল।
কিছুক্ষণ নীরবতার পর মমতাজ মৃদু হেসে বলল—
“অনেকদিন আগের কথা… স্কুলের সেই দিনগুলো মনে পড়ছে। তুমি যে আমাকে এত গভীরভাবে ভালোবাসতে, আমি সত্যিই জানতাম না। তুমি ভালো থেকো… আর প্রেমপত্রটা দিও।”
ফোন কেটে যাওয়ার পর আব্দুল্লাহ অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল।
জানালার বাইরে সন্ধ্যা নেমেছে। দূরে আজানের ধ্বনি ভেসে আসছে। টেবিলের ওপর রাখা সেই পুরোনো প্রেমপত্রটির দিকে তাকিয়ে আব্দুল্লাহর মনে হলো—
সব ভালোবাসার পরিণতি বিয়ে নয়।
কিছু ভালোবাসা সারাজীবন শুধু হৃদয়ের ভেতর বেঁচে থাকে।
একটি না বলা প্রেমপত্র হয়ে।
কেকে/এলএ