সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী শিমুল বাগান আজ বালুখেকোদের থাবায় বিলীন হতে বসেছে। অবৈধভাবে কিছু সিন্ডিকেট চক্র ড্রেজার ও সেভ মেশিনের মাধ্যমে বালু উত্তোলনের কারণে ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের স্থানটি।
দিনের পর দিন বাগানের চারপাশ থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন চললেও তা বন্ধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ঘটনায় প্রশাসনের নীরব ভূমিকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন পরিবেশপ্রেমী, সচেতন মহল ও এলাকাবাসী।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০০২ সালে তাহিরপুর উপজেলার বাদাঘাট ইউনিয়নের মানিগাঁও গ্রামে যাদুকাটা নদীসংলগ্ন এলাকায় বাদাঘাট ইউনিয়নের সাবেক প্রয়াত চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদিন নিজের জায়গায় প্রায় দুই একর চার শতক জমিতে শখের বশে শিমুল গাছ রোপণের উদ্যোগ নেন। তিনি প্রায় তিন হাজার শিমুল গাছ রোপণ করেন। দিনে দিনে বেড়ে ওঠা শিমুল গাছগুলো এখন হয়ে উঠেছে শিমুল বাগান।
কয়েক দশক ধরে গড়ে ওঠা শিমুল বাগানটি এলাকার অন্যতম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের নিদর্শন। প্রতিবছর ফুলে ফুলে লাল হয়ে ওঠা বাগানটি দেখতে বিভিন্ন স্থান থেকে পর্যটক ও প্রকৃতিপ্রেমীরা ভিড় করেন।
কিন্তু সম্প্রতি ঐতিহ্যবাহী শিমুল বাগানের আশপাশে ব্যাপক হারে বালু উত্তোলন চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, বালুখেকো সিন্ডিকেটের মূল হোতা রানু মেম্বার ও হাসান মিয়ার লোকজন সেভ মেশিন ও ড্রেজারের মাধ্যমে বালু উত্তোলন করছে। এর ফলে মাটির স্থিতিশীলতা নষ্ট হচ্ছে। নদীর পাড় ভেঙে একেবারে শিমুল বাগানের কাছাকাছি চলে আসায় হুমকির মুখে পড়েছে বাগানটি।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, বালুখেকোদের তাণ্ডবে বাগানটি ধ্বংস হওয়ার পাশাপাশি প্রায় ২০টি গ্রামও নদীগর্ভে বিলীন হতে পারে। এলাকায় রানু মেম্বার ও হাসানের ভয়ে কেউ মুখ খুলতে চান না। অভিযোগ করলে তাদের ওপর নির্যাতন নেমে আসে বলেও দাবি করেন অনেকে। শিমুল বাগান রক্ষায় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন এলাকাবাসী।
বাগানের মালিক ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আফতাব উদ্দিন বলেন, “শিমুল বাগানটি শুধু আমার ব্যক্তিগত সম্পদ নয়, এটি এলাকার একটি ঐতিহ্য এবং দেশের সম্পদ। এখানে প্রতিবছর দেশ-বিদেশ থেকে লক্ষাধিক পর্যটক ঘুরতে আসেন। আমার বাবা জয়নাল আবেদিন ছিলেন একজন বৃক্ষপ্রেমী। তিনি যেখানেই যেতেন, সেখানেই গাছ রোপণ করতেন। তাঁর রেখে যাওয়া শিমুল বাগানটি আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে চলে গেছে। যাদুকাটা নদীর তীরে অবস্থিত শিমুল বাগানটি বালুখেকোদের তাণ্ডবে হুমকির মুখে। চিহ্নিত ড্রেজার ব্যবসায়ী রানু ওরফে রানু মেম্বার ও কালা হাসানের নেতৃত্বে বালু উত্তোলনের ফলে শিমুল বাগানটি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে। আমি প্রশাসনের কর্মকর্তা ও তাহিরপুর থানার ওসিকে বারবার বলার পরও কোনো প্রতিকার পাচ্ছি না। শিমুল বাগানটি রক্ষায় আমি পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করছি।”
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, একাধিকবার বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আনা হলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে অবৈধ বালু উত্তোলনকারীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
তাদের মতে, প্রশাসন জরুরি ভিত্তিতে উদ্যোগ গ্রহণ করলে দেশের বৃহত্তম শিমুল বাগানটি রক্ষা করা সম্ভব। অন্যথায় বালুখেকোদের তাণ্ডবে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাবে এই বাগান। তারা অনতিবিলম্বে ড্রেজার অপসারণ, দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং শিমুল বাগানকে পরিবেশগতভাবে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান।
তারা বলেন, “শিমুল বাগান শুধুমাত্র কয়েকটি গাছের সমষ্টি নয়, এটি তাহিরপুরের ঐতিহ্য, প্রকৃতি ও পর্যটনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। এই বাগান রক্ষা করা এখন সময়ের দাবি।”
এ বিষয়ে তাহিরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমিনুল ইসলাম বলেন, “শিমুল বাগান শুধু একটি বাগান নয়, এটি এলাকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে কেউ যদি বাগানের ক্ষতি করার চেষ্টা করে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পুলিশ প্রশাসন সর্বদা সচেষ্ট রয়েছে। স্থানীয় জনগণকে এ ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের তথ্য দিয়ে প্রশাসনকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানাই।”
তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেদী হাসান মানিক বলেন, “শিমুল বাগানের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিমুল বাগান তাহিরপুরের একটি ঐতিহ্য ও প্রাকৃতিক সম্পদ। অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণে যদি বাগানটি হুমকির মুখে পড়ে, তাহলে তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। কেউ যদি অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। পরিবেশ রক্ষা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এই ঐতিহ্য সংরক্ষণে উপজেলা প্রশাসন সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে।”
কেকে/এলএ