দিনাজপুর বরাবরই সুস্বাদু ও উন্নতমানের লিচুর জন্য দেশজুড়ে পরিচিত। বিশেষ করে জেলার খানসামা উপজেলার চায়না-৩ ও বেদেনা জাতের লিচুর খ্যাতি অনেক পুরোনো। প্রতি বছর মৌসুম এলেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ব্যবসায়ী ও ক্রেতারা ভিড় জমান এখানকার বাগানগুলোতে। তবে চলতি মৌসুমে সেই জনপ্রিয় লিচুর বাজারে দেখা দিয়েছে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি। খুচরা বাজারে প্রতিটি চায়না-৩ লিচু বিক্রি হচ্ছে ১০-১১ টাকায় ও বেদেনা ৯-১০ টাকায়। ফলে, মাত্র ১০০ লিচু কিনতেই ক্রেতাদের গুনতে হচ্ছে ১০০০-১১০০ টাকা।
খানসামা উপজেলার বিভিন্ন বাজার ও লিচুর বাগান ঘুরে দেখা গেছে, গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার লিচুর দাম অনেক বেশি। আকারে বড়, রঙে আকর্ষণীয় ও স্বাদে অতুলনীয় হওয়ায় চায়না-৩ জাতের লিচুর চাহিদা সবসময়ই বেশি থাকে। কিন্তু এবার ফলন কম হওয়ায় বাজারে সরবরাহও কমে গেছে। ফলে মৌসুমের শুরু থেকেই বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে লিচু।
স্থানীয় চাষিরা জানান, চলতি বছর আবহাওয়ার বিরূপ প্রভাব লিচু উৎপাদনে বড় ধাক্কা দিয়েছে। মৌসুমের শুরুতে কয়েক দফা শিলাবৃষ্টি ও ঝড়ো হাওয়ার কারণে অনেক গাছের গুটি ঝরে পড়ে। এতে কাক্সিক্ষত ফলন পাওয়া যায়নি। অনেক বাগানে গাছে লিচুর সংখ্যা কম থাকায় ব্যবসায়ীরা আগেভাগেই উচ্চমূল্যে বাগান কিনে নিচ্ছেন। সেই প্রভাব পড়ছে খুচরা বাজারেও।
লিচু ব্যবসায়ী আব্দুল কুদ্দুস বলেন, “গত বছর যে লিচু ৪-৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে, এবার সেটাই ১০ টাকার ওপরে চলে গেছে। ফলন কম হওয়ায় বাজারে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অনেক কম।’
উচ্চমূল্যের কারণে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন সাধারণ ও মধ্যবিত্ত ক্রেতারা। একসময় মৌসুমি ফল হিসেবে লিচু ছিল প্রায় সব পরিবারের নাগালের মধ্যে। অতিথি আপ্যায়ন, শিশুদের আবদার কিংবা গরমের স্বস্তির ফল হিসেবে লিচুর আলাদা কদর ছিল। কিন্তু এবার দাম শুনেই অনেককে বাজার থেকে খালি হাতে ফিরতে দেখা গেছে।
খানসামা উপজেলার গৃহিণী কোহিনুর বেগম বলেন, “আগে মৌসুমে কয়েক শত লিচু কিনে আত্মীয়স্বজনদের আপ্যায়ন করা যেত। এখন ১০০ লিচুর দাম এক হাজার টাকার বেশি। সংসারের খরচ চালিয়েই হিমশিম খেতে হয়, সেখানে এত দামে লিচু কেনা সম্ভব না।”
একই হতাশা প্রকাশ করেন সীমিত আয়ের অভিভাবক একরামুল হক বাবু। তিনি বলেন, “বাচ্চারা বাজারে এসে লিচু দেখলে কিনে দিতে বলে। কিন্তু দাম শুনে আর সাহস পাই না। এখন নিত্যপণ্যের দাম সামলাতেই কষ্ট হয়, লিচু কেনা যেন বিলাসিতা হয়ে গেছে।’
ক্রেতা আল আমিন বলেন, “আগে ২০০-৩০০ লিচু কিনে পরিবার নিয়ে খাওয়া যেত। এখন ১০টা লিচু কিনতেই প্রায় ১০০ টাকা লাগে। এভাবে দাম বাড়তে থাকলে সাধারণ মানুষ লিচুর স্বাদই ভুলে যাবে।”
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে খানসামা উপজেলায় প্রায় ১৪৫ হেক্টর জমিতে ছোট, মাঝারি ও বড় মিলিয়ে প্রায় ১৩০টি বাগানে লিচুর চাষ হয়েছে। চায়না-৩, মাদ্রাজি ও বেদানা জাতের লিচুর ভালো ফলনের আশা থাকলেও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে সামগ্রিক উৎপাদন কিছুটা কমেছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ ইয়াসমিন আক্তার জানান, আবহাওয়ার বিরূপ পরিস্থিতির মধ্যেও কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। গাছে রোগবালাই ও গুটি ঝরে পড়া রোধে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনাও দেওয়া হয়। তারপরও অনেক বাগানে ফলন আশানুরূপ হয়নি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আফজাল হোসেন বলেন, ‘দিনাজপুরের লিচুর মান ভালো হওয়ায় এবার বিদেশেও রপ্তানির আগ্রহ দেখা গেছে। বিশেষ করে বেদানা ও চায়না জাতের লিচুর প্রতি বিদেশি ক্রেতাদের আগ্রহ বাড়ছে। রপ্তানির বিষয়টি মাথায় রেখে লিচুর মান বজায় রাখতে কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।’
তিনি জানান, চৈত্র ও বৈশাখ মাসে বৃষ্টিপাত এবং জ্যৈষ্ঠ মাসে মাঝারি বৃষ্টির কারণে কিছুটা ক্ষতির আশঙ্কা থাকলেও মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের তদারকির মাধ্যমে অনেক ক্ষতি কমানো সম্ভব হয়েছে।
কেকে/এমএ