মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলায় পরিত্যক্ত সবজি থেকে পরিবেশবান্ধব পলিথিন এবং কলাগাছের তন্তু বিশেষায়িত করে টাইলস, ঢেউটিনসহ প্লাস্টিক, কার্বন ও সিলিকন পণ্যের বিকল্প ব্যবহারযোগ্য পরিবেশবান্ধব বিভিন্ন পণ্য উদ্ভাবণ করে ১৮ বছর বয়সী তরুণ সাজ্জাদুল ইসলাম নজর কাড়লেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের।
রেববার (১৪ জুন) দুপুরে বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের ডাক পান উদ্ভাবক সাজ্জাদুল ইসলাম। এ সময় সজ্জাদ ‘পচা ও পরিত্যক্ত সবজি থেকে পচনশীল পলিথিন এবং কলাগাছের তন্তু ব্যবহার করে ঢেউটিন, টাইলস ও বোর্ড তৈরির প্রযুক্তি ও সম্ভাবনা’ সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করেন। দেশীয় কাঁচামালনির্ভর পরিবেশবান্ধব এসব উদ্ভাবনের প্রশংসা করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি সাজ্জাদুল ইসলামের উদ্ভাবনী কর্মকাণ্ডে রাষ্ট্রীয় সহযোগিতার আশ্বাস দেন এবং গবেষণা ও উদ্ভাবনী কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে তাকে উৎসাহিত করেন।
তরুণ উদ্ভাবক সাজ্জাদুল ইসলাম দৈনিক খোলা কাগজকে বলেন, প্রায় দুই সপ্তাহ আগে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে আতিকুর রহমান রুমন (অতিরিক্ত প্রেস সচিব) আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি আমাকে জানান যে, ২০২৪ সালে আমার পরিচালিত গবেষণা ‘কলা গাছের তন্তু থেকে ডেউটিন ও টাইলস’ সম্পর্কে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অবগত আছেন এবং তিনি আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আগ্রহী। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১ জুন সম্ভাব্য সাক্ষাতের তারিখ জানানো হয়। রোববার আমি এবং আমার বাবা মো. নজরুল ইসলাম মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে তার সঙ্গে সাক্ষাতের সৌভাগ্য অর্জন করি। সাক্ষাৎকালে আমার গবেষণা ও এর সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গবেষণার অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং আমাকে গবেষণার কাজ অব্যাহত রাখতে সর্বোচ্চ সহযোগিতা ও উৎসাহ প্রদানের আশ্বাস দেন।
প্রধানমন্ত্রীল মূল্যবান সময়, আন্তরিকতা এবং অনুপ্রেরণার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আমি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সরাসরি সাক্ষত ও কথা বলার এই দিনটি আমার কাছে আজীবন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
সাজ্জাদুল ইসলাম জানান, ‘স্টার্টআপ ও যাবতীয় ফান্ডিং’ এর দায়িত্ব দেয়া হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আইসিটি বিষয়ক উপদেষ্টা রিহান আসিফ আসাদকে। এছাড়াও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় হতে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা কাজে আমাকে যুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে। দেশে প্রতিষ্ঠিত ইকো-ফাইবার কোম্পানিগুলো পরিদর্শন ও বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইন্সটিটি টে পর্যবেক্ষন করার সুযোগ দেয়া হচ্ছে।
গবেষণার সকল কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রধানমন্ত্রী গবেষণার ৩ জন উপদেষ্টা নিযুক্ত করেছেন। তারা হলেন বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (ঝউএং) এর প্রধান সমন্বয়ক ড. এস এম আব্দুল আওয়াল এবং ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত রিহান আসিফ মাহমুদ।
তরুণ উদ্ভাবক সাজ্জাদুল ইসলাম শ্রীমঙ্গল উপজেলার সদর ইউনিয়নের মোহাজেরাবাদ এলাকার কৃষক মো. নজরুল ইসলাম ও সাহেরা খাতুনের পুত্র। সাজ্জাদ দুই বোনের মধ্যে সে সবার বড়। ২০২৫ সালে শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজের বিজ্ঞান বিভাগে এইচএসসি পরীক্ষায় সাজ্জাদ উত্তীর্ণ হয়।
২০২৪ সালে পরিত্যক্ত সবজি থেকে পরিবেশবান্ধব পলিথিন, কলাগাছের তন্তু থেকে টাইলস, ডেউটিনসহ বিভিন্ন পণ্য উদ্ভাবন করে দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে।
আলাপকালে সাজ্জাদুল ইসলাম জানান, পরিত্যক্ত সবজি শ্বেতসার পচনযোগ্য পলিথিন তৈরিসহ কলাগাছের তন্তু বিশেষায়িত করে টাইলসসহ প্লাস্টিক, কার্বন ও সিলিকন পণ্যের বিকল্প ব্যবহারযোগ্য পরিবেশবান্ধব বিভিন্ন পণ্য তৈরি করা সম্ভব। আমার তৈরি উদ্ভাবিত টাইলসের ওজন প্রায় ৩০০ গ্রাম।
এর মধ্যে রয়েছে ২০০ গ্রাম কলাগাছের তন্তু ও হাইড্রো অক্সাইড ৬০ গ্রাম এবং রেজিন ৪০ গ্রাম। দীর্ঘ সময় ধরে পণ্যটি যেন না পচে এ জন্য রেজিন ব্যবহার হয়। হাইড্রো অক্সাইড রেজিনের অবস্থানকে আরও শক্তি দেয়। শুধু টাইলস নয় তার আবিষ্কৃত কাঁচামাল দিয়ে পচনযোগ্য প্লাস্টিকের আসবাবপত্র, টিন ও কার্বনের তৈরি মোটরযানের যন্ত্রাংশের বিকল্প হিসেবে কলাগাছের তন্তু ব্যবহার করা সম্ভবও বলে তিনি যোগ করেন। এমনকি বুলেট প্রুফ দরজা-জানালাও তৈরি করা সম্ভব।
সাজ্জাদুল ইসলাম জানান, তার আবিস্কৃত প্লাস্টিক পণ্য উচ্চ তাপে গলিয়ে সহজেই রাসায়নিক দ্রব্য ও কলাগাছের তন্তু আলাদা করা য়ায়। আর সবজির শ্বেতসার থেকে তৈরি পলিথিন মাটিতে ১ মাসে ও পানিতে ৩ মাসে পঁচে যাবে। যা মাটির জন্য হবে জৈব সার ও পানিতে হবে মৎস্য খাদ্য। আর পরিবেশবান্ধব পলিথিনের জন্য ব্যবহার হয় বাজারের পরিত্যক্ত সবজি থেকে সংগ্রহ করা শ্বেতসার, অ্যাসিটিক এসিড ও গিøসারল। তার আবিষ্কৃত কাঁচামালে ৬৫ শতাংশ কলাগাছের তন্তু ও ৩৫ শতাংশ রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার হয়েছে। কলাগাছের তন্তু থেকে তৈরি এই কঠিন যৌগ তৈরি করতে তার সর্বোচ্চ ৬৫ ভাগ তন্তু দিলে এর মধ্যে রাসায়নিক দ্রব্য মিশ্রন হবে।
এদিকে শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ-এর কার্যালয় থেকে শিক্ষার্থী সাজ্জাদুল ইসলামকে দেয়া এক প্রত্যয়নপত্রেও মিলেছে গবেষণার প্রমাণ। প্রত্যয়নপত্রে লেখা রয়েছে, সাজ্জাদুল ইসলাম কলাগাছের তন্তুকে বিশেষায়িত করে প্লাস্টিক, লোহা ও সিলিকন পণ্যের বিকল্প হিসেবে ব্যবহারযোগ্য পণ্যের প্রধান কাঁচামাল তৈরি করেছে। ইতোপূর্বে তার আবিষ্কৃত প্রজেক্ট দিয়ে সৃজনশীল মেধা অন্বেষণ প্রতিযোগিতা-২০২৪ এ জেলা পর্যায়ে বছরের সেরা মেধাবী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে।
শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজের রসায়ন বিভাগের শিক্ষকরা জানান, শিক্ষার্থী সাজ্জাদুল ইসলাম কলাগাছের সেলুলোজ সমৃদ্ধ তন্তু এর হাইডোঅক্সাইড ও রেজিন ব্যবহার করে টাইলস তৈরি করে এবং আলুর শ্বেতসার থেকে পলিথিন তৈরি করে সাড়া ফেলেছে। সে পণ্য তৈরিতে যেসব কাঁচামাল ব্যবহার করেছে তা পরিবেশের ভারসাম্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আরো অধিক গবেষনায় এটি ভালো কোন আবিস্কার হতে পারে।
সাজ্জাদুল ইসলামের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক, মোহাজিরাবাদ স্কুলের সাবেক প্রধান শিক্ষক ও বর্তমানে হাজী মনছব উল্লাহ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. কামরুল হাছান জানান, ছোটবেলা থেকেই সাজ্জাদ বিজ্ঞানের বিভিন্ন আবিস্কারে ছিল কৌতুহল। এ থেকেই বিভিন্ন কিছু আবিস্কারে তার মনোযোগ আসে। সাজ্জাদুল ইতোমধ্যে কলাগাছের তন্তুকে ব্যবহার করে তৈরি তরী করেছে টাইলস আর অব্যবহৃত সবজীর শ্বেতসার থেকে তৈরি করেছে পরিবেশবান্ধব পলিথিন।
উদ্ভাক সাজ্জাদুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার ফল ও সবজি অপচয় হয়। এই অপচয় করা শস্য থেকে পরিবেশবান্ধব পণ্য তৈরি করা হলে দেশের অর্থনীতিতে আসতে পারে বড় পরিবর্তন। পাশাপাশি কমে আসবে পরিবেশ দূষণ।
সাজ্জাদুল ইসলাম আরও জানান, আমি বিজ্ঞান বিভাগের স্টুডেন্ট থাকায় গবেষণা কাজে আমার মনযোগ বেশি। বিশেষ করে আমি দেশের বিশিষ্ট বিজ্ঞানীদের বিজ্ঞান বিষয়ক গবেষণা কাজগুলো মনযোগ দিয়ে পড়তাম, জানার চেষ্টা করতাম। ইউটিউবসহ বিভিন্ন মাধ্যম থেকে, বিশেষ করে দেশের বিশিষ্ট বিজ্ঞানী মোবারক আহমদ খান স্যারের গবেষণা কাজগুলো নিয়ে ভাবতাম। দেখতাম স্যার কিভাবে প্রাকৃতিক উপাদান থেকে পরিবেশবান্ধব নানা ব্যবহারিক পণ্য আবিষ্কার করেছেন। কয়েক বছর আগে পত্রিকায় দেখলাম বিজ্ঞানী ড. মোবারক স্যার, প্রাকৃতিক উপাদান থেকে পাট থেকে পলিথিন,ঢেউটিন তৈরি করেছেন, আবার পরিবেশবান্ধব প্লাস্টিক থেকে সোনালি ব্যাগ তৈরি করছেন। আর সেই দেখা-ভাবা, গবেষণা থেকেই আমি বিজ্ঞান বিষয়ক গবেষনা শুরু করি।
কেকে/ এমএস