দিনাজপুরের খানসামা উপজেলার আত্রাই নদী খননের পর উত্তোলিত বালু বছরের পর বছর নদীতীরে স্তূপ করে রাখার ফলে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তিত হয়েছে। বর্ষার পানিতে সেই বালুর বড় অংশ নদীতে ভেসে গিয়ে চরের সৃষ্টি করায় বর্তমানে নদীভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এতে একদিকে সরকারের কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত আশ্রয়ণ প্রকল্প হুমকির মুখে পড়েছে, অন্যদিকে নদীর পশ্চিম তীরের বিস্তীর্ণ ফসলি জমি ও বসতভিটা বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বালু নিলাম না হওয়ায় সরকার হারাচ্ছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় চার থেকে পাঁচ বছর আগে আত্রাই নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে খননকাজ পরিচালনা করা হয়। খননের সময় উত্তোলিত বিপুল পরিমাণ বালু নদীর বিভিন্ন স্থানে স্তূপ করে রাখা হয়। পরবর্তীতে স্থানীয় জনসাধারণের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে দিনাজপুর জেলা প্রশাসকের নির্দেশনায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের যৌথ উদ্যোগে কয়েকটি স্থানের বালু নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করা হয়। ওই নিলাম থেকে প্রায় ১০ লাখ টাকার সরকারি রাজস্ব আদায় হয়।
তবে গোবিন্দপুর ও বেলপুকুর মৌজার ‘বুদুর বাঁশের তল’ এলাকায় এখনো বিপুল পরিমাণ বালু অবিক্রীত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, পঞ্চগড় পানি উন্নয়ন বোর্ড ও দিনাজপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের মধ্যে প্রশাসনিক ও সীমানা সংক্রান্ত জটিলতার কারণে এসব বালু নিলাম প্রক্রিয়ার আওতায় আনা সম্ভব হয়নি।
দিনাজপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সংশ্লিষ্ট অংশের নদী খনন তাদের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়নি। অন্যদিকে পঞ্চগড় পানি উন্নয়ন বোর্ড দাবি করেছে, খানসামা ও বীরগঞ্জ অংশের খননকৃত বালু ও মাটি নিলামের জন্য প্রয়োজনীয় দায়িত্ব এবং কাগজপত্র আগেই দিনাজপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। দুই দপ্তরের এই অবস্থানের কারণে দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি অনিশ্চয়তার মধ্যে আটকে রয়েছে।
এদিকে বর্ষার পানিতে নদীতীরে স্তূপ করে রাখা বালুর বড় অংশ ধীরে ধীরে নদীগর্ভে মিশে গিয়ে বড় বড় চরের সৃষ্টি করেছে। ফলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে পানির চাপ নতুন দিকে সরে যাচ্ছে। এরই প্রভাবে নদীর পূর্ব তীরে অবস্থিত সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্প এখন সরাসরি ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। অন্যদিকে পশ্চিম তীরের কৃষিজমি ও বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, নদীর কয়েকটি স্থানে ভাঙন ইতোমধ্যে তীব্র আকার ধারণ করেছে। নদীর পাড়ের মাটি ধসে পড়ে আবাদি জমির আয়তন কমে যাচ্ছে। স্থানীয় কৃষকরা আশঙ্কা করছেন, চলতি বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে বহু পরিবার জমি ও বসতভিটা হারাতে পারে।
স্থানীয় ভুক্তভোগী বাদশা দেওয়ান, সুবাস চন্দ্র রায় ও সিরাজুল ইসলাম বলেন, খননকৃত বালু দ্রুত অপসারণ করা হলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় থাকত এবং বর্তমান ভাঙন পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না। তারা অভিযোগ করেন, প্রশাসনিক জটিলতার কারণে বছরের পর বছর বালু পড়ে থাকায় এখন সাধারণ মানুষকে এর খেসারত দিতে হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অবিক্রীত বালুর স্তূপ থেকে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ব্যক্তি নিজেদের প্রয়োজনমতো বালু নিয়ে যাচ্ছেন। এতে একদিকে সরকারি সম্পদের অপচয় হচ্ছে, অন্যদিকে সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে।
আলোকঝাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান খলিলুর রহমান বলেন, “আত্রাই ও করতোয়া—দুই নামেই পরিচিত এই নদীটি কয়েক বছর আগে খনন করা হয়েছিল। কিন্তু নিলামযোগ্য বিপুল পরিমাণ বালু এখনো পড়ে রয়েছে। দ্রুত নিলামের ব্যবস্থা না নেওয়ায় নদীভাঙন বাড়ছে এবং সরকারি সম্পদও নষ্ট হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে দ্রুত বালু নিলামের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। অন্যথায় নদীভাঙন আরও ভয়াবহ রূপ নেবে এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বাড়বে।”
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, নদী খননের মূল লক্ষ্য ছিল নাব্যতা বৃদ্ধি ও ভাঙন রোধ করা। কিন্তু খননের পর উত্তোলিত বালু যথাসময়ে অপসারণ না করায় সেই উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়েছে। বরং বর্তমানে ওই বালুর স্তূপই নদীর গতিপথ পরিবর্তন ও ভাঙনের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
এলাকাবাসী দ্রুত প্রশাসনিক জটিলতা নিরসন করে অবশিষ্ট বালু নিলামের মাধ্যমে অপসারণ এবং নদীভাঙন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। তাদের আশঙ্কা, দ্রুত পদক্ষেপ না নেওয়া হলে চলতি বর্ষা মৌসুমে আত্রাই নদীর ভাঙন আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে এবং আশ্রয়ণ প্রকল্পসহ বিস্তীর্ণ এলাকা হুমকির মুখে পড়বে।
কেকে/ এমএস