Wednesday 17 June 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

নেলসন ম্যান্ডেলার সেই ঐতিহাসিক রায় ও সংগ্রামের গল্প

ফারহানা নীলা সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
১২ জুন ২০২৬ ১৭:২৮

দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের ইতিহাসে একটি অবিস্মরণীয় নাম নেলসন ম্যান্ডেলা। প্রিটোরিয়ার রিভোনিয়া ট্রায়ালের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে তিনি যে অদম্য সাহসের পরিচয় দিয়েছিলেন, তা আজ কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়, বরং বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার ও মানবিক মর্যাদা রক্ষার লড়াইয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।

কাঠগড়ায় অজেয় নেতা

ষাটের দশকের শুরুতে দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী সরকারের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন ম্যান্ডেলা ও তার সহযোগীরা। সমঅধিকার ও একটি অসাম্প্রদায়িক সমাজের স্বপ্ন দেখার অপরাধে তাদের কাঠগড়ায় তোলা হয়। সরকার তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতা এবং সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্রের অভিযোগ এনেছিল। রিভোনিয়া ট্রায়াল নামের সেই দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়ায় ম্যান্ডেলা কেবল নিজের জীবন রক্ষার জন্য লড়াই করেননি, তিনি লড়েছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার কোটি মানুষের মুক্তির জন্য। ১৯৬৪ সালের ১২জুন প্রিটোরিয়ার প্যালের্তোস প্যালেস অফ জাস্টিসে যে রায় ঘোষণা করা হয়েছিল, তা কেবল নেলসন ম্যান্ডেলার ব্যক্তিগত জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়নি, বরং বদলে দিয়েছিল সারা বিশ্বের বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের গতিপথ। রিভোনিয়া ট্রায়ালের সেই রায় ম্যান্ডেলাসহ আটজন নেতাকে আমৃত্যু কারাবাসের নির্দেশ দিয়েছিল।

বিজ্ঞাপন

আদর্শের জয় ও কারাগারের দেয়াল

সেই ট্রায়ালের চূড়ান্ত রায়ে আদালত ম্যান্ডেলা ও তার সঙ্গীদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে এই দণ্ডাদেশ ছিল এক ধরনের নিষ্ঠুর পরীক্ষা। ম্যান্ডেলাকে পাঠানো হয় রবেন দ্বীপের নির্জন কারাগারে। পাথর ভাঙার কঠোর পরিশ্রম আর সমুদ্রের নোনা বাতাসের রুক্ষতার মাঝেও ম্যান্ডেলার মনোবল ছিল পাহাড়ের মতো অটল।

বন্দি থাকাকালীন তিনি বিশ্ববাসীর কাছে বর্ণবাদের বীভৎসতা তুলে ধরেন। কারাগারের চার দেয়াল তার কণ্ঠরোধ করতে পারেনি, বরং তার নীরবতা হয়ে উঠেছিল বিশ্বের বিবেকবান মানুষের প্রতি এক শক্তিশালী আহ্বান। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, একজন মানুষকে কারাবন্দী করা যায়, কিন্তু তার আদর্শ ও স্বপ্নকে শিকল পরাতে পারা অসম্ভব।

মানুষের জন্য লড়াই

ম্যান্ডেলার লড়াই ছিল ঘৃণার বিরুদ্ধে ভালোবাসার, বৈষম্যের বিরুদ্ধে সাম্যের। তিনি তার বিখ্যাত বক্তব্যে স্পষ্ট করে বলেছিলেন, তিনি এমন একটি গণতান্ত্রিক ও স্বাধীন সমাজের স্বপ্ন দেখেন যেখানে সব মানুষ সম্প্রীতি নিয়ে বসবাস করবে। তার এই দূরদর্শী চিন্তা ও ক্ষমাশীল মানসিকতা ছিল সেই সময়ের বর্ণবাদী শাসকগোষ্ঠীর জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। দীর্ঘ সাতাশ বছর পর যখন তিনি মুক্তি পান, তখন তিনি কেবল আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের নেতা ছিলেন না, তিনি হয়ে উঠেছিলেন বিশ্বজনীন শান্তির এক জীবন্ত প্রতীক।

ম্যান্ডেলার সেই ঐতিহাসিক বক্তব্য

এই বিচারের সময় ম্যান্ডেলার দেওয়া একটি বক্তব্য এখনো বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার ও স্বাধীনতার লড়াইয়ে অনুপ্রেরণা জোগায়। তিনি বলেছিলেন:

‘আমি শ্বেতাঙ্গদের আধিপত্যের বিরুদ্ধে লড়াই করেছি, আবার আমি কৃষ্ণাঙ্গদের আধিপত্যের বিরুদ্ধেও লড়াই করেছি। আমি একটি গণতান্ত্রিক ও স্বাধীন সমাজের আদর্শ লালন করেছি, যেখানে সব মানুষ সম্প্রীতি নিয়ে বসবাস করবে এবং সমান সুযোগ পাবে। এটি এমন একটি আদর্শ, যার জন্য আমি বেঁচে থাকতে চাই এবং এটি অর্জনের জন্য আমি মরতেও প্রস্তুত।’

ত্যাগ ও উত্তরণের পথ

নেলসন ম্যান্ডেলার পুরো জীবনটাই ছিল ত্যাগের এক মহাকাব্য। রিভোনিয়া ট্রায়ালে পাওয়া রায় তাকে দীর্ঘদিনের জন্য জনবিচ্ছিন্ন করলেও, তার সংগ্রাম থেমে থাকেনি। সেই বিচার ও রায় পরবর্তীতে দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদ বিলোপ এবং ১৯৯৪ সালে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিল। ম্যান্ডেলা দেখিয়েছিলেন, প্রতিকূলতা যত গভীরই হোক না কেন, ন্যায় ও সমতার পথে অবিচল থাকলে বিজয় একদিন আসবেই।

আজকের এই দিনে ম্যান্ডেলার সেই অবিস্মরণীয় সংগ্রামের কথা আমাদের আবারও মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষের মুক্তির লড়াই কোনো নির্দিষ্ট সীমানায় আটকে থাকে না। তার জীবনের প্রতিটি বাঁক আমাদের শিখিয়ে যায়, অন্ধকার সময় পেরোনোর পরই আসে স্বাধীনতার সোনালি ভোর।

বিজ্ঞাপন

আরো

ফারহানা নীলা - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর