যুদ্ধে ইরানের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও অর্থনীতি চাপ বেড়েছে © সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য সমঝোতা চুক্তিকে কূটনৈতিক সাফল্য ও প্রতিরোধের বিজয় হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে ইরানের নেতৃত্ব। যুদ্ধ-পরবর্তী অর্থনৈতিক সংকট, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার চাপ এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজনের মধ্যেও তেহরান দাবি করছে, ওয়াশিংটন ও তেলআবিব তাদের মূল লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। তবে দেশটির ভেতরে অনেকেই এই ব্যাখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।
সম্প্রতি সংঘাতের ফলে ইরানে ব্যাপক অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট এবং অর্থনৈতিক স্থবিরতা দেশটির জনগণের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে। এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতার উদ্যোগকে সরকার একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অর্জন হিসেবে তুলে ধরছে।
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ চুক্তিটিকে ‘চূড়ান্ত বিজয়ের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, ‘চুক্তিটি পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হলে তা ইরানের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সমস্যার সমাধানে ভূমিকা রাখতে পারে। এই সমঝোতা শুধু ইরান নয়, গোটা মধ্যপ্রাচ্যের জন্যও নতুন বাস্তবতা তৈরি করতে সক্ষম। ’
বিশ্লেষকদের মতে, গালিবাফের সমর্থন বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ তাকে কেবল মধ্যপন্থি রাজনৈতিক শিবিরের প্রতিনিধি হিসেবে দেখা হয় না। ফলে তার অবস্থান ইঙ্গিত করছে যে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ক্ষমতাকেন্দ্রের প্রভাবশালী অংশও এই সমঝোতার পক্ষে রয়েছে। তেহরানের যুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। তারা ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারেনি, ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে পারেনি এবং সামরিক শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচিও বন্ধ করতে পারেনি। বরং ইরান এখনো আলোচনার টেবিলে সক্রিয় অবস্থানে রয়েছে এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিলের বিষয়টিও আলোচনার অংশ হয়েছে।
তবে দেশের অভ্যন্তরে এই ব্যাখ্যা সর্বজনগ্রাহ্য নয়। পার্লামেন্টের কয়েকজন কট্টরপন্থি সদস্য চুক্তির খসড়ার সমালোচনা করে এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বৃদ্ধির সুযোগ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে যে রাষ্ট্রকে অবিশ্বাস করা হয়েছে, তার সঙ্গে আপসের মাধ্যমে জাতীয় স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তবে, সাম্প্রতিক সময়ে কট্টরপন্থিদের আপত্তি তুলনামূলকভাবে কমে এসেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সমঝোতা প্রক্রিয়ার অনুমোদন দেওয়ার কারণে প্রকাশ্যে বিরোধিতা করা কমেছে।
এদিকে অর্থনৈতিক বাস্তবতাও তেহরানকে আলোচনার পথে এগিয়ে যেতে বাধ্য করেছে। যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি, দীর্ঘমেয়াদি নিষেধাজ্ঞা, তেল রপ্তানিতে বাধা এবং ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি দেশটির অর্থনীতিকে চাপে ফেলেছে। ফলে সাধারণ মানুষের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—এই চুক্তি দ্রব্যমূল্য কমাবে কি না এবং নতুন কোনো যুদ্ধের ঝুঁকি হ্রাস করবে কি না।
যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরান চুক্তির শর্ত পূরণ করতে পারলে এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিল হলে দেশটি বিপুল অর্থনৈতিক সুবিধা পেতে পারে। এ সুযোগকে তেহরান পুনর্গঠন ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির সম্ভাবনা হিসেবে উপস্থাপন করছে। তবে চুক্তির ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চয়তায় ঘেরা। সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ, পারমাণবিক কর্মসূচির সীমা, আন্তর্জাতিক তদারকি ব্যবস্থা, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং লেবানন ও হরমুজ প্রণালি-সংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা এখনো শেষ হয়নি।
অন্যদিকে লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক তৎপরতা এবং ওয়াশিংটন-তেলআবিব সম্পর্কের টানাপোড়েনও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, অঞ্চলে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হলে পুরো সমঝোতা প্রক্রিয়াই ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। বিবিসি বাংলার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অনেক ইরানি নাগরিক চুক্তি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। কেউ এটিকে যুদ্ধ এড়ানোর বাস্তবসম্মত পথ হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ মনে করছেন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের নিশ্চয়তা ছাড়া এ ধরনের সমঝোতায় আস্থা রাখা কঠিন।
সব মিলিয়ে ইরানের নেতৃত্ব চুক্তিটিকে ‘বিজয়’ হিসেবে প্রচার করলেও এর প্রকৃত সফলতা নির্ভর করবে যুদ্ধের আশঙ্কা কমানো, অর্থনৈতিক চাপ হ্রাস, নিষেধাজ্ঞা শিথিল হওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার ওপর। তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা।