আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
কেন বার বার 'অশ্লীলতা' বিতর্কে চার হাজার বছরের পুরোনো নারী মূর্তি
- Author, প্রত্যুষ রায়
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, দিল্লি
- Published
- পড়ার সময়: ৫ মিনিট
লম্বাটে গোল চেহারা, নগ্ন দেহে পেটে হালকা মেদ স্পষ্ট, হাতে চুড়ি ও গলায় হার। কালো রংয়ের যে নারী মূর্তির বিবরণ দেওয়া হচ্ছে, সেটির বয়স আনুমানিক চার হাজার বছরেরও বেশি। সিন্ধু সভ্যতার হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারো প্রত্নস্থল খনন করে পাওয়া এই 'ডান্সিং গার্ল' আবারও বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।
সাম্প্রতিক বিতর্কটির সূচনা ভারতের ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ এডুকেশনাল রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং বা সংক্ষেপে এনসিইআরটি-র নতুন পাঠ্যবইকে ঘিরে। এনসিইআরটি প্রণীত ক্লাস সিক্স-এর সমাজবিজ্ঞান বইতে ওই মূর্তিটির ছবিতে বুক থেকে নিচের বেশকিছু অংশ পর্যন্ত ঢেকে দেওয়া হয়েছে।
এই বইয়ে 'সেন্সর' করা ছবি প্রকাশ্যে আসতেই ভারতজুড়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
কারো মতে, ডান্সিং গার্ল একটি শিল্পকর্ম এবং এটিকে শ্লীল-অশ্লীলের চশমা পরে বিচার করা উচিত নয়।
সোশ্যাল মিডিয়ায় উঠে আসা এই বক্তব্যগুলোকে নিজেই সমর্থন করেন এনসিইআরটি-এর টেক্সটবুক ডেভেলপমেন্ট কমিটির প্রধান মাইকেল ড্যানিও।
সংবাদ সংস্থা পিটিআইকে তিনি বলেন, "নগ্নতা মানেই অশ্লীল- এই ভাবনা ভিক্টোরিয়ান নৈতিকতার অংশ। আমরা ঔপনিবেশিকতার থেকে ভারতীয় শিক্ষাকে মুক্ত করার কথা বলেও এই মূর্তিকে যদি যথাযথভাবে উপস্থাপন না করি, তাহলে বুঝতে হবে কোথাও একটা বড় সমস্যা রয়েছে।"
মি. ড্যানিও জানান, "ক্লাস সিক্সের শিক্ষকদের সঙ্গে আমরা কথা বলেছিলাম। কারও মনে হয়নি এই মূর্তি অশ্লীল।"
"তবু আমাকে বলা হয়েছিল এই মূর্তি ক্লাস সিক্সের বাচ্চাদের জন্য উপযুক্ত নয়, আমাদের টিমও এই কথার সঙ্গে একমত হতে পারেনি," এই বলে মি. ড্যানিও শেষ করলেও কে বা কারা তাকে এই কথা বলেছিল, তা স্পষ্ট করেননি তিনি।
তবে এই বিতর্কই প্রথম বিতর্ক নয়। ১৯২৬ সালে মহেঞ্জোদারোর এইচআর অঞ্চল থেকে উদ্ধার করা মূর্তিটি ভারতের স্বাধীনতার শুরুর দিক থেকেই বার বার বিতর্কের মধ্যে জড়িয়েছে। তার মধ্যে বহু বিতর্ক 'অশ্লীলতার' সংজ্ঞা নিয়েই।
শালীনতা নিয়ে প্রশ্ন পাকিস্তানেও
১৯২৬ সালে এই মূর্তিটি আবিষ্কারের পর এটিকে অবিভক্ত ব্রিটিশ ভারতের লাহোরে রাখা হয়েছিল। সেই সময়েই দিল্লিতে 'সেন্ট্রাল ইম্পিরিয়াল মিউজিয়াম' তৈরি করতে শুরু করেছিল ব্রিটিশ সরকার।
তার কারণ, মাত্র কয়েক বছর আগেই কলকাতা থেকে দিল্লিতে রাজধানী স্থানান্তরিত হয়েছিল। কলকাতার মতোই তখনকার যুগের যাবতীয় সুযোগ সুবিধা দিল্লিতেও যাতে তৈরি হয়, সেই প্রচেষ্টা ছিল ব্রিটিশ সরকারের।
এই মিউজিয়ামটি এখন দিল্লির ন্যাশনাল মিউজিয়াম নামে পরিচিত।
পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে ঐতিহাসিক আশীষ কুমার জানান, ভারতের পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ বা আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার তৎকালীন ডিরেক্টর জেনারেল মর্টিমার হুইলার ১৯৪৪ সাল নাগাদ মহেঞ্জোদারো থেকে পাওয়া ১২ হাজারের বেশি পুরাকীর্তি দিল্লিতে নিয়ে আসেন।
এর কিছু বছর পরেই দেশভাগের সিদ্ধান্ত হয়।
হরপ্পার রংপুর (গুজরাত) ও কোটলা নিহাং খান (পাঞ্জাব)-এর মতো কিছু ছোটো পুরাতাত্বিক অঞ্চল ভারতে পড়েছিল। কিন্তু মহেঞ্জোদারোর মতো বৃহৎ এবং গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলটি পাকিস্তানের অংশে পড়ে।
ইতিহাসবিদ আশীষ কুমার লিখেছেন, "যেহেতু হরপ্পা সভ্যতার সব নিদর্শন মহেঞ্জোদারো থেকেই পাওয়া গিয়েছিল এবং মহেঞ্জোদারো পাকিস্তানের অংশেই পড়ছিল, সেহেতু পাকিস্তান প্রথমে দাবি করেছিল সব পুরকীর্তিই যেন পাকিস্তানে ফেরানো হয়।"
পরে অবশ্য এএসআই-এর ডিরেক্টর জেনারেল মর্টিমার হুইলারের মধ্যস্থতায় ঠিক হয় যে, মহেঞ্জোদারো ও চানহুদারোয় প্রাপ্ত পুরাকীর্তিগুলো ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে আধাআধি ভাগ হবে।
প্রথমে পাকিস্তান দুটি গুরুত্বপূর্ণ মূর্তি, 'ডান্সিং গার্ল' ও 'প্রিস্ট কিং' দুটিই দাবি করেছিল। কিন্তু ভারত যে কোনো একটি দিতে রাজি হয়।
মি. কুমার বলেন, "পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের মনে হয়েছিল যে এই নগ্ন ডান্সিং গার্ল সেই দেশের ধর্মীয় নৈতিকতার সঙ্গে খাপ খায় না এবং এর ফলে মানুষের ধর্মীয় আবেগে আঘাত লাগতে পারে।"
ফলে 'প্রিস্ট কিং' পাকিস্তানে চলে গেলেও 'ডান্সিং গার্ল' রয়ে যায় দিল্লির ন্যাশনাল মিউজিয়ামে। যদিও ডান্সিং গার্লকে পাকিস্তানে ফেরানোর দাবি করে সম্প্রতি ২০১৬ সালে লাহোর হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন দাখিল কড়েছেন জাভেদ ইকবাল জাফরি নামক জনৈক ব্যক্তি।
End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন
ভারতেও ডান্সিং গার্লকে 'শালীন' করে তোলার প্রচেষ্টা
২০২৩ সালে আন্তর্জাতিক মিউজিয়াম মেলার আসর বসে ভারতে। ওই মেলার ম্যাসকট ঠিক করা হয় ড্যান্সিং গার্লকে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ওই মূর্তির একটি রেপ্লিকা উদ্বোধন করলে তা নিয়ে বিতর্ক দানা বাঁধে।
ওই মূর্তির রেপ্লিকাটিকে পরানো হয়েছিল গোলাপী রংয়ের ব্লাউজ জাতীয় পোশাক। আর নিম্নাঙ্গে ছিল গুজরাতি ঐতিহ্যবাহী নকশা সম্বলিত একটি হলুদ ধুতির মতো পোশাক।
সেই সময়েও ডান্সিং গার্লকে 'শালীন' করে তোলার প্রচেষ্টা বেশ সমালোচিত হয়েছিল সমাজমাধ্যমে।
যদিও ভারত সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য ছিল, এই পোশাক তো আসল ডান্সিং গার্লকে পরানো হয়নি। বরং "ম্যাসকট হওয়ার জন্য রেপ্লিকাটিকে উপযুক্ত করে তোলার জন্য" এই পোশাক পরানো হয়েছে।
এ ছাড়াও ২০১৭ সালে বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত একটি হিন্দি প্রবন্ধ ঘিরে তৈরি হয় বিতর্ক। ওই প্রবন্ধটির নাম ছিল 'বৈদিক সভ্যতা কা পুরাতত্ত্ব' বা বাংলায় 'বৈদিক সভ্যতার পুরাতত্ত্ব'।
বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপাপ্ত গবেষক ওই মূর্তিটিকে 'দেবী পার্বতীর রূপ' বলে বর্ণনা করেন ও দাবি করেন ভাঁজ করা হাতের ভঙ্গিমাটি আসলে কলসী ধরার ভঙ্গিমা যা দেবীর 'অক্ষয় পাত্র'-এর দিকে নির্দেশ করে।
এই লেখা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। যদিও আজ পর্যন্ত কোনো গবেষক ও ঐতিহাসিক এই মূর্তিকে 'বৈদিক সভ্যতা' বা কোনো হিন্দু দেবদেবীর সঙ্গে যুক্ত বলে মনে করেননি।
কেন গুরুত্বপূর্ণ ডান্সিং গার্ল?
এই মূর্তিটির ভঙ্গিমা দেখে সেটির পোশাকী নাম দেওয়া হয়েছিল 'ডান্সিং গার্ল'। যদিও বেশিরভাগ ঐতিহাসিকই মনে করেন যে এই মূর্তিটি আসলে নৃত্যরত নয়।
একইভাবে 'প্রিস্ট কিং' মূর্তিটির নামও পোশাকী, কারণ হরপ্পায় কোনো কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থা, রাজা বা প্রশাসকের অস্তিত্বের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এমনকি এই সভ্যতার ধর্মাচরণও আমাদের অজানা।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত ড. সাঙ্গারালিঙ্গম রমেশ বিবিসিকে বলেছেন, "প্রত্নতাত্বিক ও নৃতত্ববিদরা এখনো রাজত্ব ব্যবস্থার কোনো চিহ্ন খুজে পাননি। মনে করা হয়, নগরসমিতির মাধ্যমেই যাবতীয় গুরুত্বপূর্ণ সব সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো। রাজপ্রাসাদ ও অভিজাত্যের কোনো চিহ্ন নেই।"
ঐতিহাসিক গ্রেগরি এল পোসেহল তার বই 'দ্য ইন্দাস সিভিলাইজেশন'-এ প্রথম সন্দেহ প্রকাশ করেন এই মূর্তিটি আদৌ নৃত্যরত কি না। তার দাবিকে সমর্থন করেন ঐতিহাসিক উপিন্দর সিং।
তিনি তার বই 'হিস্ট্রি অফ এনশিয়ান্ট অ্যান্ড আর্লি মিডিয়ভেল ইন্ডিয়া'তে লিখেছেন, "মেয়েটি সম্ভবত নাচ করছে না। যদিও বা করে, সে মোটেও একজন পেশাদার নৃত্যশিল্পীর মতো দেখতে না।"
এই দাবিকে সমর্থন জানিয়ে ইতিহাসবিদ আশীষ কুমার বলেন, ব্রিটিশ কর্মচারীরা প্রায়ই ভারতীয় নারী নর্তকীদের সঙ্গে সময় কাটাতে ভালোবাসতেন। এই নারীদের তারা বলতেন 'নচ গার্লস'। এই 'নচ' কথাটি সম্ভবত ভারতীয় ভাষার 'নাচ' শব্দ থেকে এসেছে।
যে সময়ে সিন্ধু সভ্যতার নগরীগুলোতে খননের কাজ চলছিল, তখন এএসআই-এর ডিরেক্টর জেনারেল ছিলেন স্যার জন মার্শাল। তার নেতৃত্বেই চলছিল খননকার্য।
আশীষ কুমার বলেন, "মার্শালও এই মূর্তিটিকে দেবদাসী প্রথার সঙ্গে যুক্ত করে বিচার করেছিলেন।"
যে ব্যক্তি ২০১৬ সালে মূর্তিটি ফিরিয়ে নিয়ে আসার জন্য লাহোর হাইকোর্টে মামলা করেছেন, তিনি তার পিটিশনে লিখেছেন, "পাকিস্তানে এই মূর্তির ঐতিহাসিক গুরুত্ব ততটাই যতটা ইউরোপে লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির মোনালিসার গুরুত্ব।"
অন্যদিকে মহারাষ্ট্রের পুনেতে অবস্থিত ডেকান কলেজের উপাচার্য বসন্ত শিন্দে দাবি করেছেন, "হরপ্পার পুরাকীর্তি কোনো একটি দেশের নয়, বরং সমগ্র দক্ষিণ এশিয়া এই সভ্যতার শরিক।"