যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তির খসড়া প্রকাশ, নিষেধাজ্ঞা শিথিলসহ নানা প্রতিশ্রুতি
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত হতে যাওয়া সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) খসড়ায় তেহরানের জন্য ব্যাপক অর্থনৈতিক সুবিধার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ইরানি তেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল, ধাপে ধাপে জব্দকৃত অর্থ ছাড় এবং দেশটির পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলার অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি।
মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোতে প্রকাশিত চুক্তির খসড়া অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান রোববার (১৪ জুন) ডিজিটালভাবে সমঝোতা স্মারকে সম্মত হয়েছে। চূড়ান্ত স্বাক্ষর অনুষ্ঠান আগামী শুক্রবার (১৯ জুন) সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। খবর মিডল ইস্ট আইয়ের।
ব্লুমবার্গের হাতে পাওয়া খসড়া নথিতে দেখা যায়, চুক্তিতে ইরানের জন্য বড় ধরনের অর্থনৈতিক সুবিধা থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধকালীন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি।
বিশেষ করে, ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি কিংবা অন্যান্য সামরিক সক্ষমতা নিয়ে কোনো তাৎক্ষণিক বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়নি। এছাড়া লেবাননকে যুদ্ধবিরতির আওতায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা দীর্ঘদিন ধরে ইরানের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল।
চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো
খসড়া অনুযায়ী—
১. যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং তাদের মিত্ররা সব ফ্রন্টে যুদ্ধের তাৎক্ষণিক ও স্থায়ী অবসানে সম্মত হয়েছে।
২. উভয় পক্ষ সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের যৌথ অঙ্গীকার করেছে।
৩. ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র আগামী ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত শান্তি চুক্তি নিয়ে আলোচনা করবে এবং প্রয়োজন হলে বর্তমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়াবে।
৪. যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালিতে আরোপিত নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করতে সম্মত হয়েছে। এছাড়া চূড়ান্ত চুক্তির ৩০ দিনের মধ্যে আশপাশের অঞ্চল থেকে মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহারের বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে, যদিও এর সুনির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমা পরিষ্কার নয়।
৫. ইরান হরমুজ প্রণালিতে আরোপিত অবরোধ ও সব ধরনের প্রতিবন্ধকতা তুলে নিতে সম্মত হয়েছে।
৬. ইরানের পুনর্বাসন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলার অর্থায়ন নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র সম্মত হয়েছে। এই অর্থায়ন চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হিসেবে ৬০ দিনের মধ্যে বাস্তবায়িত হবে।
৭. যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর আরোপিত সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা ধাপে ধাপে প্রত্যাহার করতে সম্মত হয়েছে। এর মধ্যে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) এবং যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা (প্রাথমিক ও গৌণ) নিষেধাজ্ঞাগুলোও অন্তর্ভুক্ত। তবে এ প্রক্রিয়ার নির্দিষ্ট সময়সীমা উল্লেখ করা হয়নি।
৮. ইরান পুনর্ব্যক্ত করেছে যে তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না। একইসঙ্গে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ও বৃহত্তর পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ চূড়ান্ত চুক্তিতে নির্ধারণ করা হবে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করার কোনো শর্ত এতে নেই।
৯. ইরান আগামী ৬০ দিনে তার পারমাণবিক কর্মসূচি আর এগিয়ে নেবে না। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে না এবং অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতিও বৃদ্ধি করবে না।
১০. যুক্তরাষ্ট্র ইরানি তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য বিক্রির জন্য নিষেধাজ্ঞা ছাড় দেবে। এর আওতায় ব্যাংকিং, বীমা, পরিবহনসহ সংশ্লিষ্ট সব সেবাও থাকবে।
১১. আগামী ৬০ দিনের আলোচনার অগ্রগতির ভিত্তিতে ইরান তার জব্দকৃত বা স্থগিত তহবিলে প্রবেশাধিকার পাবে।
১২. চূড়ান্ত চুক্তির বাস্তবায়ন ও তদারকির জন্য একটি কার্যকর বাস্তবায়ন ব্যবস্থা গঠন করা হবে।
১৩. চুক্তির ৪, ৫, ১০ ও ১১ নম্বর ধারার বাস্তবায়ন শুরু হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান চূড়ান্ত শান্তি চুক্তি নিয়ে আলোচনার কাঠামো অব্যাহত রাখবে।
১৪. চূড়ান্ত শান্তি চুক্তি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বাধ্যতামূলক প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদিত হবে।
তবে এখনও চুক্তির পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত পাঠ প্রকাশ করা হয়নি। ফলে খসড়ায় থাকা সব বিষয় শেষ পর্যন্ত অপরিবর্তিত থাকবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক