লিওনেল মেসি বিশ্বকাপ উঁচিয়ে ধরেছেন। এবার তাঁর সামনে সুযোগ অবসরে যাওয়ার আগে নিজের শোকেসে দ্বিতীয় বিশ্বকাপটি যোগ করার। কিন্তু চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর গল্পটা একটু ভিন্ন। ক্লাব ফুটবলের সব বড় বড় ট্রফি আছে তাঁর শোকেসে, আছে পর্তুগালের হয়ে ইউরো জয়ের গৌরবও।
কিন্তু ওই একটি সোনালি ট্রফি এখনো অধরা পর্তুগাল মহাতারকার। ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই নায়কের সামনে সেই স্বপ্নের বিশ্বকাপ জেতার সম্ভবত এটাই শেষ সুযোগ। তবে এবার রোনালদো একা নন, পর্তুগালের পুরো দল এবং কোচ—সবাই একজোট হয়ে তাঁর পেছনে দাঁড়িয়েছেন।
গত বিশ্বকাপে রোনালদোর সঙ্গে তৎকালীন কোচ ফার্নান্দো সান্তোসের সঙ্গে একধরনের দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। প্রথম একাদশ থেকে রোনালদোকে বাদ দেওয়ার মতো দুঃসাহসী সিদ্ধান্তও নিয়েছিলেন তিনি। রোনালদো এতে স্বাভাবিকভাবেই খুশি ছিলেন না। কারণ, তিনি এমন একজন মানুষ, মাঠে লড়তে চান, ডাগআউটে বসে ম্যাচ দেখতে নয়। এত বিশাল প্রোফাইলের এক খেলোয়াড় বেঞ্চে বসে থাকবেন ভাবাই যায় না!
আমার বিশ্বাস, এবার আর গতবারের পুনরাবৃত্তি হবে না। বর্তমান কোচ রবার্তো মার্তিনেজ স্পষ্ট করেই বলে দিয়েছেন, রোনালদোর জন্য ট্রফি জিততে একতাবদ্ধ। কোচ হিসেবে তিনিও পাশে আছেন।
মার্তিনেজ নিশ্চয়ই রোনালদোকে সর্বোচ্চ খেলার সুযোগ দিয়ে খুশি রাখতে চাইবেন, আর রোনালদো খুশি থাকলে পুরো দলও উজ্জীবিত থাকবে। দিন শেষে লাভটা হবে পর্তুগাল দলেরই।
এই বিশ্বকাপে খেলতে আসা ফুটবলারদের মধ্যে ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে রোনালদোর গোলই সবচেয়ে বেশি। বয়স এখন ৪১ হলেও পর্তুগাল দলের সবচেয়ে অভিজ্ঞ এই সেনানী এখনো ম্যাচ ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো অবিশ্বাস্য ক্ষমতা রাখেন। এই বিশ্বকাপটা জিতলে তাঁর বর্ণাঢ্য ফুটবলজীবন পূর্ণতা পাবে। রোনালদোর জন্য অনেক শুভকামনা থাকল।
পর্তুগাল দলটা এবার সব দিক থেকেই বেশ শক্তিশালী। বিশেষ করে তাদের মাঝমাঠের ধার অসাধারণ। মাতেউস নুনেস, ব্রুনো ফার্নান্দেজ, বের্নার্দো সিলভা বা জোয়াও নেভেসরা ছন্দে আছেন। আক্রমণে রোনালদোর সঙ্গী হিসেবে আছেন রামোস ও জোয়াও ফেলিক্সের মতো তারকারা।
ফলে এই পর্তুগালকে বিশ্বকাপের অন্যতম ফেবারিট বলাই যায়। তাদের একমাত্র সমস্যা হলো, বড় টুর্নামেন্টের নকআউট পর্বের মানসিক চাপে ভেঙে পড়া। তবে এবার দলে যে অভিজ্ঞতা আর তারুণ্যের মিশ্রণ আছে, তাতে লিসবনে বিশ্বকাপ ট্রফি গেলে অবাক হব না।
ব্যক্তিগতভাবে রোনালদোর সঙ্গে আমার কখনো সামনাসামনি দেখা হয়নি। তবে লা লিগায় ধারাভাষ্য দিতে গিয়ে কাছ থেকে তাঁকে দেখেছি। সান্তিয়াগো বার্নাব্যুর গ্যালারিতে বসে উপভোগ করেছি রোনালদোর পায়ের জাদু। অনেক বছর আগে ডেনমার্কে বসে ডেনমার্ক বনাম পর্তুগালের একটি ম্যাচও দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার।
আশা করি, ভবিষ্যতে কখনো তাঁর সঙ্গে সামনাসামনি দেখা হবে। আর যদি কখনো সেই সুযোগ আসে, ওনাকে বাংলাদেশের একটা জার্সি উপহার দেওয়ার খুব ইচ্ছা আমার।
সুযোগ পেলে আমি অবশ্য মেসির সঙ্গেও দেখা করতে চাইব। বছর ২০ ধরে এই দুজন মানুষ আমাদের যে অবিশ্বাস্য বিনোদন দিয়ে গেছেন, তার ঋণ শোধ হওয়ার নয়। দুজনই ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে। তাই মনেপ্রাণে চাইব, শেষটা যেন রোনালদো নিজের মতো করে রাঙিয়ে যেতে পারেন।
যদিও আমি নিজে ব্রাজিলের কড়া সমর্থক, তবু ব্যক্তিগতভাবে আমার বিন্দুমাত্র মন খারাপ হবে না যদি বিশ্বকাপ ট্রফিটা এবার রোনালদোর হাতে ওঠে। অবশ্য আইকন ফুটবলার হিসেবে আমার সব সময়ের ফেবারিট শীর্ষ তিন খেলোয়াড় ব্রাজিলের রোনালদো, জিনেদিন জিদান ও রোনালদিনহো।
মেসি, না রোনালদো—কে সেরা, এ আলোচনাটা এখন কিছুটা থিতিয়ে এলেও মেসি হলেন ‘গোট’, অর্থাৎ সর্বকালের সেরা। তবে রোনালদোকেও আমি ‘গোট’ বলতে দ্বিধা করব না। তিনি এক নিখুঁত ‘গোলমেশিন’। পেনাল্টি বক্সের ভেতর যেকোনো রক্ষণের জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক খেলোয়াড়।
মেসি গোল করার পাশাপাশি গোল তৈরিও করেন অনেক। তবে দুজনের খেলার স্টাইল আলাদা, তাই তুলনা না করে তাঁদের খেলা উপভোগ করাই ভালো। শেষের মঞ্চের শুরুতে দারুণ কিছু হোক, সিআর সেভেন!
লেখক: জাতীয় ফুটবল দলের অধিনায়ক