এস এম নাসিম

  ০৭ এপ্রিল, ২০২৬

হামে শিশুমৃত্যু ও আমার শিক্ষকের স্মৃতি 

মাস্টার ওমর আলী। আমার গ্রামের সবচেয়ে বিজ্ঞ ও প্রবীণ মানুষ। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক। তিনি রামকৃষ্ণপুর বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। আমি ছিলাম সেই স্কুলেরই ছাত্র। আমার পড়ালেখার প্রথম হাতেখড়ি হয়েছিল ওই বেসরকারি স্কুলের এই শিক্ষকের কাছে। আমরা একই গ্রামের হওয়ায় আমি তাকে ‘স্যার’ না বলে ‘চাচা’ বলে ডাকতাম। এতে তিনি কখনো আপত্তি করেননি। শিশুকালের অনেক স্মৃতি আজ আর স্পষ্ট মনে নেই, তবে ওমর আলী চাচার পড়ানোর কিছু দৃশ্য এখনো হৃদয়ে গেঁথে আছে। তিনি আমাদের ছন্দে ছন্দে পড়াতেন। একবার সম্ভবত স্কুলে কোনো শিক্ষা কর্মকর্তা এসেছিলেন। সে কারণে তিনি আগের দিনই আমাদের সবাইকে পরিপাটি হয়ে আসতে বলেছিলেন। সেদিন তিনি আমাদের স্লোগানের মাধ্যমে পড়িয়েছিলেন, যা আজও আমার কানে বাজে। সেই স্লোগানটি ছিল-

রোদ-বৃষ্টিতে ছাতা যেমন,

‘ছয়টি রোগের টিকা তেমন।

হাম, যক্ষ্মা, হুপিংকাশি

দূর হলে ভাই, আমরা বাঁচি।’

ওমর আলী স্যার আমাদের বুঝিয়েছিলেন টিকার গুরুত্ব কতটা অপরিহার্য। সম্ভবত সেই বছরই আমি পাশের প্রামে একটি সরকারি স্কুলে ভর্তি হই। এরপর স্কুল, কলেজ পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে কতশত শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ ও স্লোগান দিয়েছি, তার হিসাব নেই। কিন্তু ওমর আলী চাচার শেখানো সেই স্লোগান ‘হাম, যক্ষ্মা, হুপিংকাশি, দূর হলে ভাই আমরা বাঁচি’ আজও ভুলতে পারিনি।

গত ৩১ মার্চ দৈনিক প্রতিদিনের সংবাদ পত্রিকায় ‘টিকাহীনতায় মাশুল দিচ্ছে শিশুরা, ঝরছে প্রাণ’ শিরোনামে আমার একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনটি লিখতে গিয়ে আমি বার বার থমকে গিয়েছিলাম। বার বার মনে পড়ছিল সেই শিশুকালের কথা, ওমর আলী চাচার দেওয়া শিক্ষা, তার কণ্ঠে শোনা সেই স্লোগান। এত মধুর স্লোগান আমার জীবনে আর কখনো আসেনি।

বাংলাদেশ একসময় বিশ্বের কাছে টিকাদান কর্মসূচির এক রোল মডেল ছিল। গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিনেশন অ্যান্ড ইমিউনাইজেশন এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থা বাংলাদেশের এই সাফল্যকে স্বীকৃতি দিয়ে ‘ভ্যাকসিন হিরো’ হিসেবে ভূষিত করেছিল। সেই অর্জন ছিল সরকারের দীর্ঘমেয়াদি জনস্বাস্থ্য বিনিয়োগ ও মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরলস পরিশ্রমের ফসল। দেশের টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) ছিল অত্যন্ত সুশৃঙ্খল এবং চেইন অব কমান্ড ছিল অটুট।

সম্প্রতি রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা খবর আমাদের অবাক করে দিচ্ছে। চলতি মার্চ মাসে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, কেবল হাম ও সংশ্লিষ্ট জটিলতায় শিশুমৃত্যুর সংখ্যা ১৪৯ ছাড়িয়ে গেছে। বিশেষ করে ‘হাম’ শব্দটি আজ দেশের মা-বাবার কাছে এক আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। চোখের সামনে ছোট ছোট শিশুসন্তানকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েেত দেখে তাদের বাবা-মায়ের আত্নচিৎকারে ভারী হচ্ছে আকাশ বাতাস। সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে গত এক মাসে শতাধিক শিশুর মৃত্যু কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি আমাদের পুরো স্বাস্থ্য খাতের দেউলিয়াপনার এক বাস্তব দলিল। ৩০ মার্চ পর্যন্ত দেশজুড়ে এই ‘হাম ট্র্যাজেডি’ জনমনে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। সম্প্রতি বিএনপি সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন এক অনুষ্ঠানে বলেন, বিগত আট বছর দেশে হামের কোনো টিকাই দেওয়া হয়নি। শুধু তাই নয়, পাঁচ বছর ধরে হয়নি হাম টিকার ক্যাম্পেইন। যার ফলে, দেশের ৫৬ জেলার অবস্থা খুবই ভয়াবহ। হাম আক্রান্ত অন্তত ৯ হাজার শিশুর জীবন এখন বাঁচা-মরার দোলাচলে। আওয়ামী লীগ আমলের সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের বিরুদ্ধেও মিলছে নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ। জানা গেছে, তার নামে বৈশ্বিক মহামারি করোনাকালে করোনার টিকা, কিট, নকল মাস্ক বানিয়ে ও ভুয়া আমদানি দেখিয়ে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।এমনকি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বিভিন্ন হাসপাতালের ক্রয়, নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি, পদায়ন, চিকিৎসাসেবা, চিকিৎসায় ব্যবহৃত ইকুইপমেন্ট, ওষুধ সরবরাহসহ বিভিন্ন প্রকল্পের উন্নয়নমূলক কাজে ভাগ বসিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

জাহিদ মালেকের নামে অভিযোগ রয়েছে, দুর্নীতির এসব টাকা দিয়ে নামে-বেনামে এক ডজনের বেশি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। ঢাকার গুলশানে আলিশান বাড়ি, গ্রামের বাড়িতে মায়ের নামে বিশাল বাগানবাড়ি এবং অ্যাগ্রো ফার্ম তৈরি করেছেন। তাছাড়া বনানীতে ১৪ তলা ও মানিকগঞ্জে ১০ তলা বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ করেছেন। সেইসঙ্গে বাংলাদেশ থাই অ্যালুমিনিয়াম লিমিটেড, সানলাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড, বিডি থাইফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেড, রাহাত রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন লিমিটেড, বিডি সানলাইফ ব্রোকারেজ হাউজ লিমিটেডের মতো প্রতিষ্ঠানে অনিয়মকে নিয়মে পরিণত করেছিলেন।

করোনাকালে মুন্সীগঞ্জের একটি কারখানায় এন-৯৫ নকল মাস্ক তৈরি করে ভুয়া আমদানি দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব মাস্ক হাসপাতালের চিকিৎসকদের দেওয়া হতো। এই কাজের সঙ্গে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ছেলে রাহাত মালেক, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব আসাদুল ইসলাম এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক ডা. আবুল কালাম আজাদ জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জেএমআই গ্রুপের মাধ্যমে কয়েকশ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগও বিভিন্ন গণমাধ্যমে উঠে এসেছে।

করোনাকালে দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, স্বাস্থ্যখাতে অনিয়ম, দুর্নীতি এবং অযোগ্যতার কারণে করোনাভাইরাস সংকট আরো প্রকট হয়েছে। এই দুর্যোগকালীন পরিস্থিতিতে ৫ থেকে ১০ গুণ বেশি দামে মানহীন মাস্ক, পিপিইসহ সুরক্ষা সামগ্রী সরবরাহ করা হয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়।

এসব অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে শিশুদের জীবন রক্ষাকারী টিকার বিষয়টি অবহেলিত হয়েছে। ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির নির্বাচনের পর স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান ডা. সামন্ত লাল সেন। শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে তিনি যথাযথভাবে দায়িত্ব পালনের প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে কাক্সিক্ষত পরিবর্তন আসেনি। হাসপাতাল পরিচালনায় অভিজ্ঞতা থাকলেও জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা ও বৈশ্বিক ভ্যাকসিন কূটনীতি বিষয়ে পর্যাপ্ত গুরুত্ব না দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ফলে ভ্যাকসিনের সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে, যার মূল্য দিচ্ছে দেশের শিশুরা।

শিশুমৃত্যুর এই ক্রমবর্ধমান মিছিল দেখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন উত্তাল। অনেকেই এ পরিস্থিতির জন্য সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। মহাখালীর আইডিএইচ সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের মার্চ মাসেই হামের রোগী ভর্তি হয়েছে ৪৪৮ জন। ২০২০ সালের পর আর কোনো বড় টিকাদান ক্যাম্পেইন হয়নি। করোনার কারণে ৩১ শতাংশ শিশু সময়মতো টিকা পায়নি। এছাড়া টিকা সংকটও পরিস্থিতিকে আরো জটিল করেছে। গত ১৫ মার্চ থেকে গত মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত পাঁচ হাজার ১১৯২ জন শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছে। এর মধ্যে ১৪৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। বর্তমান সরকার হামের টিকা কার্যক্রম জোরদার করতে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। ৫ এপ্রিল থেকে জরুরি ভিত্তিতে দেশব্যাপী টিকাদান কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ৬ মাস থেকে ১০ বছর বয়সি শিশুদের এই কর্মসূচির আওতায় আনা হচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্যকর্মীদের সব ধরনের ছুটি বাতিল করেছে, যাতে নিরবচ্ছিন্ন চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা যায়। এবার ঈদে আমার শিক্ষক সেই চাচার সঙ্গে দেখা হয়েছিল। বয়সের ভারে তিনি অনেকটা নুয়ে পড়েছেন। কেমন আছেন জানতে চাইলে বললেন, ভালো নেই। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিসসহ বয়সজনিত নানা রোগ শরীরে বাসা বেঁধেছে, তবুও চাচার মেধা ও বিচক্ষণতা একটুও কমেনি। চাচা খুব আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার বাচ্চাটা কেমন আছে? আমি কোনো উত্তর দিতে পারিনি। কারণ মনে এক অজানা ভয় কাজ করছিল। কারণ আপনার শেখানো সেই স্লোগান বাংলাদেশ বাস্তবায়ন করতে পারেনি। হাম দূর হয়নি, বরং হাম-রুবেলার আতঙ্ক আমাদের তাড়া করে বেড়াচ্ছে। এখনো খালি হচ্ছে মায়ের বুক।

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়