ড. সুস্মিতা দাস

  ১০ মে, ২০২৬

রবীন্দ্র দর্শনে কৃষি ও সমবায়: আধুনিক বাণিজ্যিক কৃষির নেপথ্য আলোকবর্তিকা

‘মর্ত্যলোকে আমায় যদি ডাকো, তবে আমি ধূলির ধরণীর এই মাটির কোলটিকেই বেছে নেব।’—মাটির প্রতি এই নিবিড় অনুরাগ কেবল কবির কল্পনা ছিল না, ছিল এক সুদূরপ্রসারী কর্মযজ্ঞের ভিত্তি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন জমিদারি পরিচালনার প্রয়োজনে শিলাইদহ, শাহজাদপুর আর পতিসরের পদ্মাবিধৌত জনপদে পা রাখলেন, তখন তাঁর কবিসত্তা ছাপিয়ে জেগে উঠল এক সমাজসংস্কারক ও কৃষিবিজ্ঞানী সত্তা। তিনি দেখলেন, পল্লীজননী আজ রিক্ত, কৃষকের ললাটে ঋণের দুঃসহ ছাপ। লাঙল-জোয়াল কাঁধে নিয়ে দারিদ্র্যের আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে গ্রামীণ সমাজ, আর আধুনিক শিক্ষা ও বিজ্ঞান থেকে তারা যোজন যোজন দূরে। সেই হাহাকার থেকেই শুরু হলো তাঁর আজীবন কৃষি-সাধনা। রবীন্দ্রনাথ বুঝতে পেরেছিলেন, ভারতকে জানতে হলে তার গ্রামকে জানতে হবে, আর গ্রামকে বাঁচাতে হলে কৃষিকে আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত করতে হবে।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির আবাহন: আধুনিকতার অগ্রদূত : রবীন্দ্রনাথ জানতেন, কেবল হাড়ভাঙা খাটুনি কৃষকের ভাগ্যোন্নয়ন ঘটাতে পারবে না যদি না তার সাথে বিজ্ঞানের মিলন ঘটে। তিনি লিখেছিলেন, "চাষী যদি চাষের সঙ্গে বিদ্যাকে যোগ না দেয় তবে তার সেই চাষ কেবল গায়ের জোরে টিঁকে থাকে।" তাঁর এই বিশ্বাস এতটাই প্রবল ছিল যে, নিজের সন্তান রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং বন্ধুপুত্র সন্তোষচন্দ্র মজুমদারকে তিনি সাগর পাড়ি দিয়ে আমেরিকার ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়েছিলেন আধুনিক কৃষিবিদ্যা ও পশুপালন শেখার জন্য। উদ্দেশ্য ছিল—বিদেশি উচ্চশিক্ষা শেষে তারা যেন বিলাসিতায় না ডুবে বাংলার কর্দমাক্ত মাটিতে আধুনিক বিজ্ঞানের বীজ বপন করে।

আজ আমরা যখন বাংলাদেশের মাঠে মাঠে কম্বাইন হারভেস্টার কিংবা ড্রোনের স্বপ্ন দেখছি, রবীন্দ্রনাথ এক শতাব্দী আগেই পতিসরের মাঠে 'কলের লাঙল' (ট্রাক্টর) নামিয়ে সেই যান্ত্রিক বিপ্লবের সূচনা করেছিলেন। শুধু যন্ত্র নয়, তিনি প্রবর্তন করেছিলেন উচ্চফলনশীল জাতের বীজ। তাঁর হাত ধরেই তৎকালীন পূর্ববঙ্গের কৃষিতে প্রথম এসেছে আলুর চাষ, টমেটো, আমেরিকার ভুট্টা কিংবা উন্নত জাতের ফসলের বীজ। তাঁর প্রবর্তিত সেই আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি আজকের বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) বা ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (BRRI) মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর বৈজ্ঞানিক গবেষণার পথপ্রদর্শক।

ঋণমুক্তি ও সমবায়ের শক্তি: পতিসর কৃষি ব্যাংক : তৎকালীন মহাজনদের শোষণ থেকে কৃষককে বাঁচাতে কবির হৃদয়ে যে রক্তক্ষরণ হয়েছিল, তারই ফসল ছিল ‘পতিসর কৃষি ব্যাংক’। কবি তাঁর নোবেল পুরস্কারের সেই ঐতিহাসিক অর্থের বিশাল এক অংশ—যা সেকালে প্রায় ৮০ হাজার টাকা ছিল—বিনিয়োগ করেছিলেন এই ব্যাংকে। তিনি চেয়েছিলেন কৃষক যেন পরমুখাপেক্ষী না হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে। সমবায়ের শক্তিতে তাঁর ছিল অগাধ বিশ্বাস। তিনি বলেছিলেন— "আমাদের দেশের অভাব হচ্ছে শক্তির অভাব নয়, কিন্তু শক্তির সংযোগের অভাব।"

তিনি কৃষকদের বোঝাতেন যে, একা চলা মানে দুর্বল থাকা, আর দশে মিলে চলা মানেই সামষ্টিক মুক্তি। আজকের বাংলাদেশের ক্ষুদ্রঋণ মডেল, সমবায় ভিত্তিক কৃষি বিপণন ব্যবস্থা এবং পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের যে বিশাল পরিকাঠামো, তার আদি রূপটি আমরা দেখতে পাই পতিসরের সেই নিভৃত পল্লীতে। কৃষকের উৎপাদিত পণ্য সরাসরি বাজারে পৌঁছে দিয়ে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমানোর যে আধুনিক চিন্তা আমরা আজ করছি, রবীন্দ্রনাথ তা ১৯ শতকেই বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছিলেন।

ডিজিটাল বিপ্লব ও কবির স্বপ্ন: স্মার্ট কৃষি তথ্যায়ন : বাংলাদেশের আজকের ‘স্মার্ট কৃষি’ বা আধুনিক কৃষি তথ্যায়নের যে জয়যাত্রা, তা মূলত রবীন্দ্রনাথের সেই আকাঙ্ক্ষারই ডিজিটাল রূপান্তর। কবি চেয়েছিলেন কৃষকের কাছে সঠিক সময়ে সঠিক তথ্য পৌঁছে দিতে। তিনি তাঁর চিঠিপত্রে বারবার উল্লেখ করেছেন যে, চাষিকে তার জমির প্রকৃতি, আবহাওয়ার পূর্বাভাস এবং বাজারের চাহিদা সম্পর্কে সচেতন হতে হবে।

আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও আগাম সতর্কতা: রবীন্দ্রনাথের সেই 'প্রকৃতি চেনার' তাগিদ আজ ‘BAMIS’ পোর্টাল বা Khamari মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে সাত দিন আগেই কৃষকের হাতে পৌঁছে যাচ্ছে।

মাটি পরীক্ষা ও সার ব্যবস্থাপনা: রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে যে গবেষণাগার তৈরির স্বপ্ন দেখতেন, আজ বাংলাদেশের প্রতিটি উপজেলায় সয়েল হেলথ কার্ড এবং ডিজিটাল সয়েল ম্যাপের মাধ্যমে সেই সেবা দেওয়া হচ্ছে।

স্মার্ট কৃষক কার্ড: পতিসরের সেই ব্যাংকিং কার্ডের আধুনিক রূপ হলো আজকের ‘স্মার্ট কৃষক কার্ড’, যার মাধ্যমে ভর্তুকি, ঋণ এবং তথ্য সবই কৃষকের হাতের মুঠোয়।

এআই (AI) ও ড্রোন: পতিসরের ট্রাক্টর যদি হয় সূচনা, তবে আজকের ড্রোন দিয়ে কীটনাশক ছিটানো কিংবা এআই ব্যবহার করে ফসলের রোগ নির্ণয় হলো সেই ধারাবাহিকতার চূড়ান্ত শিখর।

পরিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্যের ভারসাম্য: টেকসই কৃষির পথ : রবীন্দ্রনাথের কৃষি ভাবনা কেবল উৎপাদনের সংখ্যাতত্ত্বে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি জানতেন, প্রকৃতিকে রিক্ত করে কৃষি বাঁচতে পারে না। তাঁর প্রবর্তিত ‘বৃক্ষরোপণ উৎসব’ কিংবা ‘হলকর্ষণ’ আজ কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং জলবায়ু পরিবর্তনের এই বৈশ্বিক সংকটে এক পরম ধ্রুব সত্য। মাটির বুক চিরে ফসল ফলানোর পাশাপাশি মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা এবং পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখার যে পাঠ তিনি দিয়েছিলেন, তা আজকের ‘টেকসই কৃষি’র (Sustainable Agriculture) মূল ভিত্তি। তিনি রাসায়নিক সারের যথেচ্ছ ব্যবহারের বদলে জৈব সারের গুরুত্ব ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার আহ্বান জানিয়েছিলেন, যা বর্তমানে পরিবেশবান্ধব কৃষির প্রধান লক্ষ্য।

নারীর ক্ষমতায়ন ও কৃষি সমাজ : রবীন্দ্রনাথের কৃষি দর্শনে পল্লী পুনর্গঠনের অন্যতম স্তম্ভ ছিল গ্রামীণ নারীর ভূমিকা। তিনি দেখেছিলেন গৃহস্থালি ও মাঠের কৃষিতে নারীর অবদান কতটা অনস্বীকার্য। আজ বাংলাদেশ যখন কৃষিতে নারীর শ্রমের স্বীকৃতি, মজুরি বৈষম্য দূরীকরণ এবং নেতৃত্বের কথা বলছে, তখন রবীন্দ্রনাথের সেই গ্রামীণ কুটির শিল্প ও কৃষি-সংস্কৃতির সমন্বিত উদ্যোগ আমাদের অনুপ্রেরণা জোগায়। তাঁর প্রবর্তিত শ্রীনিকেতনের পল্লী পুনর্গঠন কর্মসূচি আজ বাংলাদেশের পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (PKSF) বা বিআরডিবি (BRDB)-এর মতো সংস্থার কর্মপদ্ধতিতে ছায়া ফেলে।

রবীন্দ্রনাথের চিঠি ও প্রবন্ধ থেকে : রবীন্দ্রনাথ তার 'উপেক্ষিত শক্তি' প্রবন্ধে এবং 'পল্লীপ্রকৃতি' গ্রন্থে বারবার বলেছেন যে, বিচ্ছিন্নভাবে চাষ না করে সমবায়ের ভিত্তিতে আধুনিক যন্ত্র ও তথ্য ব্যবহার করতে হবে। তাঁর মতে, "পৃথিবীতে যারা কেবল হাত চালিয়ে কাজ করে, যারা বুদ্ধি খাটিয়ে কাজ করে তাদের কাছে তারা চিরকালই দাস হয়ে থাকবে।" বাংলাদেশের আজকের স্মার্ট কৃষি মূলত কৃষকের সেই 'বুদ্ধি' বা 'তথ্য' ব্যবহারের ক্ষমতায়ন।

পরিশেষ: রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, "অন্ন চাই, প্রাণ চাই, আলো চাই, চাই মুক্ত বায়ু, চাই বল, চাই স্বাস্থ্য, আনন্দ-উজ্জ্বল পরমায়ু।" আজ বাংলাদেশ যখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করে রপ্তানির পথে হাঁটছে, যখন আমাদের কৃষকরা বিশ্ববাজারে নিজেদের পণ্যের পরিচিতি তৈরি করছে, তখন প্রতিটি শস্যদানায় রবীন্দ্রনাথের সেই দূরদর্শী ভাবনার প্রতিধ্বনি শোনা যায়। তিনি পতিসরের মাঠে যে বীজের বপন করেছিলেন, আজ তা এক মহীরুহ। আমাদের কৃষি উন্নয়ন, পল্লী পুনর্গঠন এবং আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির প্রতিটি পদক্ষেপে রবীন্দ্রনাথ এক চিরন্তন বাতিঘর হয়ে থাকবেন।

মাটির ধূলিকে সোনা করার যে মন্ত্র তিনি আমাদের শিখিয়েছিলেন, সেই বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও প্রাণের মেলবন্ধন ঘটিয়েই গড়ে উঠবে আগামীর স্মার্ট ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। কবির সেই চিরন্তন আদর্শকে বুকে ধারণ করে আধুনিক কৃষি বিজ্ঞান যখন মাঠে সফল হয়, তখনই সার্থক হয় মাটির সাথে মানুষের এই হাজার বছরের মিতালি। রবীন্দ্রনাথের সেই কৃষিদর্শনই হোক আমাদের আগামীর পথ চলার পাথেয়।

লেখক : পরিচালক, কৃষি তথ্য কেন্দ্র (AIC), বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC)

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়