অলিউজ্জামান রুবেল, চাঁপাইনবাবগঞ্জ

  ১৬ জুন, ২০২৬

আম চাষ

চাঁপাইয়ে ‘আম-অর্থনীতি’ চাঙ্গা হয়ে উঠেছে

* জেলায় আমের বাজার এবার ৩ হাজার কোটি টাকা ছাড়াবে * আমের ফলন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়াবে বলে আশা কৃষি বিভাগের

আমের রাজধানীখ্যাত চাঁপাইনবাবগঞ্জের ‘আম-অর্থনীতি’ চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। মৌসুমের শুরুতেই আমের জমজমাট বেচাকেনা দেখে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন- এবার জেলায় আম-বাণিজ্য ৩ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। শুধু আমের কেনাবেচাই নয়, এর বাইরে শ্রমিক, ঝুড়ি ও পরিবহনসহ আনুষঙ্গিক খাতেও আরো কয়েক হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য হবে। সব মিলিয়ে চলতি মৌসুমে এ জেলায় প্রায় ৫ থেকে ৬ হাজার কোটি টাকার এক বিশাল বাণিজ্য হতে যাচ্ছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরীসংখ্যান অনুযায়ী, গত এক দশকে এই জেলায় আম বাগানের সংখ্যা রেকর্ড পরিমাণে বেড়েছে। ২০১৫ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জে আম বাগানের পরিমাণ ছিল মাত্র ১৬ হাজার ৬৫০ হেক্টর, যা বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ৩৭ হাজার ৪৮৭ হেক্টরে। বর্তমানে জেলায় ছোট-বড় বাগানগুলোর প্রায় ৮২ লাখ গাছ থেকে আম উৎপাদিত হচ্ছে। চলতি বছর মোট জমি থেকে আম উৎপাদনের প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল প্রায় ৪ লাখ টন। তবে মাঠের পরিস্থিতি দেখে কৃষি বিভাগ আশা করছে- এবার আম উৎপাদন সাড়ে ৪ লাখ টনেরও বেশি হবে।

এই আম বিক্রির জন্য চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৪টি প্রধান বাজারসহ বিভিন্ন উপজেলায় প্রায় অর্ধশত ছোট বড় বাজার রয়েছে। এর মধ্যে দেশের সবচেয়ে বড় আমের বাজারটি বসেছে জেলার শিবগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী কানসাটে। প্রতিদিন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত এখানে আমের পাইকারি ও খুচরা কেনাবেচা চলে। এ বাজারটিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে প্রায় ৩ শতাধিক আড়ত। বাজারে বর্তমানে গুটি, গোপালভোগ, ক্ষীরশাপাত, ল্যাংড়া, আম্রপালি ও ব্যানানা ম্যাঙ্গোসহ হরেক রকমের জাতের আম পাওয়া যাচ্ছে। বাজার ঘুরে চাষি ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে জানা গেছে, মৌসুমের শেষ দিকে এসে ক্ষীরশাপাত আমের বাজার বেশ গরম। সাধারণ চাষিরা মানভেদে ১৮০০ থেকে ৪ হাজার টাকা মণ দরে বিক্রি করলেও চড়া বাজারে এটি ৩ থেকে সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা মণ দরে বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে স্বাদে-গন্ধে অনন্য ল্যাংড়া আম ১২০০ থেকে ৩ হাজার টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমান চড়া বাজারে এর দাম ১৮০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা মণ। ল্যাংড়ার সমকক্ষ দামে বিক্রি হওয়া আম্রপালি আমের দামও মানভেদে ১ হাজার ২০০ থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৫০০ টাকা মণ পর্যন্ত উঠেছে। এ ছাড়া নতুন ও আকর্ষণীয় জাতের ব্যানানা ম্যাঙ্গোর চাহিদা এখন বাজারে তুঙ্গে। চাষিরা এই আমের দাম প্রতিমণ ৫ হাজার টাকা হাঁকলেও বাজারে বর্তমানে এটি ৩ থেকে সাড়ে ৪ হাজার টাকা মণ দরে বেচাকেনা হচ্ছে।

তবে এই বিপুল সম্ভাবনা সত্ত্বেও আমকে এখনো পূর্ণাঙ্গ শিল্প হিসেবে গড়ে তুলতে না পারার আক্ষেপ রয়েছে স্থানীয়দের মনে। কৃষি সংগঠনের নেতারা জানান, বাংলাদেশে উৎপাদিত আমের একটি বড় অংশই আসে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে। পৃথিবীতে আম একটি বড় শিল্পপণ্য হলেও আমরা এখনো এটাকে পুরোপুরি শিল্পপণ্য হিসেবে নিতে পারিনি। আম প্রক্রিয়াকরণও করা হচ্ছে না।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মুনজের আলম মানিক বলেন, ‘বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশ আম চাঁপাইনবাবগঞ্জেই উৎপাদিত হয়। পৃথিবীতে আম একটি বড় শিল্পপণ্য হলেও আমরা এখনো এটাকে পুরোপুরি শিল্পপণ্য হিসেবে নিতে পারিনি। আমরা আম প্রক্রিয়াকরণ করছি না। যদি এখানে আধুনিক প্রক্রিয়াকরণ শিল্প গড়ে তোলা যায়, তবে আমের বর্তমান বাজার মূল্য এক ধাক্কায় অন্তত ৩ গুণ বেড়ে যাবে। জেলায় বিশাল কর্মসংস্থানেরও সুযোগ তৈরি হবে।’

সার্বিক উৎপাদন ও লক্ষ্যমাত্রার বিষয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. ইয়াসিন আলী জানান, জেলায় চলতি বছর আম উৎপাদনের প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল প্রায় ৪ লাখ টন। তবে মাঠের পরিস্থিতি দেখে তারা আশা করছেন- এবার আম উৎপাদন সাড়ে চার লাখ টনেরও বেশি হবে। তিনি উল্লেখ করেন, গত বছর জেলায় প্রায় ২ হাজার ৪০০ কোটি টাকার আম বেচাকেনা হয়েছিল। এবারের বেচাকেনার চূড়ান্ত হিসাব এখনো তৈরি না হলেও যেহেতু আমের উৎপাদন বেশি এবং বাজারে দামও ভালো, সেহেতু আমের সামগ্রিক বেচাকেনা গত বছরের চেয়ে অনেক বেশি হবে। মৌসুমে এখন পর্যন্ত আবহাওয়া আমের অনুকূলে রয়েছে এবং উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা সফলভাবে অর্জিত হবে বলেও তিনি জানান।

বাণিজ্যের এই চাঙ্গা ভাব এখন দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্ববাজারেও ছড়িয়ে পড়ছে। গত বছর চীনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আম রপ্তানি হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় চলতি মৌসুমেও বিদেশে আম পাঠানো শুরু হয়েছে। সর্বশেষ গত শুক্রবার জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার চককীর্তি ইউনিয়নের চাতরা গ্রামের আম চাষি ও রপ্তানিকারক শামীম রেজা সোহাগ দুই টন আম ইতালিতে রপ্তানি করেছেন। যা স্থানীয় বাগান মালিক ও ব্যবসায়ীদের মনে নতুন আশার আলো জাগাচ্ছে।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়