চীনের সঙ্গে উত্তেজনা এড়াতে ডিপসিকসহ শতাধিক চীনা কোম্পানিকে আপাতত কালো তালিকাভুক্ত করছে না যুক্তরাষ্ট্র
চীনের এআই স্টার্টআপ 'ডিপসিক', মেমোরি চিপ নির্মাতা 'সিএক্সএমটি' এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এমন শতাধিক চীনা কোম্পানিকে এখনই বাণিজ্যের কালো তালিকায় ফেলছে না যুক্তরাষ্ট্র। বেইজিংয়ের সঙ্গে উত্তেজনা আর না বাড়াতেই ট্রাম্প প্রশাসন এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট দুটি সূত্র জানিয়েছে।
গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের একটি আন্তসংস্থা কমিটি ডিপসিক, সিএক্সএমটি এবং অন্যান্য কোম্পানিকে বাণিজ্য বিভাগের এনটিটি বা কালো তালিকায় যুক্ত করার অনুমোদন দিয়েছিল। এই খবরটি এবারই প্রথম প্রকাশ্যে এল। একই সঙ্গে রয়টার্স জানিয়েছে, বিপুলসংখ্যক কোম্পানি এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে স্বল্প খরচের এআই মডেল বাজারে এনে প্রযুক্তি বিশ্বে রীতিমতো শোরগোল ফেলে দিয়েছিল ডিপসিক। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা গত বছর রয়টার্সকে জানিয়েছিলেন, ডিপসিক চীনের সামরিক ও গোয়েন্দা কার্যক্রমে সহায়তা করেছে। তিনি আরও দাবি করেন, এই স্টার্টআপটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু 'শেল কোম্পানি' ব্যবহার করে অবৈধভাবে উন্নত মার্কিন চিপের নাগাল পাওয়ার চেষ্টা করেছিল।
এ বছর আরেক এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিক জানিয়েছে, ডিপসিক ও আরও দুটি চীনা এআই ল্যাব তাদের 'ক্লড এআই' প্ল্যাটফর্ম থেকে অবৈধভাবে তথ্য ও সক্ষমতা চুরি করে নিজেদের মডেল উন্নত করার চেষ্টা করেছে। ওপেনএআই-ও মার্কিন আইনপ্রণেতাদের সতর্ক করেছে যে ডিপসিক তাদের মডেলকেও লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে।
অন্যদিকে চীনের শীর্ষ মেমোরি চিপ নির্মাতা চ্যাংক্সিন মেমোরি টেকনোলজিস-কে বাইডেন প্রশাসনের সময় মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর একটি 'চীনা সামরিক কোম্পানি' হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। রয়টার্স ও অন্যান্য সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, এক বছরেরও বেশি সময় আগে বাণিজ্য বিভাগ কোম্পানিটিকে তাদের কালো তালিকায় রাখার কথা বিবেচনা করেছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ম অনুযায়ী, এই কালো তালিকায় থাকা কোনো কোম্পানির কাছে মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারের লাইসেন্স ছাড়া কোনো পণ্য, সফটওয়্যার বা প্রযুক্তি রপ্তানি করতে পারে না।
এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য ডিপসিক ও সিএক্সএমটির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের সাড়া পাওয়া যায়নি।
কালো তালিকার বিষয়টি দেখভাল করে বাণিজ্য বিভাগের 'ব্যুরো অব ইন্ডাস্ট্রি অ্যান্ড সিকিউরিটি' (বিআইএস)। গত বছর থেকে কেন এই তালিকা হালনাগাদ করা হয়নি বা ডিপসিক ও সিএক্সএমটি নিয়ে তাদের অবস্থান কী, সে বিষয়ে তারা সরাসরি কোনো উত্তর দেয়নি।
তবে এক বিবৃতিতে বিআইএস জানিয়েছে, 'খারাপ উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করা গোষ্ঠীগুলোকে মোকাবিলা করতে আমরা প্রতিদিন এনটিটি লিস্টসহ অনেক ধরনের নীতি ও এনফোর্সমেন্ট টুল ব্যবহার করছি।'
প্রযুক্তি, বাণিজ্য ও জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মধ্যে চরম উত্তেজনা চলছে। ওয়াশিংটন শুল্ক ও রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বেইজিংকে চাপে রাখার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে চীনও প্রতিরক্ষা, গাড়ি ও চিপ নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য অত্যন্ত জরুরি বিরল খনিজ বা রেয়ার আর্থের ওপর নিজেদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের গ্লোবাল সাপ্লাই চেইন গবেষক ফিলিপ লাক জানান, গত অক্টোবরের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র তাদের এনটিটি লিস্টে নতুন কোনো নাম যুক্ত করেনি। গত এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে এটিই সবচেয়ে দীর্ঘ বিরতি।
লাক বলেন, 'এই কালো তালিকাটি অনেকটা "হোয়্যাক-অ্যা-মোল" গেমের মতো। আপনাকে সব সময় সজাগ থাকতে হবে এবং একের পর এক আঘাত করতে হবে।' তিনি সতর্ক করে বলেন, নতুন নাম যুক্ত না করায় মার্কিন প্রযুক্তি হয়তো এমন শত্রুদের হাতে পৌঁছাচ্ছে, যারা এগুলো যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধেই ব্যবহার করতে পারে।
সাবেক বাণিজ্য কর্মকর্তা কেভিন কুরল্যান্ড বলেন, 'অক্টোবর থেকে যুক্তরাষ্ট্র কোনো কোম্পানিকে কালো তালিকাভুক্ত করেনি। এটি প্রমাণ করে যে জাতীয় নিরাপত্তার মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের চেয়ে এখন বাণিজ্য নীতি বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।'
সিদ্ধান্তহীনতায় ট্রাম্প প্রশাসন?
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ২০২৫ সালের শেষ দিক থেকে বাণিজ্য বিভাগের শিল্প ও নিরাপত্তা বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি জেফরি কেসলার যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে উত্তেজনা এড়াতেই এসব চীনা কোম্পানিকে কালো তালিকাভুক্ত করা থেকে বিরত রয়েছেন।
এই তালিকা হালনাগাদ না করার বিষয়টি ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে ব্যুরো অব ইন্ডাস্ট্রি অ্যান্ড সিকিউরিটির একটি বড় সমস্যার দিকেই ইঙ্গিত করে। আর তা হলো—রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে কমানো সম্ভব, এমন হুমকিগুলো মোকাবিলা করতে নতুন নিয়ম জারি বা ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের অক্ষমতা।
উদাহরণস্বরূপ, গত বছরের শুরুর দিকে ব্যুরো জানিয়েছিল যে, মার্কিন এআই চিপের বৈশ্বিক অ্যাক্সেস নিয়ন্ত্রণ করতে সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সময়কার একটি নিয়ম বাতিল করে তারা নতুন নিয়ম আনবে। কিন্তু তারা এখনো কোনো নতুন নিয়ম প্রকাশ করেনি এবং পুরোনো নিয়মটিও প্রয়োগ করছে না। এর ফলে তৈরি হওয়া ফাঁকফোকর দিয়ে হয়তো চীনের বাইরের কোনো কোম্পানির মাধ্যমে মার্কিন চিপগুলো চীনা কোম্পানিগুলোর হাতে পৌঁছে যাচ্ছে।
কোনো প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকায় যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয় একটি আন্তসংস্থা কমিটি, যেখানে বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, পররাষ্ট্র এবং কখনো কখনো ট্রেজারি বিভাগের কর্মকর্তারা থাকেন। তবে দুটি সূত্র জানিয়েছে, এই কমিটি বিভিন্ন কোম্পানিকে কালো তালিকায় রাখার অনুমোদন দিলেও, বাণিজ্য বিভাগ তা প্রকাশ করেনি।
একটি সূত্র জানায়, উন্নত সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন, সেমিকন্ডাক্টর তৈরির সরঞ্জাম এবং এআই মডেলিংয়ের সঙ্গে যুক্ত অন্তত ৭৫টি চীনা কোম্পানিকে কালো তালিকাভুক্ত করার জন্য ওই কমিটি ইতিমধ্যে চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়ে রেখেছে।
