এআই’তে আমেরিকাকে টেক্কা নয়, চীন সম্পূর্ণ এক ভিন্ন খেলায় নেমেছে
২০২৫ সালের শুরুর দিকে চীনের হাংঝু শহর থেকে নীরবে এক প্রযুক্তি বিপ্লবের সূচনা হয়েছিল। ঐতিহাসিক ওয়েস্ট লেক, কুয়াশাচ্ছন্ন পাহাড় এবং কবিদের ভাষায় "মর্ত্যের স্বর্গ" হিসেবে পরিচিত এক কোটি ৩০ লাখ মানুষের এই শহরটিতেই ঘটে সেই ঘটনা। সিলিকন ভ্যালির জায়ান্টদের তুলনায়— অত্যন্ত সীমিত সম্পদের এক চীনা কোম্পানি ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে একটি লজিক্যাল বা রিজনিং-ভিত্তিক লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (এলএলএম) উন্মোচন করে, যা ছিল তৎকালীন চ্যাটজিপিটি-৪ সমমানের মডেলগুলোর চেয়ে সামান্য পিছিয়ে। কোম্পানিটির দাবি অনুযায়ী, 'ডিপসিক' নামের এই মডেলটি প্রশিক্ষণে খরচ হয়েছিল মাত্র ৬০ লাখ ডলার—যা ওপেনএআই বা গুগলের খরচের তুলনায় খুবই নগণ্য।
যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলগুলো (এলএলএম) সম্পূর্ণ অপরাজেয়—বিশ্বের প্রযুক্তি খাত যখন এমন ধারণায় বুঁদ হয়েছিল, ঠিক তখনই ডিপসিক সমস্ত সমীকরণ উল্টে দেয়। সবার ধারণা ছিল, বিশাল কম্পিউটেশনাল ক্ষমতা, সেরা মেধা, বিপুল পুঁজি বিনিয়োগ এবং ছোটখাটো দেশের জিডিপির সমান বাজার মূল্যায়ন থাকা মার্কিন কোম্পানিগুলোর সমকক্ষ হওয়া অসম্ভব। চিপ আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং ধীরগতির অর্থনীতির কারণে চীনের এআই খাত যখন কোণঠাসা বলে মনে হচ্ছিল, ঠিক তখনই এই চীনা মডেলটির আবির্ভাব ঘটে। সেই সময়ে মার্কিন এআই খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ ছিল চীনের চেয়ে ১২ গুণ এবং যুক্তরাজ্যের চেয়ে ২৪ গুণ বেশি।
বিশ্লেষকরা দেখেছেন যে, ডিপসিক-এর মূল প্রতিষ্ঠান– হাই-ফ্লায়ার টাকা উড়িয়ে এই জায়গায় পৌঁছায়নি; বরং তারা অত্যন্ত চতুর কৌশল অবলম্বন করেছিল: নির্দিষ্ট ডোমেইনভিত্তিক ফোকাস, সাশ্রয়ী প্রশিক্ষণ এবং তীব্র জ্বালানি দক্ষতার ওপর জোর দিয়েছিল তারা। সমালোচকরা পর্দার আড়ালে গোপনে এনভিডিয়ার চিপ ব্যবহার, চ্যাটজিপিটির অননুমোদিত ব্যবহার কিংবা গোপন খরচের গুঞ্জন তুললেও, একটি বার্তা স্পষ্ট ছিল: উন্নত এলএলএম-এর ওপর মার্কিন কোম্পানিগুলোর আর একচেটিয়া একাধিপত্য থাকছে না।
এই "ডিপসিক মুহূর্ত" বিশ্বজুড়ে একটি নতুন বিতর্কের জন্ম দেয়: "চীনা কোম্পানিগুলো কি এআই-তে যুক্তরাষ্ট্রকে ধরে ফেলছে?" তবে এই প্রশ্নটি আসলে মূল বিষয়টিকেই এড়িয়ে যায়। এআই-এর পরিধি অনেক বিস্তৃত—যার মধ্যে রয়েছে জ্বালানি, অবকাঠামো, চিপ, মৌলিক গবেষণা এবং অ্যাপ্লিকেশন ডিপ্লয়মেন্ট (ব্যবহারিক প্রয়োগ)। এই বিশাল ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন উভয়েরই নিজস্ব ভিন্ন ভিন্ন শক্তি রয়েছে। প্রকৃত চিত্রটি হলো, বিশ্বের এই দুই শীর্ষ এআই বাজার একই প্রতিযোগিতায় দৌড়াচ্ছে না; বরং তারা ভিন্ন অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা, ব্যয়ের কাঠামো এবং বাজারের চাহিদার ওপর ভিত্তি করে দুটি সমান্তরাল পথে হাঁটছে। আর এই ভিন্নতাই আগামী এক দশকে বৈশ্বিক এআই-এর রূপরেখা নির্ধারণ করবে।
চীনের প্রযুক্তিখাতে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান সোল ক্যাপিটালের হেরি হ্যান বলেন, "আপনি যদি ডিপ টেকের (গভীর প্রযুক্তি) ভবিষ্যতের দিকে তাকান, সেখানে এটি স্পষ্ট যে যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন ঐতিহ্যবাহী চীনা মার্শাল আর্ট 'তাই চি'-র সাদা-কালোর 'ইন এবং ইয়াং' প্রতীকের দুটি দিকের মতো। প্রত্যেকেরই নিজস্ব অনন্য শক্তি রয়েছে এবং প্রতিটি পক্ষই অন্য পক্ষকে সামনে এগিয়ে যেতে বাধ্য করছে। এটি কেবল কোনো সাধারণ প্রতিযোগিতা নয়, এটি একটি গতিশীল ভারসাম্য।" যুক্তরাষ্ট্রে এআই উন্নয়ন একটি চরম পুঁজি-নিবিড় পথ অনুসরণ করে: সেখানে রয়েছে বিশাল ডেটা সেন্টার, মেধাবিদের টানতে বিপুল খরচ এবং শতকোটি ডলারের ফ্রন্টিয়ার সায়েন্সের বাজি। পর্যাপ্ত অর্থায়নে পুষ্ট মার্কিন শীর্ষ কোম্পানিগুলো কৃত্রিম সাধারণ বুদ্ধিমত্তা বা এজিআই এবং মাল্টি-স্টেপ প্ল্যানিং ও স্ব-পরিচালিত অ্যাকশনের মাধ্যমে— লক্ষ্য পূরণে সক্ষম অত্যন্ত পরিশীলিত 'এজেন্টিক সিস্টেম' তৈরির দিকে ধাবিত হতে থাকবে।
অন্যদিকে চীনা কোম্পানিগুলো সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বাস্তবতার মুখোমুখি: সেখানে পুঁজির প্রাপ্যতা তুলনামূলকভাবে কম, উচ্চমানের কম্পিউটিং পাওয়ারে প্রবেশাধিকার সীমিত এবং অভ্যন্তরীণ মুনাফার বাজারও ছোট। এর জবাবে চীনা কোম্পানিগুলো ওপেন সোর্স, সাশ্রয়ী ব্যয়, অ্যাপ্লিকেশন স্তরে দ্রুত উদ্ভাবন এবং আয়ের জন্য বৈশ্বিক বাজারের ওপর প্রচণ্ড জোর দিচ্ছে।
চীনের এআই গল্পটি আসলে ফ্রন্টিয়ার মডেলের দৌড়ে যুক্তরাষ্ট্রকে ধরে ফেলা বা জেতার বিষয় নয়, বরং এটি হলো এআই-এর ব্যবহারকে 'শিল্পায়ন' বা ব্যাপকভাবে উৎপাদনশীল খাতে রূপান্তর করার গল্প। চীনা এআই ফার্মগুলো এমন একটি বিকল্প ইকোসিস্টেম তৈরি করছে, যা প্রয়োজনের তাগিদেই অনেক বেশি সাশ্রয়ী, গঠনগতভাবে উন্মুক্ত এবং দেশের অর্থনীতির সাথে নিবিড়ভাবে যুক্ত হতে কাজ করে যাচ্ছে। এটি বিশ্বজুড়ে স্টার্ট-আপ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং মাঝারি আকারের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোতে চীনা মডেল ব্যবহারের প্রবণতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। বৈশ্বিক খাতের শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিগুলো যখন তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী মডেলগুলোকে "ক্লোজড-সোর্স" (যার সোর্স কোড গোপন বা মালিকানাধীন রাখা হয়) রাখতে পছন্দ করছে, তখন চীনা মডেলগুলো সহজলভ্যতা ও উপযোগিতার মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে। এটি নীরবে বৈশ্বিক এআই চর্চাকে নতুন রূপ দিচ্ছে এবং একটি নতুন ধরনের প্রযুক্তিগত 'সফট পাওয়ার' তৈরি করছে।
চীনের এআই দক্ষতার মেশিন: কম খরচ ও সীমাবদ্ধতা
চীনের বাজারে এক ডলারের কার্যকারিতা অনেক বেশি—এই সত্যটি এআই বিনিয়োগের সামগ্রিক চিত্রকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করে। যদিও মোট এআই অর্থায়নের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র অনেক বড় ব্যবধানে আধিপত্য বজায় রেখেছে, তবে চীনা ফার্মগুলোও প্রায়ই প্রতি ইউনিট পুঁজি বা মূলধনের বিপরীতে অনেক বেশি আউটপুট তৈরি করতে পারে।
এই দক্ষতার শুরুটা হয় প্রাথমিক উৎপাদন বা ইনপুট খরচ থেকে। চীনে একজন এআই প্রকৌশলী বছরে প্রায় ৪ লাখ ২ হাজার ইউয়ান (প্রায় ৫৭,০০০ মার্কিন ডলার) আয় করেন, যা যুক্তরাষ্ট্রের একজন প্রকৌশলীর বেতনের তুলনায় অনেক কম। এছাড়া চীন যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় দেড় থেকে দুই গুণ বেশি এআই-সংশ্লিষ্ট পিএইচডি গ্র্যাজুয়েট তৈরি করে এবং উচ্চশিক্ষিত অনেক গবেষক এখন দেশে ফিরে আসছেন, যা একটি বিশাল ও সাশ্রয়ী মেধার পাইপলাইন তৈরি করেছে। সেখানকার ডেটা সেন্টারগুলো সস্তা বিদ্যুৎ, কম দামে জমি এবং স্থানীয় সরকারের বড় ধরনের ভর্তুকির সুবিধা পায়—যা বৃহৎ পরিসরের কম্পিউটিংকে কৌশলগত অবকাঠামো হিসেবে বিবেচনা করার জাতীয় নীতিমালার মাধ্যমে আরও সুদৃঢ় হয়েছে। কোনো কোনো প্রদেশে নির্দিষ্ট চিপ ব্যবহারকারী স্থাপনাগুলোর জন্য বিদ্যুতের খরচ অর্ধেক করে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
তবে এই সুবিধাগুলো চীনের এআই ইকোসিস্টেমের কিছু কঠোর সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়েই তৈরি ও উন্নত হয়েছে। ২০১৯ সাল থেকে চীনে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ দুই-তৃতীয়াংশের বেশি কমে গেছে, পশ্চিমা বাজারে প্রবেশাধিকার কঠোর হয়েছে, দেশের তৈরি উচ্চমানের জিপিইউগুলো আমদানিকৃত জিপিইউগুলোর চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে এবং আঞ্চলিক বিদ্যুৎ গ্রিডগুলো ডেটা সেন্টারের অতিরিক্ত লোডের কারণে চাপে পড়ছে। তদুপরি, চীনের বিজনেস-টু-বিজনেস (বিটুবি) বাজারের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো সফটওয়্যার বা প্রযুক্তির জন্য অর্থ প্রদানের ক্ষেত্রে— সেখানকার প্রতিষ্ঠানগুলোর অনীহা খুব কম; কোম্পানিগুলো বাইরে থেকে কেনার চেয়ে ইন-হাউজ সফটওয়্যার টুল তৈরি করতে বেশি পছন্দ করে। এর ফলে চীনের অভ্যন্তরীণ সফটওয়্যার বাজার যুক্তরাষ্ট্রের ২৩ হাজার ৭০০ কোটি ডলারের বাজারের তুলনায় মাত্র এক-চতুর্থাংশ। এটি অনেক এআই স্টার্ট-আপের পক্ষে বড় আকারে ব্যবসা সম্প্রসারণ করা বা সেবার জন্য বেশি মূল্য আদায় করা কঠিন করে তোলে। এছাড়াও বড় করপোরেট সংস্কৃতি—বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো—জনবল বা কর্মসংস্থান সুরক্ষা এবং ধীরে ধীরে পরিবর্তনকে বেশি প্রাধান্য দেয়। এইসব নীতি দিয়ে তারা স্বয়ংক্রিয়করণ বা অটোমেশনকে মন্থর করে এবং চাকরির বাজারে এআই-এর সম্ভাব্য প্রভাবকে নিয়ন্ত্রণে রাখে।
বিনিয়োগকারী জুন শু চীনের এআই খাতে আয়ের একটি মূল সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে বলেন, এআই-এর টোটাল অ্যাড্রেসেবল মার্কেট (একটি কোম্পানির পণ্য বা পরিষেবার সম্ভাব্য মোট আয়ের বাজার) মূলত হোয়াইট কলার চাকরি বা দাপ্তরিক শ্রমের ব্যয়ের ওপর নির্ভর করে। জুন বলেন, "আর এই ক্ষেত্রটি চীনের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য উন্নত বাজারে অনেক বড়, কারণ সেখানে বেতন অনেক বেশি। এআই নিয়ে চীনের চ্যালেঞ্জগুলো চিপ, মডেল কিংবা সরবরাহ নিয়ে নয়—এটি মূলত চাহিদার সমস্যা। এখানে এআই-এর চাহিদার আর্থিক মূল্য অনেক কম এবং বাজারও ছোট।" এই চাপগুলোই মূলত চীনা ফার্মগুলোকে দক্ষতা ও নতুন নতুন উদ্ভাবনী কৌশলের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
২০২৫ সালে এনভিডিয়ার প্রধান জেনসেন হুয়াং বলেছিলেন যে, চীনের কাছে মার্কিন চিপ বিক্রি সীমিত করা কেবল চীনের অভ্যন্তরীণ প্রচেষ্টাকে আরও ত্বরান্বিত করবে। তিনি বলেন, "সেখানকার স্থানীয় কোম্পানিগুলো অত্যন্ত মেধাবী এবং সংকল্পবদ্ধ। রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ তাদের নিজস্ব উন্নয়নকে দ্রুততর করার জন্য প্রয়োজনীয় মনোবল, শক্তি এবং সরকারি সমর্থন জুগিয়েছে।" সব মিলিয়ে, এই ইকোসিস্টেমটি একঝাঁক চীনা ওপেন সোর্স এলএলএম তৈরি করেছে— যা অত্যন্ত দক্ষ ও সাশ্রয়ী সীমার মধ্যে কাজ করে এবং মাঝারি স্তরের কম্পিউটেশনাল ক্ষমতা ব্যবহার করেই শক্তিশালী লজিক্যাল ও রিজনিং দেয়। ২০২৫ সালের শেষের দিকে ডিপসিক-এর মূল প্রতিষ্ঠান ঘোষণা করে, তাদের মডেল থেকে ১০ লাখ (১ মিলিয়ন) ইউনিট আউটপুট পেতে খরচ হবে মাত্র ৩ ইউয়ান—যা প্রায় ৫০ সেন্টের সমান এবং চ্যাটজিপিটির খরচের মাত্র ২০ ভাগের এক ভাগ।
উচ্চ দক্ষতা, নামমাত্র মুনাফা (থিন মার্জিন) এবং অভ্যন্তরীণ আয়ের ছোট বাজারের এই সংমিশ্রণই মূলত চীনা এআই কোম্পানিগুলোর স্কেলিং বা বড় হওয়ার প্রক্রিয়াকে রূপ দিচ্ছে। অনেকেই এখন এমন এক ধরনের প্রতিষ্ঠানে পরিণত হচ্ছে যাকে "স্কিনি অ্যাথলেট" বা কৃশ অথচ ক্ষীপ্র ক্রীড়াবিদ বলা যায়—যারা অত্যন্ত মেদহীন, দ্রুতগতির এবং নিরলসভাবে দক্ষ। এটি কেবল তাদের দেশের বাজারের প্রতিযোগিতাকেই প্রভাবিত করে না, বরং তারা কীভাবে এবং কোথায় ব্যবসা বাড়াবে তাও নির্ধারণ করে। অনেকের জন্যই এর অর্থ হলো বিদেশের গ্রাহকদের সেবা দেওয়া। আর জেনারেটিভ এআই ব্যবহারের কারণে ভাষা, স্থানীয়করণ এবং কাস্টমার সাপোর্ট বা গ্রাহক সেবা— এখন আর বৈশ্বিক সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে কোনো বড় বাধা নয়।
আলিবাবা হংকং এন্টারপ্রেনারস ফান্ডের প্রধান নির্বাহী সিন্ডি চাউ বলেন, "চীনে প্রতিটি এআই স্টার্ট-আপের প্রথম দিন থেকেই একটি আন্তর্জাতিক কৌশল থাকে এবং তাদের তালিকার শীর্ষে থাকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া। প্রকৃতপক্ষে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক বড় শিল্পগোষ্ঠী এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান আমাদের সাথে বিনিয়োগ করতে বেশ আগ্রহী। কারণ তারা বিশ্বাস করে, এই অঞ্চলটি নিজস্ব শক্তিতে এআই উন্নয়নে বৈশ্বিক দৌড়ে সহজে তাল মেলাতে পারবে না এবং প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য চীনের এই অগ্রগতিগুলোর অ্যাক্সেস পাওয়া তাদের জন্য অত্যন্ত জরুরি।"
বৈশ্বিক সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে প্রকৃত ভ্যালু বা উপযোগিতা প্রদান যখন মূল ভিত্তি হয়, তখন তা দেখতে কেমন হতে পারে—তার একটি বড় উদাহরণ হলো চীনা এআই ইউনিকর্ন '০১.এআই'। গুগল চায়নার সাবেক প্রধান এবং শীর্ষ টেক ভেঞ্চার ক্যাপিটাল সিনোভেশন ভেঞ্চারসের প্রেসিডেন্ট কাই-ফু লি কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত এই কোম্পানিটি ২০২৩ সালে শুধুমাত্র একটি এলএলএম ডেভেলপার হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিল। তবে দ্রুতই তারা করপোরেট এআই এজেন্ট বা তাদের ভাষায় "সুপার-এমপ্লয়ি" (দক্ষ কর্মী) তৈরির দিকে মনোযোগ ঘুরায়, যা বিমা ব্রোকারেজ, প্রকিউরমেন্ট (ক্রয়) এবং লজিস্টিকস অপ্টিমাইজেশনের মতো কাজগুলো করতে সক্ষম। ০১.এআই-এর আন্তর্জাতিক ব্যবসা ও এআই কনসাল্টিংয়ের ভাইস প্রেসিডেন্ট নিং নিং বলেন, "আয়ের বা মনিটাইজেশনের চ্যালেঞ্জগুলো এআই-কে আরও দ্রুত গতিশীল হতে বাধ্য করে। এন্টারপ্রাইজ এআই-এর ভবিষ্যৎ কেবল প্রযুক্তি বিক্রি করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং ব্যবসার ফলাফলের জন্য এআই-কে কতটা দায়বদ্ধ করা যাচ্ছে, সেটাই আসল বিষয়।"
বাস্তব ক্ষেত্রে, এই ভ্যালু বা উপযোগিতা প্রদানের অর্থ হলো প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমের মধ্যে সরাসরি "২৪/৭ ডিজিটাল স্পেশালিস্ট" বা সার্বক্ষণিক ডিজিটাল বিশেষজ্ঞ যুক্ত করা। অস্ট্রেলিয়ার পার্থ-ভিত্তিক একটি খনি কোম্পানির সাথে কাজ করার সময় ০১.এআই-এর প্রকৌশলীরা তাদের এআই এজেন্টগুলোকে মানব কর্মীদের পাশাপাশি "সহকর্মী" বা টিমমেট হিসেবে নিয়োজিত করেছিলেন। এর মধ্যে একটি লজিস্টিকস শিডিউলার এজেন্ট রেল ও বন্দর ট্রাফিক অপ্টিমাইজ করে; একটি প্রকিউরমেন্ট এজেন্ট বিক্রেতাদের ই-মেইল পড়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পারচেজ অর্ডার বা ক্রয়ের আদেশ তৈরি করে; এবং একটি অপারেশনাল প্ল্যানার এজেন্ট ট্রাক পরিবর্তন ও শ্রমিক দলগুলোর কাজ দক্ষতার সাথে সমন্বয় করে। নিং জানান, তাদের তৈরি প্রতিটি এআই এজেন্ট পরিস্থিতি পরিবর্তনের সাথে সাথে নিজেকে নতুনভাবে প্রশিক্ষিত করে তোলে এবং ক্রমাগত নিজের কর্মক্ষমতা উন্নত করে।
চীনের ওপেন সোর্স বাজি: বিস্তার এবং সহযোগিতা
চীনের ওপেন সোর্স (উন্মুক্ত সোর্স কোড) সংস্কৃতি এই খাতের জন্য একটি বড় গতিবর্ধক বা এক্সিলারেটর হিসেবে কাজ করছে। প্রকৌশলীদের শত শত টিম এখন তাদের মডেলের আর্কিটেকচার এবং ওয়েটস (যা একটি মডেল প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অর্জন করে) উন্মুক্তভাবে প্রকাশ করে দিচ্ছে। এর ফলে এমন একটি যৌথ অবকাঠামো তৈরি হচ্ছে যা যে কেউ পরীক্ষা করতে, এর ওপর ভিত্তি করে নতুন কিছু তৈরি করতে এবং এটিকে আরও উন্নত করতে পারে।
টেক্সট-টু-ইমেজ বা ভিডিও খাতের একজন প্রতিষ্ঠাতা ক্লোয়ি ফ্যাং বলেন, চীনা এআই ফার্মগুলো অত্যন্ত বাস্তববাদী। তারা এমন এআই তৈরি করতে চায় যা সরাসরি ভ্যালু প্রদান করে এবং বৈশ্বিক ব্যবহারকারীদের আকর্ষণ করার জন্য প্রায়শই ওপেন সোর্সকে একটি "গ্লোবাল হুক" বা বৈশ্বিক টোপ হিসেবে ব্যবহার করে। তিনি বলেন, "তারা প্রথমে ব্র্যান্ড ভ্যালু এবং মানুষের মুখে মুখে ইতিবাচক প্রচার তৈরি করে এবং পরবর্তীতে আরও উন্নত ক্লোজড-সোর্স মডেল বাজারে ছাড়ে।" চীনা মডেলগুলো এখন বেশ কয়েকটি প্রধান জেনারেটিভ মিডিয়া ক্যাটাগরিতে নেতৃত্ব দিচ্ছে; বিশ্বব্যাপী শীর্ষ ১০টি ইমেজ-টু-ভিডিও মডেলের মধ্যে ৫টি এবং শীর্ষ ১০টি টেক্সট-টু-ভিডিও ও ইমেজ-এডিটিং মডেলের মধ্যে ৩টিই চীনের তৈরি।
এই ওপেন সোর্স পদ্ধতিটি চীনের জাতীয় অগ্রাধিকারের সাথে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ, যা "উন্মুক্ত ইকোসিস্টেম", দেশের অর্থনীতি ও সমাজের সমস্ত শিল্প ও খাতের সাথে এআই-এর গভীর একীকরণ এবং "বৈশ্বিক সহযোগিতা বৃদ্ধি"-র ওপর জোর দেয়। চীনা ওপেন সোর্স এলএলএমগুলো—যার নেতৃত্বে রয়েছে কিউওয়েন, মিনিম্যাক্স ও ডিপসিক—বর্তমানে বিশ্বব্যাপী মোট এলএলএম ব্যবহারের এক-তৃতীয়াংশ দখল করে আছে।
সিলিকন ভ্যালি থেকে শুরু করে আফ্রিকা এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার স্টার্ট-আপ ও কোম্পানিগুলো এখন চীনা মডেল ব্যবহার করছে। কারণ এগুলো সহজে অ্যাক্সেস করা যায়, স্বচ্ছ এবং অনেক মার্কিন বিকল্পের তুলনায়—এগুলো চালানো অত্যন্ত সাশ্রয়ী। গুগলের সাবেক চীন প্রধান এবং এআই খাতের অন্যতম প্রভাবশালী কণ্ঠস্বর সিনোভেশন ভেঞ্চারসের প্রতিষ্ঠাতা কাই-ফু লি বলেন, "আপনি এই মডেলগুলো থেকে যা খুশি বাদ দিতে পারেন, আপনার প্রয়োজন অনুযায়ী যেকোনো কিছু যুক্ত করতে পারেন। এই নমনীয়তা এবং উন্মুক্ততা আসলে ব্যবহারকারীদের আস্থা বাড়ায়।" তিনি উল্লেখ করেন, অনেক মার্কিন প্রতিষ্ঠান, শিক্ষার্থী এবং গবেষক চীনা মডেল ব্যবহার করছেন "সেগুলো চীনা হওয়ার কারণে নয়, বরং সেগুলো ওপেন সোর্স হওয়ার কারণে।"
আলিবাবা ক্লাউডের প্রতিষ্ঠাতা জিয়ান ওয়াং যুক্তি দেন যে, এআই-এর বর্তমান মুহূর্তটি ১৯৯০-এর দশকের শেষের দিকের কথা মনে করিয়ে দেয়। তখন নেটস্কেপ তাদের ব্রাউজার বিনামূল্যে সবার জন্য উন্মুক্ত করেছিল এবং এর কোডটি সর্বসাধারণের জন্য সহজলভ্য করেছিল—যা ছিল ওপেন সোর্সের একটি ঐতিহাসিক টার্নিং পয়েন্ট এবং এটি বাণিজ্যিক ইন্টারনেটের বিকাশকে ত্বরান্বিত করতে সাহায্য করে। আজকের এআই-এর সমান্তরাল চিত্রটিও ঠিক একই রকম। তিনি বলেন, মৌলিক টুলগুলো এখন উন্মুক্ত এবং সম্মিলিতভাবে উন্নত করার যোগ্য, তাই সোর্স কোডটি অ্যাক্সেসযোগ্য কি না তা—সেটা এখন আর কোনো বড় বাধা নয়। বরং প্রযুক্তি খাত এখন স্থানান্তরিত হচ্ছে যেটিকে জিয়ান "উন্মুক্ত সম্পদ" বা 'ওপেন রিসোর্সেস' বলছেন; বিশেষ করে মডেল ওয়েটস, ডেটা এবং কম্পিউটিং রিসোর্স, যা এই শিল্পের অগ্রগতির জন্য অপরিহার্য। তিনি বলেন, এই সম্পদগুলো যত বেশি সহজলভ্য হবে, ডেভেলপাররা অন্যদের ইতোমধ্যেই করা কাজের পুনরাবৃত্তি করার বিশাল খরচ তত বেশি এড়িয়ে যেতে পারবে—যা এআই-এর বিস্তারকে দ্রুততর করার ক্ষেত্রে একটি অন্যতম প্রধান চাবিকাঠি।
তবে সিলিকন ভ্যালির ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্রতিষ্ঠান– আন্দ্রেসেন হোরোভিটজ -এর গবেষকরা দেখেছেন যে, এআই মডেলগুলোকে একই সাথে "বৈচিত্র্যময় এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে সক্ষম" হতে হবে। দ্রুত পরিবর্তনশীল এই শিল্পে কোনো ব্যবহারকারী যদি একটি মডেলকে অবিশ্বাসী বা অনুপযোগী মনে করেন, তবে তারা দ্রুত অন্য মডেলে চলে যাবেন। তারা কোনো একটি 'সেরা' বিকল্পের ওপর নির্ভর না করে— বিস্তৃত বিকল্পগুলোর মধ্যে নিজেদের প্রয়োজনীয় মডেল খুঁজে নেবেন।
আমরা আশা করছি, এআই-এর পরবর্তী জোয়ারটি আসবে মূলত অ্যাপ্লিকেশন বা ব্যবহারিক প্রয়োগের স্তরে। আর এর মাধ্যমে সমাজের আসল সুফল তখনই নিশ্চিত হবে, যখন বিভিন্ন সংস্থা এবং ব্যক্তিরা তাদের কাজের ধরণ ও পদ্ধতির সাথে এটিকে খাপ খাইয়ে নিতে পারবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর সম্ভাবনা সর্বজনীন হলেও, একে সঠিকভাবে কাজে লাগানোর চ্যালেঞ্জটি কিন্তু পুরোপুরি মানুষেরই।
