Published : 16 Jun 2026, 10:22 PM
ব্যাংক হিসাব খোলা বা ব্যবসায়িক কার্যক্রমে টিআইএন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য ‘উদ্বেগজনক’ বলে মন্তব্য করেছেন সিলেট-৫ আসনে খেলাফত মজলিশের এমপি মোহাম্মদ আবুল হাসান।
মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি বলেন, বিনিয়োগবান্ধব ও সাশ্রয়ী ব্যবসার পরিবেশের কথা বলা হলেও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের করের আওতায় আনার কিছু উদ্যোগ ‘উদ্বেগ’ তৈরি করছে।
“ব্যাংক হিসাব বা ব্যবসায়িক নিবন্ধনের ক্ষেত্রে টিআইএন বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্তে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।”
তবে সরকারি দলের সদস্যরা বাজেটকে ‘জনকল্যাণমুখী ও ভবিষ্যতমুখী’ আখ্যা দিয়ে বলেছেন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, কর্মসংস্থান, সামাজিক সুরক্ষা ও নারী ক্ষমতায়নের বিষয়গুলো এতে অগ্রাধিকার পেয়েছে।
১১ জুন সংসদে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। মঙ্গলবার ওই বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনা শুরু হয়।
আবুল হাসান বলেন, আইসিটি খাতের উন্নয়ন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মিডডে মিল চালু, তৃতীয় ভাষা শেখার সুযোগ এবং ফ্রিল্যান্সারদের আয় করমুক্ত রাখার মত উদ্যোগ ইতিবাচক। তবে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর কর বাড়ানোর উদ্যোগ ‘পুনর্বিবেচনা’ করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, দেশে প্রায় চার হাজার কওমি মাদ্রাসা, ১০ লাখ শিক্ষক ও ৬০ থেকে ৭০ লাখ শিক্ষার্থী থাকলেও এ শিক্ষাধারার জন্য কোনো বরাদ্দ রাখা হয়নি।
সংরক্ষিত নারী আসনে জামায়াতে ইসলামীর সদস্য সাজেদা আস সামাদ বলেন, বাজেটে ১০টি অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হলেও কত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, কত সময়ে মূল্যস্ফীতি কমবে কিংবা কোন সূচকে সাফল্য পরিমাপ করা হবে, তা স্পষ্ট নয়।
তিনি ব্যাংক খাতে আস্থার সংকট, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা এবং উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অদক্ষতার অভিযোগ তোলেন।
যশোর-৬ আসনে জামায়াতের এসপি মো. মোক্তার আলী বলেন, এবারের বাজেটের ইতিবাচক দিক আগের অনেক বাজেটের চেয়ে বেশি হলেও এর কিছু ‘বড় দুর্বলতা’ রয়েছে।
ইংরেজিতে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাতের তুলনায় রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যকে ‘অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী’ হিসেবে বর্ণনা করেন। বাজেট ঘাটতি, ঋণনির্ভরতা, মূল্যস্ফীতির চাপ, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন সক্ষমতা এবং দুর্নীতির ঝুঁকির কথাও তিনি বলেন।
নীলফামারী-১ আসনে জামায়াতের এমপি মোহাম্মদ আব্দুস সাত্তার সরকার বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও রাজস্ব আদায়ের উচ্চ লক্ষ্যমাত্রার কারণে সাধারণ মানুষের ওপর পরোক্ষ করের চাপ বাড়তে পারে।
নওগাঁ-২ আসনের সদস্য মো. এনামুল হক বলেন, কৃষি বিভাগের মাধ্যমে দেওয়া ভর্তুকি ও অনুদানের সুবিধা প্রকৃত প্রান্তিক ও বর্গাচাষিদের কাছে পৌঁছায় না।
তিনি সার, বীজ ও সেচে সরাসরি ভর্তুকি দেওয়ার প্রস্তাব দিয়ে বলেন, কৃষকের হাতে সরাসরি সহায়তা পৌঁছালে উৎপাদন বাড়বে এবং কৃষক প্রকৃত সুবিধা পাবে।
নাটোর-৩ আসনে বিএনপির এমপি মোহাম্মদ আনোয়ারুল ইসলাম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের দাবি জানিয়ে বলেন, এতে রাষ্ট্রের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হবে না।
একই সঙ্গে তিনি ‘সার সিন্ডিকেট’ ভেঙে কৃষকদের ন্যায্য সুবিধা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
নারী, তরুণ ও ফ্রিল্যান্সারদের জন্য উদ্যোগ
সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য নিপুণ রায় চৌধুরী বলেন, বাজেটটি কনটেন্ট ক্রিয়েটর, ফ্রিল্যান্সার, নারী উদ্যোক্তা, কর্মজীবী নারী ও তরুণদের জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করছে।
তিনি বলেন, কনটেন্ট ক্রিয়েশন থেকে অর্জিত আয় করমুক্ত করা এবং ফ্রিল্যান্সারদের সেবার ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহারের প্রস্তাব তরুণদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ।
নারী উদ্যোক্তাদের করমুক্ত লেনদেনসীমা বাড়ানোর উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, “সমতা মানে সবাইকে এক জায়গায় দাঁড় করানো নয়। যিনি বেশি বাধার মুখোমুখি হন, তাকে এগিয়ে যাওয়ার বেশি সুযোগ দেওয়াই প্রকৃত অন্তর্ভুক্তি।”
কর্মজীবী নারীদের জন্য ডে-কেয়ার সেন্টার, পিংক বাস সার্ভিস ও নিরাপত্তা উদ্যোগের প্রশংসা করে তিনি স্যানিটারি ন্যাপকিনকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য হিসেবে বিবেচনা করে এর মূল্য তদারকির দাবি জানান।
সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য সুরাইয়া জেরিন নারী ও শিশু উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ, নারী উদ্যোক্তাদের করসুবিধা এবং কর্মজীবী নারীদের জন্য ডে-কেয়ার সুবিধার প্রশংসা করেন।
তিনি গ্রামীণ নারী উদ্যোক্তাদের জন্য জামানতবিহীন ঋণ, বেসরকারি খাতে ছয় মাস মাতৃত্বকালীন ছুটি এবং গার্মেন্টস শ্রমিকদের জন্য স্যানিটারি সামগ্রীতে ভর্তুকির প্রস্তাব দেন।
সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য মানসুরা আক্তার বলেন, ফ্যামিলি কার্ড নারীর নামে দেওয়ার উদ্যোগ অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের বড় পদক্ষেপ।
তিনি নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি, ভিকটিম সাপোর্ট এবং অনলাইনে নারীদের হয়রানি মোকাবিলায় রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা বাড়ানোর আহ্বান জানান।
মমতাজ আলো বলেন, ৪১ লাখ পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড এবং ৪২ লাখ কৃষককে কৃষক কার্ড দেওয়ার উদ্যোগ সামাজিক সুরক্ষা জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তিনি প্রবাসীদের জন্য জেলা পর্যায় এবং বিদেশে বাংলাদেশ মিশনগুলোতে ওয়ান-স্টপ সার্ভিস সেন্টার চালুর প্রস্তাব দেন।
সরকারি দলের সদস্যরা বিরোধী দলের সমালোচনার জবাবে বলেন, বাজেটের লক্ষ্য সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার করা।
সিলেট-৩ আসনের সদস্য মোহাম্মদ আব্দুল মালিক বলেন, রাজস্ব আহরণ বাড়াতে অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিকে কর কাঠামোর আওতায় আনতে হবে।
একই সঙ্গে নারী ও তরুণদের ব্যাংক হিসাব খোলা সহজ করতে টিআইএন পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করার পরামর্শ দেন তিনি।
কিশোরগঞ্জ-৬ আসনের এমপি শরিফুল আলম বলেন, এই বাজেট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঘোষিত “আই হ্যাভ এ প্ল্যান”-এর প্রতিফলন।
তিনি বলেন, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্বাস্থ্যসেবা, গ্রামীণ অর্থনীতি ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের প্রতিফলন ঘটেছে বাজেটে।
ঢাকা-১৮ আসনের সদস্য এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ এবং স্বাস্থ্য খাতের উদ্যোগগুলোর প্রশংসা করেন।
নারায়ণগঞ্জ-২ আসনের সদস্য মো. নজরুল ইসলাম আজাদ স্টার্টআপ, তথ্যপ্রযুক্তি খাত এবং প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের জন্য সহায়তামূলক কর্মসূচির প্রশংসা করেন।
সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য রেজেকা সুলতানা বলেন, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে গুরুত্ব দেওয়ার মাধ্যমে বাজেটটি জনকল্যাণমুখী রূপ পেয়েছে।
বাজেট আলোচনায় অংশ নেওয়া অনেক সদস্যই নিজ নিজ এলাকার উন্নয়ন চাহিদা তুলে ধরেন।
মমতাজ আলো মুন্সীগঞ্জে পদ্মা নদীর ভাঙন রোধে লৌহজং থেকে টঙ্গীবাড়ী হয়ে মুন্সীগঞ্জ সদর পর্যন্ত স্থায়ী বেড়িবাঁধ-কাম-রিভার ড্রাইভ নির্মাণের দাবি জানান।
গাইবান্ধা-৩ আসনের সদস্য আবুল কাওসার মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম সাদুল্লাপুরকে পৌরসভা ঘোষণার দাবি তোলেন। পাশাপাশি এমপিওভুক্তির দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষকদের বিষয়টি বিবেচনার আহ্বান জানান।
দিনাজপুর-৫ আসনের সদস্য এ জেড এম রেজওয়ানুল হক পার্বতীপুর রেলওয়ে জংশনের আধুনিকায়ন, স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ এবং অবকাঠামো উন্নয়নের দাবি জানান।
সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য জীবা আমিন খান বাজেটকে ‘মানবসম্পদ উন্নয়নমুখী’ হিসেবে বর্ণনা করে তিনি বলেন, শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর এতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিরোধী দলের সমালোচনার জবাবে তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভাঙাচোরা সড়কের যে অবস্থা দেখা যাচ্ছে, তা বর্তমান সরকারের সময়ের সৃষ্টি নয়।
ইংরেজিতে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, “দ্য রোডস আর ইন ভেরি ভেরি ব্যাড সিচুয়েশন। দিস ইজ ডিউ টু করাপশন দ্যাট ইউ হ্যাভ সিন ফ্রম দ্য প্রিভিয়াস রেজিম।”
তিনি বলেন, অতীতের দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে অবকাঠামোর অনেক খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেসব সমস্যা কাটিয়ে উঠতে সময় লাগবে, তবে সরকার পুনর্গঠন ও উন্নয়নের কাজ শুরু করেছে।