Published : 17 Jun 2026, 08:48 AM
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতার দাপট, কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের প্রভাব আর তদ্বিরের ভিত্তিতে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া—এগুলো আমাদের নিত্যদিনের আলোচনার খোরাক। সরকারে যে-ই আসুক না কেন, রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে যখন নির্দিষ্ট কোনো জেলা, পরিবার এবং বিশেষ কোনো গোষ্ঠীর অতিরিক্ত প্রভাব চোখে পড়ে, তখন বিতর্ক হওয়াটাই স্বাভাবিক। এতে শুধু প্রশাসনের নিরপেক্ষতাই নষ্ট হয় না, সাধারণ মানুষের আস্থাও বিপন্ন হয়। আমাদের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, ক্ষমতায় বসার পর দলগুলো নিজেদের অজান্তেই এমন একটা পরিবেশ তৈরি করে ফেলে, যেখানে সাধারণ মানুষের মনে হয়—যোগ্যতা থাকলেও রাষ্ট্রের সুযোগ-সুবিধা, ভালো পদে চাকরি ও পদোন্নতি সবার ভাগ্যে জোটে না। আর জনগণের মনে যখন এই বৈষম্যের ক্ষোভ একবার দানা বাঁধে, তখন তার চড়া রাজনৈতিক মূল্য কিন্তু দিনশেষে সেই সরকার আর শাসক দলকেই চোকাতে হয়।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন একটি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল গোপালগঞ্জ। দীর্ঘ সময় ধরে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে, দলীয় কাঠামোতে, এমনকি চাকরিজীবী মহলেও গোপালগঞ্জের ব্যক্তিদের প্রভাব ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে নানা আলোচনা হয়েছে। সমর্থকরা একে রাজনৈতিক আস্থা ও নেতৃত্বের স্বাভাবিক ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করলেও সমালোচকদের বক্তব্য ছিল ভিন্ন। তাদের মতে, একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলকে ঘিরে অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা এবং ক্ষমতার বলয়ে সীমিত কয়েকটি গোষ্ঠীর আধিপত্য দল ও সরকারের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হয়ে উঠেছিল। কারণ রাজনৈতিক বাস্তবতায় জনগণ সবকিছু দেখেন নিজেদের অভিজ্ঞতার আলোকে। কোনো ব্যাখ্যা যত শক্তিশালীই হোক, মানুষের মধ্যে যদি বৈষম্যের ধারণা জন্ম নেয়, তবে তা একসময় রাজনৈতিক বাস্তবতায় রূপ নেয়।
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও একই ধরনের আলোচনা নতুন করে সামনে আসছে। এবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে বগুড়া। বিশেষ করে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমকে ঘিরে বিভিন্ন মহলে নানা আলোচনা চলছে। শিক্ষা খাত থেকে শুরু করে প্রশাসনিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে তার প্রভাব নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে কথা হচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে তার নির্বাচনি এলাকা শিবগঞ্জ এবং নবগঠিত মোকামতলা উপজেলায় কয়েকটি নতুন ইউনিয়নের নামকরণ।
ঘটনার সূত্রপাত প্রশাসনিক পুনর্গঠনের মাধ্যমে। বগুড়া-২ আসনের অন্তর্ভুক্ত শিবগঞ্জ উপজেলা ভেঙে মোকামতলা নামে নতুন একটি উপজেলা গঠন করা হয়। একই সঙ্গে নতুন চারটি ইউনিয়ন গঠন করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে মীরবাড়ি, সীমান্ত, দিগন্ত ও স্বর্ণগ্রাম। সরকারি গেজেটে এসব নাম প্রকাশের পরপরই এলাকাজুড়ে আলোচনা শুরু হয়। কারণ স্থানীয়দের একটি বড় অংশের দাবি, মীরবাড়ি নামটি প্রতিমন্ত্রীর পৈতৃক বাড়ির সঙ্গে সম্পর্কিত এবং সীমান্ত ও দিগন্ত নাম দুটি তার দুই সন্তানের নামের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়।
বিষয়টি দ্রুত রাজনৈতিক বিতর্কে রূপ নেয়। সংসদেও এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে; তবে ওই আলোচনায় আসেনি যে প্রতিমন্ত্রীর এক ভাতিজির নাম ‘স্বর্ণালী’, আর নতুন চারটি ইউনিয়নের আরেকটির নাম ‘স্বর্ণগ্রাম ইউনিয়ন’।
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অবশ্য দাবি করা হয়েছে যে নামকরণের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক জানিয়েছেন, উপজেলা প্রশাসনের সুপারিশ, স্থানীয় মতামত এবং গণশুনানির ভিত্তিতে গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, প্রতিমন্ত্রী ব্যক্তিগতভাবে তাকে কোনো নির্দেশনা দেননি। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও একই ধরনের বক্তব্য এসেছে। বলা হয়েছে, তিন সদস্যের একটি কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে প্রস্তাব জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো হয়েছিল।
তবে প্রশাসনিক ব্যাখ্যার পরও বিতর্ক থামেনি। কারণ জনমনে প্রশ্ন রয়ে গেছে, যদি নামগুলো সত্যিই কাকতালীয় হয়, তাহলে সেই কাকতালীয় ঘটনাও কেন এত আলোচনার জন্ম দিল? এর উত্তর খুঁজতে গেলে রাজনৈতিক সংস্কৃতির গভীরে যেতে হয়। বাংলাদেশের মানুষ বিগত কয়েক দশকে দেখেছে, ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা ব্যক্তিদের নামে সড়ক, সেতু, প্রতিষ্ঠান, ভবন কিংবা বিভিন্ন স্থাপনার নামকরণ নিয়ে কত বিতর্ক হয়েছে। ফলে নতুন কোনো ঘটনার সঙ্গে যদি ক্ষমতাসীন কোনো ব্যক্তির পরিবারের নামের মিল পাওয়া যায়, তাহলে জনগণের মধ্যে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের এক সংসদ সদস্য প্রশ্ন তুলেছেন এ নিয়ে–যখন আইন অনুযায়ী কোনো ব্যক্তির নামে ইউনিয়নের নামকরণ করা যায় না, তখন কীভাবে এমন নাম অনুমোদন পেল? তিনি এটিকে অতীতের ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি হিসেবে উল্লেখ করেন। তার বক্তব্য ছিল, জনগণ একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রত্যাশা করে, যেখানে ব্যক্তিপূজা বা পারিবারিক প্রভাবের পরিবর্তে প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যবোধ গুরুত্ব পাবে।
এর জবাবে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম সংসদে বলেন, ইউনিয়নগুলোর নাম তার সন্তানদের নামে রাখা হয়নি। তিনি দাবি করেন, স্থানীয় বাস্তবতা এবং প্রশাসনিক যাচাইয়ের ভিত্তিতেই নাম নির্ধারণ করা হয়েছে। সীমান্ত ইউনিয়নের ক্ষেত্রে তিনি যুক্তি দেন যে এলাকাটি সীমান্তবর্তী হওয়ায় এমন নামকরণ হয়েছে। একইভাবে দিগন্ত নামটিও ভৌগোলিক বাস্তবতার আলোকে নির্ধারণ করা হয়েছে বলে তিনি ব্যাখ্যা দেন। এমনকি তিনি রসিকতার সুরে বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে সীমান্ত ও দিগন্ত নামের বহু প্রতিষ্ঠান, স্থাপনা এবং পরিবহন রয়েছে। সেগুলোও কি তার পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কিত?
প্রতিমন্ত্রীর এই ব্যাখ্যা তার সমর্থকদের কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হলেও সমালোচকদের প্রশ্ন পুরোপুরি দূর করতে পারেনি। কারণ এখানে কেবল নামের বিষয় নয়, ক্ষমতা এবং প্রভাবের ধারণাও কাজ করছে। রাজনৈতিক বাস্তবতায় অনেক সময় সত্যের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে জনগণের উপলব্ধি। জনগণ যদি মনে করে কোনো ব্যক্তি অতিরিক্ত প্রভাবশালী হয়ে উঠেছেন, তবে সেই ধারণা নিজেই একটি রাজনৈতিক বাস্তবতায় পরিণত হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে একটি অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে প্রকাশ্যে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের প্রশংসা করার পাশাপাশি বিভিন্ন বিষয়ে তার তদবিরের প্রসঙ্গ উল্লেখ করতে দেখা গেছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, এই ধরনের বক্তব্য প্রশাসনের ভেতরে ক্ষমতার অদৃশ্য কাঠামো সম্পর্কে ইঙ্গিত বহন করে। আবার অন্যদের মতে, এটি রাজনৈতিক সহকর্মীদের মধ্যে স্বাভাবিক সম্পর্কেরই বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু জনসাধারণের কাছে এমন দৃশ্য প্রায়ই ভিন্ন বার্তা দেয়। তারা ভাবতে শুরু করে, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে কি আনুষ্ঠানিক কাঠামোর চেয়ে ব্যক্তিগত যোগাযোগ বেশি কার্যকর হয়ে উঠছে?
বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য এখানেই সবচেয়ে বড় শিক্ষা রয়েছে। অতীতে আওয়ামী লীগও এমন সমালোচনার মুখে পড়েছিল। অনেক ত্যাগী নেতাকর্মী মনে করতেন, দলীয় অবদান বা সাংগঠনিক দক্ষতার চেয়ে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর ঘনিষ্ঠতা বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। একই ধরনের অভিযোগ অতীতে বিএনপির বিরুদ্ধেও উঠেছে। ফলে এটি কোনো একক দলের সমস্যা নয়, বরং ক্ষমতার সঙ্গে জড়িত একটি কাঠামোগত ঝুঁকি।
বিশেষ করে তৃণমূল পর্যায়ে এই বিষয়ের প্রভাব আরও গভীর। দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন, সংগ্রাম এবং সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকা কর্মীরা যখন দেখেন যে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রবিন্দুতে বারবার কিছু নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা একই অঞ্চলের মানুষ প্রাধান্য পাচ্ছেন, তখন তাদের মধ্যে হতাশা জন্ম নিতে পারে। এই হতাশা ধীরে ধীরে সাংগঠনিক দুর্বলতায় রূপ নেয়। রাজনৈতিক ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, বিরোধী দলের চাপের চেয়ে অভ্যন্তরীণ অসন্তোষই কখনো কখনো বড় রাজনৈতিক ক্ষতির কারণ হয়েছে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তোষামোদনির্ভর সংস্কৃতি। যখন কোনো ব্যক্তিকে ঘিরে অতিরিক্ত প্রভাবের ধারণা তৈরি হয়, তখন তার আশপাশে এমন এক বলয় তৈরি হয় যেখানে যোগ্যতার চেয়ে আনুগত্য বেশি মূল্য পায়। এতে প্রশাসনিক দক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সিদ্ধান্ত গ্রহণে পেশাদারিত্ব কমে যায়। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব পড়ে উন্নয়ন, সুশাসন এবং জনসেবার ওপর।
বাংলাদেশ বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। জনগণ অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং অংশগ্রহণমূলক শাসনব্যবস্থা প্রত্যাশা করে। তারা এমন একটি প্রশাসনিক সংস্কৃতি দেখতে চায় যেখানে কোনো অঞ্চলের পরিচয়, কোনো পরিবারের প্রভাব কিংবা কোনো ব্যক্তির ঘনিষ্ঠতা নয়, বরং যোগ্যতা, দক্ষতা এবং জনস্বার্থই হবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের মূল ভিত্তি।
এই বাস্তবতায় বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো তৃণমূলের অনুভূতি বোঝা। রাজনৈতিক নেতৃত্বের চারপাশে থাকা সীমিত কিছু ব্যক্তির মতামতের বাইরে গিয়ে সাধারণ নেতাকর্মী এবং জনগণের অভিজ্ঞতাকে মূল্যায়ন করতে হবে। কারণ ইতিহাস দেখিয়েছে, ক্ষমতার শীর্ষে বসে অনেক কিছু ব্যাখ্যা করা সম্ভব হলেও জনগণের উপলব্ধিকে অগ্রাহ্য করার সুযোগ নেই।
গণতন্ত্রের শক্তি এখানেই যে শেষ পর্যন্ত জনগণই বিচারক। তারা দেখে, শোনে এবং তুলনা করে। কোনো সিদ্ধান্ত আইনসম্মত কি না, তার পাশাপাশি তারা এটাও বিবেচনা করে যে সিদ্ধান্তটি ন্যায়সংগত কি না। ফলে মীরবাড়ি, সীমান্ত ও দিগন্ত নামের ইউনিয়নগুলো নিয়ে বিতর্ক কেবল কয়েকটি নামের বিতর্ক নয়; এটি আসলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা এবং ক্ষমতার ব্যবহারের প্রশ্নকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
অতএব, বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং আত্মসমালোচনার রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা। যে দলই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, তাদের মনে রাখতে হবে যে অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা না নিলে ইতিহাস নিজেকে পুনরাবৃত্তি করতে পারে। আর সেই পুনরাবৃত্তির মূল্য শেষ পর্যন্ত দিতে হয় দলকে, সরকারকে এবং কখনো কখনো পুরো রাষ্ট্রকেই। জনগণের আস্থা অর্জন করা যেমন কঠিন, তেমনি তা হারানোও খুব সহজ। তাই সময় থাকতে বাস্তবতা উপলব্ধি করে অন্তর্ভুক্তিমূলক, ন্যায়ভিত্তিক এবং যোগ্যতাকেন্দ্রিক প্রশাসনিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠাই হতে পারে ভবিষ্যতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অঙ্গীকার।
খালিদুর রহমান শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক। ই-মেইল: [email protected]