Published : 17 Jun 2026, 04:09 PM
বিশ্বকাপ এলে অনেকের ঘরেই একই দৃশ্য দেখা যায়। টিভির সামনে বসার আগে আলমারি থেকে বের করা হয় প্রিয় দলের জার্সি। আর্জেন্টিনার আকাশি-সাদা, ব্রাজিলের হলুদ-সবুজ, বা ফ্রান্সের নীল। তারপর সেই জার্সি পরেই বসা হয় খেলা দেখতে।
প্রশ্ন হল- ঘরের সোফায় বসে কেন জার্সি পরার প্রয়োজন হয়? মাঠে তো নামা হচ্ছে না। উত্তরটা লুকিয়ে আছে মানুষের মস্তিষ্কের গভীরে।
আমরা আসলে একটা পরিচয় খুঁজি
মানুষ স্বাভাবিকভাবেই কোনো না কোনো দলের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করতে চায়। এটা শুধু খেলার বেলায় নয়, জীবনের অনেক জায়গাতেই দেখা যায়। আর প্রিয় দলের জার্সি পরা আসলে সেই দলের অংশ হয়ে ওঠার একটা অনুভূতি।
বাস্তবে আমরা মাঠে খেলছি না, কিন্তু জার্সি আমাদের সেই কথাটাই বারবার মনে করিয়ে দেয়—আমি এই দলের সমর্থক, আমি এই দলের সঙ্গে আছি।
যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া বিজনেস স্কুলের দুই অধ্যাপক, হায়ো অ্যাডাম এবং অ্যাডাম গালিনস্কি, পোশাক কীভাবে মানুষের অবচেতন মন ও কাজের গতি বদলে দেয়, তা নিয়ে তারা ২০১২ সালে একটি ব্যাখ্যা দেন, যার নাম ‘এনক্লোথেড কগনিশন’।
তাদের গবেষণাটি পরীক্ষামূলক সামাজিক মনস্তত্ত্বের সাময়িকী ‘জার্নাল অব এক্সপেরিমেন্টাল সোশ্যাল সাইকোলজি’-তে প্রতিবেদন আকারে প্রকাশিত হয়।
সেখানে বলা হয়, জার্সি পরা ব্যক্তির মস্তিষ্কে ‘এনক্লোথেড কগনিশন’-এর মতো প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দলের সঙ্গে একাত্মতা এবং আবেগীয় অনুভূতি তীব্রতর হয়, যা খেলা দেখার অভিজ্ঞতাকে উৎসবমুখর করে তোলে।
এই পরিচয়বোধটাই মানুষের আত্মবিশ্বাস আর আবেগকে বাড়িয়ে দেয়। অনেকের কাছে এটি শুধু ফুটবল দেখার বিষয় নয়, বরং নিজের পছন্দ, আবেগ আর বিশ্বাসের একটা প্রকাশও।
মস্তিষ্কে ঘটে অন্যরকম একটা ব্যাপার
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. ফারজানা রহমান দিনা বলছেন, “জার্সি পরে খেলা দেখার সময় মানুষের মধ্যে আবেগ অনেক বেশি সক্রিয় হয়ে যায়। জার্সি পরলে মস্তিষ্কে এক ধরনের ‘এংগেজমেন্ট ফিলিং’ তৈরি হয়। ফলে গোল হলে আনন্দটা বেশি লাগে, আর হারলে কষ্টও আরও গভীর হয়।”
এই অনুভূতির নাম ‘ইমোশনাল ইনভলভমেন্ট’। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, জার্সি পরলে খেলাটা আর শুধু টিভির পর্দার ভেতরের একটা ঘটনা থাকে না, সেটা হয়ে যায় ব্যক্তিগত; যেন নিজের সঙ্গেই কিছু ঘটছে।
এই কারণেই জার্সি পরে খেলা দেখার সময় কেউ গোল হলে চিৎকার করে ওঠেন, কেউ হারের পর সারা রাত মনখারাপ করে থাকেন। শুধু জার্সি ছাড়া দেখলে এই তীব্রতাটা থাকে না।

একসঙ্গে অনেকের সঙ্গে এক হওয়ার অনুভূতি
ফুটবল একটা দলীয় খেলা। আর সমর্থকদের মধ্যেও একটা দলীয় অনুভূতি কাজ করে। জার্সি পরা মানে শুধু নিজের একটা অনুভূতি নয় বরং একটা বিশাল জনগণের সঙ্গে যুক্ত হওয়া।
“রাস্তায় হাঁটতে গিয়ে যখন একই জার্সি পরা আরেকজনকে দেখা যায়, একটা অদৃশ্য বন্ধন তৈরি হয়। চেনাজানা না থাকলেও মনে হয়, ‘আরে, আমিও তো এই দলের সমর্থক”, মন্তব্য করেন ডা. দিনা।
এই অনুভূতিটা সামাজিক পরিচয়ের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটাই মানুষকে একত্রিত করে, একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত হতে সাহায্য করে।
ডোপামিনের খেলা
খেলা দেখার আনন্দটা শুধু মনের নয়, শরীরেরও অংশ।
যুক্তরাষ্ট্রের মারে স্টেট ইউনিভার্সিটি’র মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক ডা. ড্যানিয়েল ওয়ান, ‘আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন’-এর পডকাস্ট ‘স্পিকিং অব সাইকোলজি’তে বলেন, “জার্সি পরা কেবল ফ্যাশন নয়, বরং এটি মস্তিষ্কের ডোপামিন নিঃসরণ বাড়িয়ে ‘ইমোশনাল অ্যাম্প্লিফিকেশন’ বা আবেগের তীব্রতা তৈরি করে।”
পডকাস্ট অবলম্বনে রিসার্চগেইট ডটকম’য়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়, ডোপামিন হল সেই রাসায়নিক পদার্থ, যা আনন্দ আর পুরস্কারের অনুভূতির সঙ্গে জড়িত। সাধারণ একটা ম্যাচ দেখাই এতে পরিণত হয় উৎসবে। হঠাৎ মনে হয় না যে শুধু একটা খেলা দেখছি, মনে হয় একটা উদযাপনের অংশ হচ্ছি।

জার্সি পরা যখন ‘রিচুয়াল’ বা সংস্কার
অনেকের কাছে জার্সি পরে খেলা দেখা একটা নিয়মিত রিচুয়ালে পরিণত হয়। যেমন, কেউ নির্দিষ্ট চেয়ারে বসেই খেলা দেখেন, কেউ নির্দিষ্ট খাবার খান, কেউ আবার নির্দিষ্ট বন্ধুদের সঙ্গেই মিলিত হন। জার্সি পরাটাও এই সংস্কারের একটা বড় অংশ।
আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের এক প্রতিবেদনে ডা. ওয়ান বলেন, “এই ধরনের রিচুয়াল মানুষের মস্তিষ্ককে একটি প্রি-গেইম সিগন্যাল বা আগাম সংকেত পাঠায়- এখন খেলার সময়, এখন দৈনন্দিন দুশ্চিন্তা ভুলে আনন্দ ও উত্তেজনার সময়। মস্তিষ্ক এই সংকেত পেয়ে ‘এনক্লোথেড কগনিশন’ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিজেকে আগেভাগেই চরম উত্তেজনার জন্য প্রস্তুত করে নেয়, যা খেলা উপভোগের মাত্রাকে দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেয়।”
আত্মবিশ্বাস আর ইতিবাচক শক্তি
প্রিয় দলের জার্সি পরলে অনেকের মধ্যে একটা বিশেষ আত্মবিশ্বাস কাজ করতে শুরু করে। মনে হয়, ‘আমি আমার দলের সঙ্গে আছি, আমি তাদের সমর্থন করছি, আমার শক্তিটাও তাদের কাছে পৌঁছাচ্ছে।’
ডা. দিনা বলেন, “এই অনুভূতিটা পুরোপুরি যুক্তিনির্ভর না হলেও মানসিকভাবে একটা ইতিবাচক শক্তি তৈরি করে। আর এই শক্তিটাই খেলা উপভোগের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয়।”
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নতুন মাত্রা
জার্সি পরে খেলা দেখা এখন শুধু ঘরের চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ নেই। অনেকেই সেই মুহূর্তের ছবি বা ভিডিও ফেইসবুক বা ইন্সটাগ্রামের শেয়ার করেন। এর মাধ্যমে মানুষ নিজের ফ্যান পরিচয় প্রকাশ করে, একই সঙ্গে সারা বিশ্বের অন্য সমর্থকদের সঙ্গেও একটা সংযোগ তৈরি করে।
যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটি -র ইমেরিটাস অধ্যাপক এবং আচরণ বিজ্ঞানী ড. রবার্ট সিয়ালদিনি মনস্তাত্ত্বিক সাময়িকী ‘জার্নাল অব পারসোনালিটি অ্যান্ড সোশ্যাল সাইকোলজি’-তে প্রকাশিত, তার গবেষণায় একে ‘অন্যের সাফল্যে নিজে গর্বিত হওয়া’র মতবাদ দিয়ে ব্যাখ্যা করেছেন।
তার মতে, “মানুষ যখন প্রিয় দলের জার্সি পরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছবি দেয়, তখন সে মূলত নিজের বন্ধুদের সামনে জানান দেয় যে- সে একটি বিজয়ী বা শক্তিশালী দলের অংশ। এর মাধ্যমে ব্যক্তি সামাজিকভাবে নিজের আত্মসম্মান বা ‘কালেক্টিভ সেলফ-এস্টিম’ বাড়িয়ে নেয়।

এই বিষয়ে ডা. ড্যানিয়েল ওয়ান মন্তব্য করেন, “সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই ‘জার্সি শেয়ারিং’ মানুষের একাকিত্ব দূর করতে কাজ করে। হাজার মাইল দূরে থাকা একজন আর্জেন্টিনার সমর্থক যখন ফেইসবুকে অন্য আরেকজন অপরিচিত সমর্থককে একই জার্সি পরা দেখেন, তখন তাদের মধ্যে একটি ‘ডিজিটাল সোশ্যাল এনগেইজমেন্ট’ বা ভার্চুয়াল বন্ধন তৈরি হয়।”
এর মাধ্যমে মানুষ অবচেতনভাবেই মনে করে, ‘আমরা একা নই, আমরা একই দলের, একই বৈশ্বিক অনুভূতির অংশ’।
আরও পড়ুন