Published : 16 Jun 2026, 02:01 AM
তখন জ্যৈষ্ঠ মাস; নাটোরের বড়াইগ্রামের প্রান্তিক চাষি কামাল হোসেন তার ক্ষেত থেকে ধান কেটে বাড়িতে নিয়ে আসেন। এর মধ্যে একবার ক্ষেত থেকে এসে মা আনোয়ারা বেগমের সঙ্গে ঘরে থাকা ধান রোদে শুকাতে দেন। সন্ধ্যায় মা-ছেলে মিলে সেসব ধান বস্তায় ভরে আবার ঘরে তোলেন।
সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সেদিন পরিশ্রম করে ক্লান্ত ছিলেন কামাল। সন্ধ্যার পর একটু ভাত মুখে দিয়ে বাড়ি থেকে বের হন। মা আনোয়ারা বেগমকে বললেন, কিছুক্ষণ পরেই বাড়িতে ফিরবেন।
রাত গভীর হয়, কামাল আর বাড়ি ফেরেন না। মায়ের দুশ্চিন্তা হয়; ঘর থেকে বাইরে যান; ছেলের কোনো হদিশ পান না।
অনেক রাতে প্রতিবেশী এক ননদ এসে আনোয়ারা বেগমকে জানান, তার ছেলেকে কারা যেন তুলে নিয়ে গেছে। আনোয়ারার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। কামালকে কেন ধরে নিয়ে যাবে? কামাল তো কোনো রাজনীতি করে না, তার নামে কোনো মামলাও নেই।

২০১৩ সালের ১৯ মে রাতে সাধারণ পোশাকের একদল লোক তুলে নিয়ে যায় কামাল হোসেনকে। সেই খবরে আনোয়ারা বেগম ছোটেন র্যাব কার্যালয়ে। সেখান থেকে জানানো হয় তারা এমন কাউকে ধরেননি।
এরপর এই মা যান পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) কার্যালয়ে। তারাও বলে, কামালকে তারা আটক করেনি। শেষে তিনি থানায় জিডি করেন। কিন্তু ছেলের খোঁজ থানা দিতে পারেনি।
পরে আনোয়ারা বেগম জানতে পারেন, সেদিন শুধু গুরুমশৌল গ্রামের কামাল নয়, একই কায়দায় আরও দুই যুবককে তুলে নেওয়া হয়। তারা হলেন, ওই গ্রামের কৃষক ইব্রাহীম তালুকদার এবং পাশের মহিশভাঙ্গার গ্রামের ভটভটি চালক তৌয়ব আলী।
সেই থেকে এক যুগ পেরিয়ে গেছে, কামালের জন্য তার মা আনোয়ারা বেগমের অপেক্ষা শেষ হচ্ছে না। ছেলের জন্য কাঁদতে কাঁদতে চোখের জলও যেন ফুরিয়ে গেছে।

আফসোসের সুরে আনোয়ারা বলছিলেন, “কত খোঁজ করছি, বেটার আর খোঁজ মিলল না। এখন কি আর আছে? নাই মনে হয়। থাকলে তো ঠিকই মায়ের খোঁজ নিত। সপনে দেখি হাত-পা বান্দি নদীতে ফেলায় দিছে।
“এখন দোয়া করি, আল্লাহ, তুমি যদি রাখো তাইলে মায়ের সন্তান মায়ের কোলে দাও। আর যদি লি যাও, বেহেশতবাসী করি দিও আল্লাহ। আমার মত কারোরে তুমি আল্লাহ এরকম কইরো না।”
বড়াইগ্রামের তিনজনকে তুলে নেওয়ার ঠিক দুদিন আগে বনগ্রাম থেকে আরও দুজনকে একই কায়দায় উঠিয়ে নেওয়া হয়। তাদের মধ্যে একজন ছিলেন কালিকাপুরের বিজিবির সাবেক সদস্য রাসেল গাজী; আরেকজন রাসেলের বন্ধু পাশের কাটাশকুল গ্রামের সেন্টু হোসেন।
বড়াইগ্রাম ও বনগ্রামের এই পাঁচজনের খোঁজ আজও পায়নি পরিবার। এসব পরিবারের সদস্যরা জানতেও পারেননি তাদের সন্তানদের কী অপরাধে তুলে নেওয়া হয়েছে আর কী পরিণতিই বা তাদের হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও তাদের ব্যাপারে কোনো তথ্য দিতে পারেনি।

আনোয়ারা বেগম সেদিনের কথা স্মরণ করে বলছিলেন, “আমার এক নন্দে আসি কচ্চে কামালরে ধরে নিয়ে গেছে। কে নিছে? র্যাবে নিছে। ওখানে গেছি আর কচ্চে ডিবির লোকে নিছে। পরে ডিবি অফিসে গেছি, হেরা কয় নেয়নি, র্যাব অফিসে গেছে কয় নেয়নি। তাইলে নিল কে সেই খোঁজ পাচ্চিনে। থানায় জিডি করছি, থানায় লোকে কইছে আমরা জানি না।
“সবাই জানে কারা নিছে কিন্তু এখন তারা কেউ কয় না। এখন আর কী কবো। আমাদের তো কারো সাথে শত্রুতাও নাই, মারামারি-ফাটাফাটি কিচ্চু নাই। থানায় মধ্যে যদি চার-পাঁচটা মামলা থাকত তাইলে কইতাম কোনো সন্ত্রাস করে এইজন্য, তাও তো নাই।”
কথা বলতে বলতে একপর্যায়ে ক্ষিপ্ত হয়ে আনোয়ারা বেগম বলেন, “ব্যাটারে চাই। যদি বেটা বাঁচি থাকে তাইলে বেটারে চাই। আর যদি মরি যায় তাইলে আল্লাহ লিয়া গেছে, তাইলে লাশ তো আর পাব না, পাব? বারালে তো আগেই বারাতো।”
‘বিশ্বরোড থেকে র্যাবের গাড়ি আসি ধরি লিয়ে গেচে’
কামালের মত ইব্রাহিমও প্রান্তিক কৃষক। সেদিন সারাদিনই বাবা আর ভাইয়ের সঙ্গে ধান মাড়াই-কাটাই করেছেন। তারপর সন্ধ্যার দিকে বনপাড়া বাজারের দিকে যান ইব্রাহিম।
বাড়ি থেকে সেই তার শেষ যাওয়া। আর ফিরে আসেননি। পরিবার পরদিন সকালে জানতে পারে ইব্রাহিমকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
ইব্রাহিম বিয়ে করেছিলেন। তার এক ছেলেও আছে। কিন্তু স্বামী ফিরে না আসায় ইব্রাহিমের স্ত্রী অন্য একজনকে বিয়ে করেছেন।
ইব্রাহিমের পরিবারের আফসোস, ওই একটি ঘটনা তাদের সংসার তছনছ করে দিয়েছে।

ইব্রাহিমের ছোট ভাই বলেন, “বিশ্বরোড থেকে র্যাবের গাড়ি আসি ধরি লিয়ে গেচে। ইব্রাহিম, কামাল আর তৈয়বেক ধরছে। ভাইয়ের একটা অপরাধ থাকলে তার বিচার হোক, কিন্তু এভাবে গুম হয়ে গেচে; কোন দেশে থাকি আমরা!
“অপরাধ থাকলে তার শাস্তি হলে আরও ১০টা লোক দেখতো যে, এই লোক এই অপরাধ করছে তাই এর শাস্তি হল। কিন্তু জানাশোনা নাই, কোনো অপরাধ দেখলাম না কিন্তু লোক নাই। মনে কষ্টই, বড় ভাই আমারে মানুষ করছে, কামাই রোজগার করি বড়ভাই আমারে খাওয়াইছে।”
তিনি বলেন, “যদি বাঁচি থাকি আমরা লাশ হলেও চাই। আর আল্লাহ যদি বাঁচায় রাখে ফিরে আসে তাইলে তো ভালো।”
ইব্রাহিমের বৃদ্ধ বাবা রুহুল আমিন অভিযোগ করে বলছিলেন, “বেটারে নিয়ে যাওয়ার পর থানায় গিয়ে জিডি করলাম। তার একমাস পরে জিডির কাগজ দিছে; সাতে সাতে দেয়নি। আমার ছেলের অপরাধ আমরা তো দেকিনি।
“এখন কী হালে ধরিচে সেটা আমরা তো বলতে পারব না। ১২ বছর হয়ি গেছে, এখন যদি থাকি থাকে, সরকার যদি আমার ছেলেরে বাইর করি দেয় তাইলে আমরা শান্তি পাব। আর না থাকলে কী করতে পারবো আমরা?”

ইব্রাহিম হোসেনের মা সুফিয়া খাতুন কাঁদতে কাঁদতে বলেন, “মানষের বাড়ি কাম করিছে, প্যাট দিয়ে ছলপল মানুষ করিছি। আমারে জায়গা জমিন নাই। খুব কষ্টের ছাওয়াল পল আমারে। ওই ছলপল লি গেছে। ওই আল্লাহ জানে, কী দিয়ে কী হইছে। আমার বলা লাগবি না, সবাই বলবি আমার ছাওয়াল খারাপ না ভালো।
“গণ্ডগোল, ফ্যাসাত, মারামারি ওইগুলো কোনোদিনও কারো সাথে নাই। শুনিছি র্যাপে ধরিছে এই পর্যন্ত জানি। কিন্তু কেন ধরিছে জানিনি। আমরা চাই, আল্লাহরস্তে যেন ছওয়ালগুলো আমারে দেয়।”
একই ধরনের আফসোস আর আক্ষেপের কথা বলছিলেন মহিশভাঙ্গার গ্রামের ভটভটি চালক তৌয়ব আলীর মা হাসেনা বেগমও।
তিনি বলেন, “আমরা ছেলেটাক তুমরা একটু ফিরায় দেও। আমার ছেলে যেতে আমার বুকে ফিরে আসে। মৃত্যু হলে লাশও যদি থাকে লাশই দেও।
“বিটার জন্য খুব কষ্ট, দিনেরাতে খালি কান্দি। আমার বিটা ভুটভুটি চালায় খাইছে, কার সাতে যে কী করিছে এডি আমরা বলতে পারিনি।”

তৈয়বের বড়ভাই শাহাদত হোসেন বলেন, “আমার ভাই যদি মারাও যাতো, তাও আমরা বুঝতে পারতাম। কিন্তু গায়েব হয়্যা গেছে, গুম হয়্যা গেছে- এডার জন্য বড় কষ্ট লাগে। কোলেপিটে করি ছুটভায়েক মানুষ করিছি। ভাইয়ের শোকে শোকে বাপ-মায়ের শরীরতো লষ্টই হয়া গেছে।”
‘সেন্টু সেদিন রাসেলকে ডেকে নেয়’
রাসেল আর সেন্টু ছোটবেলা থেকেই খুব ভালো বন্ধু ছিলেন। একজনের বিপদে আপদে আরেকজন পাশে দাঁড়াতেন।
২০১৩ সালের ১৭ মে সন্ধ্যায় সেন্টু বাড়ি থেকে রাসেলকে ডেকে নিয়ে যান। পরে রাতে আর তারা বাড়ি ফেরেননি। পরদিন ১৮ মে সকালে দুজনের পরিবার জানতে পারে, বনপাড়া মোড় থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তাদের তুলে নেওয়া হয়েছে।
এক যুগ আগের সেই ঘটনা মনে করে এখনও রাসেলের বাবা-মা হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন। আর সেন্টুর বৃদ্ধ বাবা-মা সন্তানের অপেক্ষায় থেকে থেকে পৃথিবী থেকেই বিদায় নিয়েছেন।

নিখোঁজ রাসেল গাজীর মা জুলেখা বেগম বলছিলেন, “আমার ছেলে যেন ফিরে আসে। সরকার যেন আমার ছেলেকে আমার বুকে ফিরায় দেয়। দেশে এখন গুম-খুনের বিচার হচ্ছে। এই সাতে যদি আমার ছেলেটাক একটু খুঁজে বের করে দেয়।”
রাসেলের বাবা ওমর ফারুক গাজী বলেন, “আমার ছেলে তো চোরও না ডাকাতও না। বিডিআরে চাকরি করত। আমার ছেলেটা হারায় গেল, ছেলেটাক আর পেলাম না। ছেলেটাক গুম করে রাকলো। সরকার যদি দয়া করে দেখে, তাইলে হয়তো আমার ছেলেটাক পেতে পারি।”
একই দাবি জানিয়ে চোখের পানি মুছে নিখোঁজ সেন্টুর বড় ভাই সুজন মাহমুদ বলেন, “এখন পর্যন্ত ধরাও খায়নি বা মারা পড়ছে এরকম খোঁজ-খবর আজও কেউ দিতে পারেনি। আমাদের একটা বিশ্বাস, ছোটভাই মারা পড়েনি। অনেক খোঁজাখুজি করছি পাইনি। আব্বা-আম্মা দুইজনই ছোট ভাইয়ের শোকেই মারাই গেল।

“শুনছি ওইদিন সাদা প্রাইভেটকারে উটি চলি গেছে। কিন্তু কই গেছে সেই খোঁজ আর পাইনি। আমার এটার একটা সুরাহা চাই। গুম, খুন তো করার কথা না। কেউ অন্যায় করলে জেল আছে, জরিমানা আছে, ফাঁসি আছে। কেউ হারালে তার লাশটাও তো পাওয়া লাগবি, সেই লাশটারও তো আজ পর্যন্ত কোনো খোঁজ পালাম না।”
খুবই দুঃখজনক: পুলিশ
পাঁচজনের নিখোঁজের বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি কথা হয় নাটোরের বড়াইগ্রাম-লালপুর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শোভন চন্দ্র হোড়ের সঙ্গে।
তিনি বলেছিলেন, “খুবই দুঃখজনক। দুইটা ঘটনা, একটা বনপাড়ার যেখানে দুইজন মিসিং। এরা বন্ধু ছিল, একজন বিজিবিতে চাকরি করত, পরে চাকরিচ্যুত হয়েছিলেন। এই ঘটনায় মামলাও হয়েছিল। কিন্তু যাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল তাদের বিরুদ্ধে আসলে সেরকম কিছু পাওয়া যায়নি। ফলে তাদের বিরুদ্ধে কোনো কিছু প্রমাণিত হয়নি।
“আরেকজন যে তার ফ্রেন্ড (সেন্টু), সেও মিসিং, তাকে আর পাওয়া যায়নি। সেইসময়ে সবাই চেষ্টা করেছেন, কিন্তু তাদের পাওয়া যায়নি আনফরচুনেটলি।”

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শোভন বলেন, মহিষভাঙ্গা গ্রামের তিনজনকেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।
“স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে আমি কথা বলেছিলাম। কিন্তু ঘটনা এত আগের যে, কেউ স্পষ্টভাবে কিছু বলতে পারেনি। আর ঘটনাস্থলে যারা ছিলেন তাদেরকেও ওইভাবে পাওয়া যায় না।”
তিনি বলেন, “যাদের নিয়ে যাওয়া হয়েছে তারা খুবই সাধারণ মানুষ। লোকাল লোকজনও কাউকে সন্দেহ করতে পারছেন না, যে কেন এদের নিয়ে যাওয়া হয়েছে। যারা ওইসময় এখানে কর্মরত ছিলেন, তাদের সঙ্গেও আমি যোগাযোগের চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু এটা বের করা কঠিন। কারণ, অনেক আগের ঘটনা।”
এক প্রশ্নের জবাবে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বলেন, “আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে মানুষের অভিযোগ তো আছেই। সেগুলোর সমাধানও মানুষ পাচ্ছে। অভিযোগ থাকতেই পারে। কাজ করতে গেলে মানুষের ভুল হয়, অভিযোগ হতেই পারে। উনাদের জিডির কপিটাও উনাদের কাছ থেকে সংগ্রহ করতে পারিনি; বা উনারা আমাকে দিতে পারেননি। উনারা যদি লিগ্যাল প্রসেসের মধ্যে আসেন, আমরা সর্বোচ্চ সহযোগিতা করতে পারব।”