মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬,
২ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬
শিরোনাম: সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর      ভারতের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনারকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব      বাতিল হচ্ছে সরকারি চাকরিজীবীদের ‘বিশেষ সুবিধা’      ভারতের ভিসা অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে নতুন নির্দেশনা      ২০ জুলাইয়ের মধ্যে এসএসসির ফল প্রকাশ: শিক্ষামন্ত্রী      দিল্লিতে রাষ্ট্রীয় সফর বাতিল করে দেশে ফিরলেন তথ্য উপদেষ্টা      দেশে ফিরেছেন ৫৬ হাজারের বেশি হাজি      
সাহিত্য
বরিশালের আঞ্চলিক কথ্য ভাষার স্বরূপ সন্ধান
শাহ আলম ডাকুয়া
প্রকাশ: সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২৬, ৫:৪৫ পিএম

বরিশালের কথ্য ভাষা বা লোক ভাষার আলাদা রূপ বা ধরন রয়েছে। এ অঞ্চলে কিছু কিছু শব্দ এমনভাবে উচ্চারিত হয় যা বাংলা ভাষার বর্ণের একটু পরিবর্তন করে উচ্চারিত হয়। যেমন ‘হাট বা হাটে’। এ শব্দ বরিশাল এলাকার মানুষজন হা ও আ-এর মাঝামাঝি এক বর্ণে প্রকাশ করে যা হাডে বা আডে নয়-। অন্য দুটো শব্দ- যেমন ‘হাগতে বইছে’ এখানেও হাগার উচ্চারণ হ এবং আ-এর মাঝামাঝি একটা বর্ণ ব্যবহার করা হয়। যা বাংলা বর্ণমালায় নেই।

লোক জীবনের সব উপাদানই বরিশালের সংস্কৃতি ও কথ্য ভাষায় রয়েছে। এ জনপদ বাংলার অন্য জনপদগুলো হতে ভিন্ন। নদীভাঙন, চর ও জলের জীবন অন্য অঞ্চল থেকে এই অঞ্চলের মানুষ বেশিরকম প্রত্যক্ষ করেছে। এ অঞ্চলের ভাষার যে টান- তা যেন অনেকটা জলকল্লোলেরই ধারার মতো বহমান। পাশাপাশি একই সঙ্গে বসবাসরত বাওয়ালি, জেলে, পাটিয়াল, কুডিয়াল, নইদ্দা, গাছি, ময়রা, ধুনারি, কাঁসারু, কুয়াইত্তা- এসব অন্যান্য অঞ্চলে একই সঙ্গে দেখা পাওয়া ভার।

বরিশালের পূর্ব নাম বাকলা-চন্দ্রদ্বীপের যে এলাকা বিস্তৃত ছিল তার সংস্কৃতিই বর্তমান বরিশালের মূল সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য হিসেবে ধরা হয়। এ অঞ্চলের কথ্য ভাষা, লোককাহিনি, লোক ছড়া, প্রবাদ-প্রবচন, লোকধাঁধা, হয়ালি, লোকনাটক, লোকসঙ্গীত, কিংবা মন্ত্রের দিকে চোখ রাখলেও দেখা যায়, এগুলো নিজ বৈশিষ্ট্যে অনন্য ও স্বতন্ত্র। প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো সব কিছুতেই যেন নদীনির্ভরতা। 

এ এলাকায় বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো অনেক লোকখেলাও রয়েছে। দাইড়্যাবান্ধা, ছি ছি, তইতই, পানিঝুপ্পা, ডাঙ্গুলি, বৌছি, গোল্লাছুট, কাঁঠাল কাঁঠাল, সাতছি, বোনভোজন, চাড়ামারি (নৈ নৈ), সাতচাড়া, ডুবপলান্তি মারবেল, পাতাসিট ইত্যাদি অন্যতম। এই খেলাগুলো অন্য অঞ্চলেও কমবেশি রয়েছে। 

পাশাপাশি লোকজ যানবাহনের মধ্যে কাঠামি নাও, বাচারি নাও, তালের ডোঙ্গা, সুপারি গাছের নৌকা, একমালোই, গয়না নৌকা এই অঞ্চরের ঐতিহ্য তুলে ধরে। লোকশিল্পের দিকে তাকালেও দেখা যায় একই অবস্থা। শোলাশিল্প, কাঁথাশিল্প, পাটিশিল্প, ছোবড়াশিল্প, মৃতশিল্প- এগুলো অনেকটা অন্য অঞ্চলে মিলবে না।

বৃহত্তর বরিশালে লোকমেলা ও উৎসব, লোকবিশ্বাস-লোকসংস্কার ও লোকাচার-লোকপ্রথা, লোক-উপকরণসহ নানাবিধ লোকমাত্রিক অনুষঙ্গ। 

লোকসঙ্গীত ও নৃত্য : নদীভাঙন, চর ও বন্যার সাথে লড়াই করা মানুষের মনের অকৃত্রিম অনুভূতির প্রকাশ ঘটে জারি, সারি, ভাটিয়ালি, গম্ভীরা এবং মর্সিয়া গানের মাধ্যমে। 

লোকভাষা: বরিশালের নিজস্ব আঞ্চলিক ভাষা বা উপভাষা বেশ স্বতন্ত্র, যা অন্যান্য অঞ্চল থেকে উচ্চারণ ও শব্দচয়নে সম্পূর্ণ ভিন্ন।

লোকসাহিত্য ও প্রবাদ: এ অঞ্চলের মানুষের জীবনবোধ, বুদ্ধি ও হাস্যরসের প্রকাশ ঘটেছে অসংখ্য প্রবাদ-প্রবচন ও ছড়ার মাধ্যমে।

লোকশিল্প ও উৎসব: কারুশিল্প, নকশি কাঁথা, নৌকাবাইচ এবং পীর-মাওলানাদের ওরস বা মেলা গ্রামীণ সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।


ঐতিহ্যবাহী পেশা: ধান, নদী ও খালের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এ জনপদে কৃষি ও মৎস্যজীবীদের জীবনের গল্প লোকসংস্কৃতিকে করেছে সমৃদ্ধ। 

বরিশালের এই লোকসংস্কৃতি মূলত এখানকার জনগোষ্ঠীর লড়াকু মানসিকতা এবং প্রকৃতির সাথে অভিযোজনের ইতিহাস বহন করে।

বরিশাল অঞ্চলের মানুষ দৈনন্দিন বিভন্ন কাজে ছড়ার মাধ্যমে প্রকাশ করে। যেমন
ছোট শিশুকে পায়ের ওপর শুইয়ে তাকে ঘুম পাড়ানোর জন্য মা বা বড় বোন দোলনার মতো পা দুলিয়ে বলছে-

‘মোগো মোনু ভালো
আম টোহাইতে গ্যালো
আমে অইলো আঁশ
মোগো মোনু মাইনর পাস।’

উপরের এ ছড়াটিতে বরিশালের আঞ্চলিক শব্দ ব্যবহার হয়েছে- মোগো মানে মোদের, মোনু মানে ছোট শিশুদের এবং বড়দেরও মাঝে মাঝে যে নামে ডাকা হয়। এটা হলো বরিশাল অঞ্চলের অতি পরিচিত শব্দ। কেউ মোনু উচ্চারণ করলেই বোঝা যায় বা ধরা হয় তার বাড়ি বরিশাল অঞ্চলে। অইলো মানে হলো। এ শব্দটিও বরিশাল অঞ্চলে ব্যাপক ব্যবহৃত হয়। মাইনর মানে শিক্ষাজীবনের পরীক্ষার একটা পর্ব। যেমন বর্তমানে প্রচরিত আছে জেএসসি, জেডেসি, এসএসসি, এইচএসসি এরকম। ব্রিটিশ আমলে ও পাকিস্তান আমলের গোড়ার দিকে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত একটা পরীক্ষা পর্ব ধরা হতো যাকে বলা হতো মাইনর পরীক্ষা ও মাইনর পাস।


বাংলা ভাষার একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদ-
‘কষ্ট না করলে কেষ্ট মেলে না’।
বা
‘কষ্ট ছাড়া কেষ্ট মেলে না’। 

মানে কষ্ট না করলে প্রার্থিত ফল পাওয়া যায় না। এই প্রবাদ-প্রবচনটি বরিশাল অঞ্চলের নয়। এটির প্রথম প্রকাশ জানা যায় ভারতীয় হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বাংলাভাষীদের লেখা থেকে। হিন্দুদের কেষ্ট দেবতাকে পেতে হলে অনেক ধ্যান সাধনা করতে হয়। তপস্যা করতে হয়। 
এই একই প্রবাদের বরিশালি ভার্সন বা বরিশাল থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে নিম্নরূপভাবে

‘ওল না ভিজাইলে 
ঝোল খাওয়া যায় যায় না।’
(বরিশালের উজিরপুরের হস্তিশুণ্ড গ্রাম থেকে)

আগৈলঝাড়া উপজেলা থেকে সংগৃহীত এই একই প্রবাদ
ভিজাও ওল
খাও ঝোল।’
এ প্রচলিত প্রবাদ বাক্যের মূল অর্থ একই। পুকুরে বা খাল নদীতে মাছ ধরতে গেলে পানি ছোঁব না তা হয় না। কোনো না কোনোভাবে পানিতে নামতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে ওল (অণ্ডকোষ) পর্যন্তও ভিজাতে হয়। মানে কষ্ট করতেই হবে মাছ পেতে হলে, মাছ ধরতে হলে। তারপরে সেই মাছ রান্নার পরে তরকারি (ঝোল) খাওয়া যাবে।


বরিশাল এলাকার শিশু ও কিশোরদের মধ্যে একে অন্যকে নিয়ে মশকরা করার প্রচলন আছে।  তারা হাসিতামশা করে ছড়ায় ছড়ায়। ছোট শিশু-কিশোররা মাথায় চুল চেছে ন্যাড়া করে। তখন ছড়ায় ছড়ায় বলে থাকে 
‘নাইড়্যা ব্যাল কইড়্যার থাল
পাদ দেলে যায় বরিশাল।’
(উজিরপুরের আটিপাড়া গ্রাম থেকে সংগ্রহ)

অথবা
‘নাইড়্যা ব্যাল কইড়্যার থাল
পাদ দেলে যায় বরিশাল।
বিয়া কবে হুক্কুরবার
মোরে ইট্টু বিয়া হর।
নাইড়্যা গ্যাছে আইড্যা
ব্যালডা গ্যাছে ফাইড্যা।
(উজিরপুরের চকমান এলাকার মোল্লা বাড়ি থেকে সংগ্রহ)

আবার শোনা যায়- 

নাইড়্যা 
ভাত খায় বাইড়্যা
সালুন খায় কম 
পাদ দেওয়ার যোম।
(গৌরনদীর বার্থি এলাকা থেকে)

আবার বরগুনার আমতলি উপজেলায় শোনা যায় এ ভাবে-

নাইড়্যা 
ভাত খায় বাইড়্যা
সালুন খায় কম 
পাদে ভোম ভোম।
(সংগ্রাহক: ফরহাদ নাইয়া/কবি ও লেখক, আমতলি, বরগুনা)।

বরিশাল এলাকার ছোট শিশুরা অনেক সময় (১২ বছর বয়স পর্যন্ত) ল্যাংটা হয়ে কয়েকজন মিলে পুকুরের ঝাঁপ দেয়, পানিতে ডুব সাঁতার খেলে। এ সময় একজন আরেকজনকে টিটকারী করে বলে থাকে


ল্যাংডা কাতলা পিতম্বর
যুগীর মাইয়্যা বিয়া হর
আনবি কবে হুক্কুরবার
মোরে ইট্টু দাওয়াত হর।

এমন একটা সময় ছিল বৌ-ছি খেলা ছাড়া ভাল লাগতো না। ৮/১০ জন মিলে উঠানে, ফসলী জমিতে, মাঠে জমে উঠতো খেলাটি। বৌ-ছি যে এখন খেলছে না কেউ, তা কিন্তু নয়। তবে তুলনামুলক আলোচনায় বিলুপ্ত প্রায়। ২০২৬ সালে গ্রামে গ্রামে ক্রিকেট খেলা দখল করেছে বৌ-ছির জায়গা।

বৌ-ছি খেলার জন্ম কোন সালে এমনকি কোন দশকে তা সুনির্দিষ্ট করে বলা মুশকিল। তবে বলা যায় গত ৫০০ বছরের ইতিহাসে এ ধরনের খেলাধুলার অস্তিত্ব ছিল বলে লোক গবেষকদের ধারণা। বৌ-ছি খেলা একদিকে সংস্কৃতি চর্চা অন্য দিকে শক্তিমান সাহিত্যে ভরা। এতে রয়েছে গতি, উন্মুখতা, ছন্দ, তাল ও সুরের সুষম মিশ্রণ। আর তাই ঘাসফুল ভেবে মারিয়ে গেলে চলবে না, চর্চা ধরে রাখতে হব।
বৌ-ছি খেলার সবগুলো উপাদানের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হল এর ভাষার প্রয়োগ। খুব সংক্ষিপ্ত বয়ানে ভাষার সুনিপুন যে বুনন হয় তাতে এরুপ সাহিত্য জন্ম নেয়, যেন চুলচেরা বিশ্লেষণে সাহিত্যের সকলের প্র-পিতামহ। কতক বিষয় ভিত্তিক গবেষককে বৌ-ছি খেলা নিয়ে খেলা করতে দেখা গেছে। 


‘ছিয়াত্তা ছিয়া রানি
ভাত দিয়া যা চুতপারানি- চুতপারানি...চুতপারানি।’
(উজিরপুরের হারতা থেকে সংগ্রহ)

ছি ছি ছিয়া রানি
ভাত দিয়া যা চুতমারানি...চুতমারানি...চুতমারানি।
(ভোলার চরফ্যাশন থেকে সংগ্রহ)

ছি আত্মা
ছি রানি
বৌ মারে কোন চুতমারানি?

আবার শোনা যায়-
ছি কুতকুত লাইয়্যা
বাবুলের মাইয়্যা
বাবুল কান্দে
কাঁচা ক্যালা খাইয়া
(আমতলি, বরগুনা থেকে সংগৃহীত)

বরিশাল এলাকার উত্তরাঞ্চলে শোনা যায়-
ছি কুতকুত সাইয়্যা
বাবুলের মাইয়্যা
বাবুল কান্দে
পোতে পাচার খাইয়া।
(উজিরপুরের হস্তিশুন্ড থেকে সংগ্রহ)

ছি কুত কুত লাইলি
তবলা বাজাইলি।
তবলার সুরে
প্রজাপতি ওড়ে।

এই ছি-তে ছন্দ, মাত্রা, ভাষার প্রাঞ্জলতা যেমন সুষম তেমনি কিশোরী লাইলির কর্মকাণ্ডের সাথে বিমুগ্ধতার অন্তহীন সখ্যতাও দৃশ্যত। এখানে “কুত কুত” শব্দটিও বিশেষ এক প্রকার খেলার নামকরণ বোঝানো হয়েছে। মাত্রাবৃত্ত ছন্দে রচিত এই ছড়াটিকে দুই অংশে বিভক্ত করা যায়। প্রথম লাইনটিকে ধারণা করা হয়ে থাকে লাইলীর “কুত কুত” খেলাটি যেন তবলা বাজানোর মত; সুন্দর সৃ-শৃঙ্খল। আর দ্বিতীয়াংশে আশ্রয় নেয়া হয়েছে প্রতীকের। লাইলী বা কিশোরীরা যখন খেলাটি সীমাবদ্ধ দূরত্বে লাফিয়ে লাফিয়ে খেলে বা এক ঘর থেকে অন্য ঘর অধিকার করে তখন মনে হয় প্রজাপতি, ফুল থেকে ফুলে উড়ছে। পুরো এই বিষয়টিকে দারুন বর্ণনায় নিয়ে আসা হল বৌ-ছির ছিতে।


আবার ছেলে মেয়েরা একত্রে বসে গল্প করে। গল্প করার মধ্যেও চলে তাদের অজান্তেই ছড়া

ওপার গ্যালাম খেলাইতে
পথে পাইছে ডাহাইতে।
ডাহাইতের নাম কালাচাঁন
ঘরে আইন্যা মোড়াবান।

সমবয়সী দু’জন ব্যক্তি বা বন্ধুর মধ্যকার কথোপকথন এটি। যেখানে ঘটনার বর্ণনা রয়েছে। আছে কথকের ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার সরল বর্ণনা। প্রথম কথক তার বন্ধুটিকে জানাচ্ছে খেলতে যাবার পথে যে বিপদে তাকে পরতে হয়েছে। আর মাত্র একটি লাইন অর্থাৎ চতুর্থ লাইনে (উত্তম পুরুষের শ্লোতা) জানিয়েছেন কি করতে হবে। একটু পরিস্কার করা জরুরী যে “মোড়া” শব্দটি আঞ্চলিক শব্দে ব্যবহৃত হয় মুড়ে রাখার অর্থে। যদিও এখন সেসব প্রচলন দেখা যায় না, তবে আগেকার দিনে উৎপাদিত ধান বা ফসল মজুদ করা হত, বাঁশের তৈরী এক ধরণের বিশেষ “চাটাই” দিয়ে গোল আকৃতি করে তার মধ্যে। বিভিন্ন অঞ্চলে এর নাম বিভিন্ন হলেও দক্ষিণাঞ্চলে “মোড়া” বা “গোলা” বলা হয়। ছি-ছড়ায় সেই মোড়ায় যেমন ধান বা ফসল আটকে রাখা হয় তেমনি ডাকাত কালাচানকে ধরে এনে বেধে রাখার কথা বলা হয়েছে।

আবার খেলার ছড়ার মধ্যে এলাকার নাম ও ঐতিহ্য চলে আসে
‘কুত কুত মালা কুত কুত সই
দই’য়ালাগো বাড়ি কই?
বাড়ি রৈছে চান্দের পার
কুত কুত খেলায় জীবন পার।’

চান্দের পার বলতে চন্দ্রদ্বীপ বা বরিশালকে পরোক্ষ ইঙ্গিত করা হয়েছে। মাত্রাবৃত্ত ছন্দে রচিত ছি-তে জীবনকে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে নিজস্ব ঢঙে, যা দর্শনের নামান্তর। আমরা জানি যে একটি জনপ্রিয় খেলা “কুত কুত”। সাধারণত ৯ থেকে ১৩/১৪ বছর বয়সী শিশুরা এই খেলা খেলতে পছন্দ করে বেশি। এই খেলা চলে ঘরের মেঝে, স্কুলের বারান্দায়, পুকুরের পাড়ে, বাগানে। খেলোয়াড় কখনো দুইজন, কখনো অনেক। মাটিতে ঘর এঁকে মাটির হাড়ি বা কলসির ভাঙ্গা অংশ (চাড়া) হল খেলার প্রধানতম উপাদান।

আবার দেখা যায় খেলতে খেলতে ছেলেমেয়েরা নিজেদের মধ্যে দুষ্টুমি করে ছড়ায় ছড়ায়-
ওই ছ্যামড়ারে ধর
চুঙ্গার মইদ্যে ভর
চুঙ্গা নেছে কামারে
বাফ বোলাবি আমারে।

বাংলা ভাষার একটি জনপ্রিয় প্রবাদ বা বাকধারা রয়েছে-
সস্তার তিন অবস্থা

এই প্রবাদটি বরিশাল অঞ্চলে মূল অর্থ ঠিক রেখে অন্য ভাবে বলা হচ্ছে।
বরিশাল জেলার উজিরপুরের হস্তিশুন্ড গ্রাম থেকে সংগ্রহ করা প্রবাদটি এরূপ
‘আডে গোনে হস্তা
বাড়তে আইন্যা পস্তা।’

এই প্রবাদটি বরিশাল অঞ্চলের পিরোজপুরের ইন্দুরকানি থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে বা পাওয়া গেছে-
‘আডের হস্তা
বাড়িতে পস্তা’।


বরিশালের উজিরপুর উপজেলার হস্তিশুন্ড গ্রামের ‘মিরাবাড়ি’র একজনের নাম ছিল আ. হামেদ মিরা (সৈয়দ)। সবাই ডাকতেন ‘হামদু মিরা’ বলে। এই হামদু মিরা একটু বেশি প্যাঁচাল পাড়তেন। আবার গ্রামে ছোট ছেলেমেয়েদের হাতে খড়িসহ ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাইভেট পড়াতেন। তাকে ছোটো ছেলে মেয়েরা তেমন মান্য করতো না। তাকে নিয়ে ছোটোদের মধ্যে একটি ছড়া প্রচলিত ছিল। এ প্রচলিত বাক্যটি উজিরপুরের হস্তিশুন্ড গ্রাম ছাড়া বাংলাদেশের কোনো এলাকায় পাওয়া যাবে না। এবং বাংলাভাষার সংগৃহীত কোনো বইয়ে পাওয়া যাবে না। ছড়াটি পড়ুন


‘‘হামদু মিরা
পুটকি চিরা
দৌড়াইস না 
তোর আল্লার কিরা।’

আবার একেবারে সহজসরল ভাষায় মাটি ও মনের কথা- কারো সাথে কারো তুলনা করতে এ ধরনের কথা বলা হয়
কোতায় তাল গাছ
কোতায় বাল গাছ।

বাড়ির মধ্যে উঠোনে ধান শুকানো নিয়ে ঝি-বউদের মধ্যে জায়গা নিয়ে ঝগড়া হচ্ছে। এক বউ স্বামীকে উদ্দেশ্য করে বলার পর স্বামী তাদের ঝগড়া থামানের জন্য বলছে
‘বালে বাল অয়
আলেয়া তুই ঘরে আয়।’

এক সময় বরিশাল জেলার উজিরপুর উপজেলার গাববাড়ি, গাজিরপাড়সহ বড়াকোঠা ইউনিয়নের অনেক গ্রামের মানুষের প্রধান পেশা ছিল কৃষির সাথে কুটিয়ালি করা। কুটিয়ালি মানে ধান কিনে সেদ্ধ ও শুকেিয় তা থেকৈ ঢেঁহিতে পাড় দিয়ে চাল বের করে বাজারে বা হাটে বিক্রি করা। এ পেশার কারণে প্রায় পরিবারে ছিল কাঠের ঢেঁকি। সেজন্য এ এলাকায় একটি ছড়া প্রচলিত আছে। যে প্রচলিত কথা বাংলাদেশের অন্য কোনো উপজেলা বা গ্রামে পাবেন না।

‘গাববাড়ি গাজিরপাড়
ঢেঁহি আছে বাইশাজার।’

বরিশাল অঞ্চলে এমন অনেক শব্দ ব্যবহার করা যা সরচরাচর অন্য এলাকায় দেখা যায় না যেমন

অ্যাকছের, অ্যাহাচালা, উববুরাইয়া, উরাস, উরুম, এ্যাম্মে, ওম্মে, ওসসাহাল, উগোইর, উটকাল, কোম্বা, কেডি কুত্তা, কোরচা. কচুডি, কাইল, কুজরামি, খোঁচদাড়া, গোরদাগুরদি, গরোই, গুড়াগাড়া, গইয়া/গয়া, গুরমুইর‌্যা, চাডাম, চুতমারানি, জোলারসুগী, জরমো, থাউব্যামূলে, নছোল্লা, ন্যাবাই, নানডিবাসটি, নাহোইল, দুদু, দুহাইর‌্যাহালে/দুফাইর‌্যাহালে, দুদু, নুমাল, পাহা, পাইনমারা, পুরা, লেরি ফয়জোর, বানদোর, বইস্যা, বাইস্যা, বউড্যা, বাসাত, বুইন, বালিশের ওসার, ভাদাবুইন্না, মাতারি, মানু, মোনু, মুরহা, ম্যাবাই, মোর, মুই, মোগো, ল্যারের পো, ল্যাদা, হুবাম্মা, হিইর‌্যা, হুবু, হিক্কা, হোমায়, হোগা, হুরুজফাডা, হুতি মারা। 

কেকে/ এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

সাহিত্য- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close