মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬,
২ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬
শিরোনাম: সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর      ভারতের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনারকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব      বাতিল হচ্ছে সরকারি চাকরিজীবীদের ‘বিশেষ সুবিধা’      ভারতের ভিসা অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে নতুন নির্দেশনা      ২০ জুলাইয়ের মধ্যে এসএসসির ফল প্রকাশ: শিক্ষামন্ত্রী      দিল্লিতে রাষ্ট্রীয় সফর বাতিল করে দেশে ফিরলেন তথ্য উপদেষ্টা      দেশে ফিরেছেন ৫৬ হাজারের বেশি হাজি      
খেত খামার
লিচুর গ্রাম মঙ্গলবাড়ীয়ায় উৎসবের আমেজ, ১০ কোটি টাকার বিক্রির সম্ভাবনা
সাব্বির হোসেন, কিশোরগঞ্জ
প্রকাশ: শনিবার, ১৬ মে, ২০২৬, ৯:৪৩ পিএম
ছবি: প্রতিনিধি

ছবি: প্রতিনিধি

কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার ঐতিহ্যবাহী মঙ্গলবাড়ীয়ার লিচু শুধু একটি ফল নয়, এটি এখন পুরো অঞ্চলের অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছে। টসটসে রসালো শাঁস, ছোট বিচি, মধুর মতো মিষ্টি স্বাদ আর মন মাতানো ঘ্রাণের কারণে দেশজুড়ে বিশেষ খ্যাতি পেয়েছে এই লিচু। 

বছরের এই সময়টায় মঙ্গলবাড়ীয়া গ্রাম যেন এক লাল-গোলাপি স্বপ্নরাজ্যে পরিণত হয়। গাছে গাছে ঝুলে থাকা পাকা লিচুর সৌন্দর্য আর মিষ্টি সুবাসে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসেন ক্রেতা, ব্যবসায়ী, দর্শনার্থী ও ভ্রমণপিপাসুরা। এবার অনুকূল আবহাওয়ায় বাম্পার ফলন হওয়ায় খুশি চাষিরা। 

কৃষি বিভাগের আশা, চলতি মৌসুমে প্রায় ৮-১০ কোটি টাকার লিচু বিক্রি হবে এই অঞ্চল থেকে।

কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া পৌর এলাকার পূর্ব-দক্ষিণে ছোট্ট একটি গ্রাম মঙ্গলবাড়ীয়া। আয়তনে ছোট হলেও দেশের অন্যতম পরিচিত লিচু অঞ্চল হিসেবে এর খ্যাতি এখন সর্বত্র। গ্রামের নামেই পরিচিতি পেয়েছে এখানকার বিখ্যাত ‘মঙ্গলবাড়ীয়ার লিচু’। 

মঙ্গলবাড়ীয়া গ্রামে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে সারি সারি লিচুগাছ। পাকা সড়কের দুই পাশে, বাড়ির উঠানে, পুকুরপাড়ে, এমনকি জমির আইলজুড়েও রয়েছে লিচুর গাছ। কোথাও গাছভর্তি গোলাপি আভা, কোথাও গাঢ় লাল রঙের পাকা লিচুর ঝাঁক। লিচুর ভারে নুয়ে পড়েছে অনেক গাছের ডাল। ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বাগানজুড়ে চলে ব্যস্ততা। শ্রমিকরা গাছে উঠে লিচু সংগ্রহ করছেন, ব্যবসায়ীরা বাগানেই দরদাম করছেন, আবার কেউ কেউ গাছ দেখে পছন্দ করে আগাম পুরো গাছের লিচু কিনে নিচ্ছেন।

কেউ ছবি তুলছেন, কেউ চাষি ও বাগান মালিকদের সঙ্গে দরদাম করে পছন্দের ফলটি কিনছেন। সবমিলিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশ। এ অবস্থায় দম ফেলার ফুসরত নেই চাষি, শ্রমিক ও বাগান মালিকদের। অনেকেই শেষ পর্যায়ের স্প্রে আর পানি ছিটানোতে ব্যস্ত। লিচুর ভারে নুয়ে পড়া গাছে অনেককে খুঁটি দিতেও দেখা যায়। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সংগ্রহ ও বিক্রির কাজে ব্যস্ত তারা। 

প্রতিদিন রাজধানী ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, সিলেট ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে শত শত মানুষ ভিড় করছেন মঙ্গলবাড়িয়ায়। কেউ পরিবার নিয়ে ঘুরতে এসেছেন, কেউ কিনছেন পছন্দের লিচু, আবার কেউ ছবি ও ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছেন এ অঞ্চলের সৌন্দর্য। পুরো গ্রামজুড়ে এখন যেন উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। 

স্থানীয়দের ভাষায়, “লিচুর মৌসুম মানেই আমাদের গ্রামের ঈদ।”

স্থানীয়দের দাবি, মঙ্গলবাড়ীয়ার লিচুর ইতিহাস প্রায় ২২৫ বছরের পুরোনো। 

গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তি কবির মিয়া ও তাহের আলীসহ কয়েকজন জানান, তাদের পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে শোনা যায়—১৮০২ সালের দিকে মঙ্গলবাড়ীয়া গ্রামের এক ব্যক্তি চীন দেশে গিয়েছিলেন। ফেরার সময় তিনি সঙ্গে করে দুটি লিচুর চারা নিয়ে আসেন। পরে সেই চারা গ্রামে রোপণ করা হয়। ধীরে ধীরে সেই গাছ থেকেই বিস্তার লাভ করে এ অঞ্চলের বিখ্যাত লিচু। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মঙ্গলবাড়িয়া ছাড়াও আশপাশের কুমারপুর, নারান্দী ও হোসেন্দী গ্রামজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এই লিচুর চাষ। বর্তমানে পুরো অঞ্চলই “মঙ্গলবাড়ীয়ার লিচু” নামে পরিচিতি পেয়েছে।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবাড়িয়া ও আশপাশের গ্রামগুলোতে বর্তমানে প্রায় ১০ হাজারের বেশি লিচুগাছ রয়েছে। এছাড়া প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই রয়েছে ছোট-বড় অসংখ্য লিচুগাছ। সরাসরি ও পরোক্ষভাবে কয়েক হাজার পরিবার এ লিচু চাষ, পরিচর্যা, সংগ্রহ, পরিবহন ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত। শুধু মঙ্গলবাড়িয়া গ্রামেই প্রায় ২০০ পরিবার বাণিজ্যিকভাবে লিচু চাষ করছেন। অনেক পরিবারের সারা বছরের বড় অংশের আয় আসে এই লিচু বিক্রি থেকে।

এ বছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলন হয়েছে আশানুরূপ। গাছে গাছে থোকায় থোকায় ধরেছে লিচু। শেষ মুহূর্তে গাছে পানি ছিটানো, স্প্রে করা, অতিরিক্ত ভারে নুয়ে পড়া ডালে খুঁটি দেওয়া ও পাখির আক্রমণ ঠেকাতে ব্যস্ত সময় পার করছেন বাগান মালিক ও শ্রমিকরা। 

বাগান মালিকদের দাবি, এবার লিচুর আকার ও মান দুটোই অনেক ভালো হয়েছে। বাজারে নেওয়ার আগেই অধিকাংশ লিচু বাগান থেকেই বিক্রি হয়ে যাচ্ছে।

বর্তমানে বাগানে আকার ও মানভেদে প্রতি ১০০ লিচু বিক্রি হচ্ছে ৫০০-৬০০ টাকায়। বিশেষ কিছু গাছের বড় আকারের লিচুর দাম আরও বেশি। 

ক্রেতারা বলছেন, দাম তুলনামূলক বেশি হলেও স্বাদ ও মানের কারণে মঙ্গলবাড়িয়ার লিচুর চাহিদা কমছে না।

ঢাকায় বসবাসকারী গ্রামের মেয়ে সাদিয়া বলেন, “এটা আমার নিজের গ্রাম। আমি বর্তমানে ঢাকায় থাকি, কিন্তু লিচুর মৌসুমে এখানে না এলে ভালো লাগে না। এখানে আমাদের ছোট একটি লিচুর বাগান আছে। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু ও সহকর্মীদের জন্য লিচু নিচ্ছি। বাংলাদেশের অনেক জায়গাতেই ভালো লিচু পাওয়া যায়, কিন্তু মঙ্গলবাড়ীয়ার লিচুর স্বাদ একেবারেই আলাদা। এই লিচু খাওয়ার পর অনেকক্ষণ জিভে একটা বিশেষ স্বাদ থেকে যায়।”

কিশোরগঞ্জ জেলা শহর থেকে আসা আশিকুর রহমান বলেন, “আমাদের কাছে এই মৌসুমটা ঈদের মতো আনন্দের। বছরের অন্য সময় আত্মীয়-স্বজন না এলেও লিচুর সময় সবাই বাড়িতে আসে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় থাকা বন্ধু, আত্মীয় ও সহকর্মীরা প্রতি বছর লিচু পাঠানোর জন্য অনুরোধ করেন। এটা আমাদের জন্য বাড়তি চাপ হলেও আমরা আনন্দের সঙ্গেই সবার কাছে এই লিচু পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করি।”

গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তি সাবেক শিক্ষক রুহুল আমিন বলেন, “মঙ্গলবাড়ীয়ার লিচুর ইতিহাস অনেক পুরোনো। শুনেছি, বহু বছর আগে বসিন নামে একজন ব্যক্তি চীন থেকে এই লিচুর চারা এনে এখানে রোপণ করেছিলেন। বর্তমানে পুরো এলাকায় আনুমানিক ১০০০০-১৫০০০ লিচু গাছ রয়েছে। আমার নিজেরই ১৪২টি গাছ আছে। এ বছর এখন পর্যন্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার টাকার লিচু বিক্রি করেছি, এখনও কয়েকটি গাছের লিচু বাকি আছে। লিচু চাষের পাশাপাশি এখানে মৌমাছি পালনও বাড়ছে। মৌচাষিরা প্রচুর মধু সংগ্রহ করছেন। অন্য অনেক ফসলের তুলনায় লিচু চাষে বেশি লাভ হওয়ায় মানুষ দিন দিন আরও বেশি আগ্রহী হচ্ছে।”

সরকারি মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী ফারিয়া আক্তার বলেন, “অনেক দিন ধরেই মঙ্গলবাড়ীয়ার বিখ্যাত লিচুর কথা শুনে আসছি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এবং পরিচিতজনদের কাছ থেকেও এই লিচুর অনেক প্রশংসা শুনেছি। তাই অনেক দিনের ইচ্ছে ছিল একদিন নিজে এসে এখানকার লিচু কিনব এবং পুরো পরিবেশটা কাছ থেকে দেখব। আজ স্বামীর সঙ্গে এসে সেই ইচ্ছে পূরণ হলো। এখানে এসে সত্যিই আমি মুগ্ধ। চারদিকে গাছে গাছে ঝুলে থাকা টসটসে লাল লিচু দেখতে খুবই সুন্দর লাগছে। পুরো গ্রামজুড়ে এক ধরনের উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। বাতাসে লিচুর মিষ্টি ঘ্রাণ, মানুষের ভিড় আর বাগানের সৌন্দর্য সব মিলিয়ে মনে হচ্ছে যেন প্রকৃতির এক অপূর্ব আয়োজনের মধ্যে চলে এসেছি। এখানকার লিচুর স্বাদও অসাধারণ। এত মিষ্টি ও রসালো লিচু খুব কম জায়গাতেই পাওয়া যায়। সুযোগ পেলে ভবিষ্যতেও আবার এখানে আসতে চাই।”

তবে লিচু চাষিদের অভিযোগ, উপজেলা কৃষি অফিস থেকে তারা পর্যাপ্ত সহযোগিতা পান না। 

নিয়মিত পরামর্শ, আধুনিক পরিচর্যা পদ্ধতি ও রোগবালাই দমনে কার্যকর সহায়তা পেলে ফলন আরও বাড়ানো সম্ভব হতো বলে দাবি তাদের।

এ বিষয়ে পাকুন্দিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নূর-ই-আলম বলেন, “মঙ্গলবাড়ীয়ার লিচু সারা দেশেই একটি বিখ্যাত ও জনপ্রিয় লিচুর জাত। মূলত এর স্বাদ ও অনন্য ঘ্রাণের কারণেই এ লিচুর পরিচিতি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। শুধু মঙ্গলবাড়িয়া নয়, আশপাশের কুমারপুর, নারান্দী ও হোসেন্দী গ্রামের লিচুও ‘মঙ্গলবাড়ীয়ার লিচু’ নামেই পরিচিত। তবে বেশিরভাগ দর্শনার্থী ও ক্রেতারা শুধুমাত্র মঙ্গলবাড়ীয়া গ্রামেই ভিড় করেন। আমরা চাই মানুষ আশপাশের গ্রামগুলোতেও ঘুরে দেখুক এবং সেখান থেকেও লিচু কিনুক।”

তিনি আরও বলেন, “উপজেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ ইতোমধ্যে লিচুচাষিদের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা করেছে। গত বছরের মতো এবারও চাষিরা ন্যায্যমূল্যে লিচু বিক্রি করতে পারবেন বলে আমরা আশা করছি। পরিমিত বৃষ্টি ও সহনীয় তাপমাত্রার কারণে এ বছর ফলন অত্যন্ত ভালো হয়েছে। চলতি মৌসুমে প্রায় ৮ থেকে ১০ কোটি টাকার লিচু বিক্রির সম্ভাবনা রয়েছে।”

লিচুর দাম নির্ধারণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “মূলত লিচুর মান, আকার ও স্বাদের ওপর দাম নির্ভর করে। কোনো গাছের লিচু বেশি মিষ্টি, কোনো গাছের আকার বড়, আবার কোনো গাছের স্বাদ কিছুটা ভিন্ন হয়। তাই ক্রেতার পছন্দ অনুযায়ীই দাম নির্ধারিত হয়।”

পাকুন্দিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রূপম দাস বলেন, “মঙ্গলবাড়ীয়ার লিচু অত্যন্ত প্রসিদ্ধ ও সুস্বাদু। আমি নিজেও এই লিচু খেয়েছি। এর একটি শক্তিশালী ব্র্যান্ডিং তৈরি হয়েছে। আমরা বিভিন্ন ফোরামে এই লিচুর কথা তুলে ধরছি, যাতে এখানকার চাষিরা ন্যায্যমূল্য পান। সাংবাদিকদেরও অনুরোধ করবো, আপনারা এই লিচুর ভিডিও ও প্রতিবেদন দেশের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে দিন, যাতে পুরো দেশে এর পরিচিতি আরও বাড়ে।”

তিনি আরও বলেন, “উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এবার ৩৬ জন কৃষককে ফুট পাম্প দেওয়া হয়েছে, যাতে তারা সহজে লিচুগাছে স্প্রে করতে পারেন এবং ভালো ফলন পান। এছাড়া ভালো পরাগায়নের জন্য মৌচাষ বাড়াতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে করে গত বছরের তুলনায় এবার ফলন আরও বেড়েছে।”

কেকে/এমএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  লিচুর গ্রাম মঙ্গলবাড়ীয়া   উৎসবের আমেজ   কোটি টাকার বিক্রির সম্ভাবনা   
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খেত খামার- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close