একদিন বাড়ি, পরদিন উঠোন নেই। কয়েক সপ্তাহ পর ভেঙে যায় ঘর। কয়েক মাসের মধ্যে হারিয়ে যায় পুরো গ্রাম। এভাবেই নদীর কাছে প্রতিনিয়ত আত্মসমর্পণ করছে বরিশাল।
গত পাঁচ বছরেই নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে অন্তত ১২০ বর্গকিলোমিটার ভূমি। সংখ্যাটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজারো পরিবারের কান্না, হারিয়ে যাওয়া বসতভিটা, ফসলি জমি এবং প্রজন্মের পর প্রজন্মের স্মৃতি।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, স্যাটেলাইট চিত্র বলছে বরিশাল বিভাগের প্রায় ১০২ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ এখন ভয়াবহ ভাঙনের ঝুঁকিতে। অর্থাৎ নদীর ক্ষুধা এখনো মেটেনি, সামনে অপেক্ষা করছে আরও বড় বিপর্যয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অপরিকল্পিত বেড়িবাঁধ, নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলন, ইটভাটার জন্য তীর কেটে নেওয়া এবং দীর্ঘদিনের অবহেলায় নদীগুলো আরও ভয়ংকর হয়ে উঠেছে। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের এই নির্মম খেলার মূল্য দিচ্ছে সাধারণ মানুষ।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতবিক্ষত মেহেন্দীগঞ্জ ও হিজলা। পদ্মা, মেঘনা, কালাবদর ও তেঁতুলিয়ার মতো প্রমত্ত নদীগুলো বছরের পর বছর ধরে এই অঞ্চলকে কুরে কুরে খাচ্ছে। একের পর এক গ্রাম নদীর বুকে হারিয়ে যাচ্ছে, অথচ নতুন করে জন্ম নিচ্ছে হাজারো গৃহহীন মানুষের গল্প।
যেখানে একসময় আজানের ধ্বনি ভেসে আসত, সেখানে এখন ঢেউয়ের শব্দ। যেখানে শিশুদের কোলাহলে মুখর ছিল গ্রাম, সেখানে আজ শুধু নদীর স্রোত। নদীভাঙন এখানে শুধু মাটি ভাঙে না, ভেঙে দেয় মানুষের স্বপ্ন, নিরাপত্তা আর ভবিষ্যৎ।
বরিশালের মানুষ আজ নদীর সঙ্গে যুদ্ধ করছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই যুদ্ধ তারা আর কতদিন একা লড়বে?
যদি এখনই কার্যকর নদীশাসন, টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ এবং অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে আগামী কয়েক বছরে মানচিত্র থেকে হারিয়ে যেতে পারে আরও অসংখ্য গ্রাম, আর নদীর পেটে চলে যেতে পারে আরও হাজার হাজার মানুষের জীবনভর গড়ে তোলা ঠিকানা।
বরিশাল আজ কেবল একটি অঞ্চলের নাম নয়—এটি নদীর বিরুদ্ধে টিকে থাকার এক হৃদয়বিদারক সংগ্রামের নাম।