টাঙ্গাইলে প্রস্তুত কোরবানিযোগ্য ২ লাখ ৩৩ হাজার পশু
কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে টাঙ্গাইলের খামারিরা গরু পরিচর্যা ও মোটাতাজাকরণে অনেকটাই ব্যস্ত সময় পার করছে। প্রাকৃতিক উপায়ে সবুজ ঘাস, খৈল, ভুসি, কুটা, দানাদার খাদ্য ও দেশীয় স্বাস্থ্য সম্মত খাবারের মাধ্যমে গরুগুলোকে হৃষ্টপুষ্ট করার কাজে সার্বক্ষণিক নিয়োজিত থাকতে হচ্ছে তাদের। বাজারমূল্য ঠিক থাকলে এবারও লাভের আশা করছেন খামারীরা।
জেলা প্রাণী সম্পদ দপ্তরের দেওয়া তথ্যমতে, জেলার ছোট বড় মোট ২৬ হাজার ৭৫৯টি খামার রয়েছে। প্রতিটি খামারেই পর্যাপ্ত পরিমাণ দেশীয় গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া কোরবানির জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। ক্ষতিকর কেমিক্যাল ব্যবহারের মাধ্যমে গরুমোটাতাজা করণের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে মাঠে রয়েছে প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তরের একাধিক টিম।
এ বছর টাঙ্গাইলের ১২ উপজেলায় কোরবানির জন্য দুই লাখ ৩৩ হাজার ৯৯৩টি পশু প্রস্তুত করা হয়েছে। এর মধ্যে গরু এক লাখ ১৭ হাজার ২৭৮টি, মহিষ ৫০০টি, ছাগল এক লাখ সাত হাজার ৩৮টি ও ভেড়ার সংখ্যা ৯ হাজার ১৭৭টি। অপরদিকে জেলায় পশুর চাহিদা রয়েছে এক লাখ ৯৫ হাজার ১৭৮টি। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়েও উদ্বৃত্ত থাকার আশা করা হচ্ছে ৩৯ হাজার ৮৮৩টি পশু।
এদিকে গরুর খামারিরা জানিয়েছেন, অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার গো-খাদ্যের দাম বেড়েছে। তাই গরু মোটাতাজাকরণে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। তবুও ভালো মূল্যে গরু বিক্রি করতে পারলে লোকসান কাটিয়ে উঠতে পারবেন বলে মনে করেন তারা। পাশাপাশি, ভারতীয় গরুর আমদানিকে কেন্দ্র করে রয়েছে তাদের বাড়তি উদ্বেগ। খামারিরা মনে করছেন, ভারতীয় গরুর আমদানি বন্ধ হলে দেশীয় গরুর চাহিদা ও দাম উভয়ই বাড়বে, যা তাদের জন্য লাভজনক হবে। দেশের বাইরে থেকে যেন দেশে গরু না আসে সে বিষয়েও জোর দাবি তাদের।
সরেজমিনে দেখা গেছে, খামারিরা প্রাকৃতিক উপায়ে গরু মোটাতাজাকরণে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন। পশুর খাদ্যতালিকায় রয়েছে কাঁচা ঘাস, ভুট্টা, খৈল, সরিষার খৈল, গমের ভুসি, ধানের কুঁড়া ও খড়। নিয়মিত গোসল, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হচ্ছে। দেশীয় গরুর পাশাপাশি শাহিওয়াল জার্সি, ফিজিয়ান, ব্রাহামা প্রজাতির গরুকে প্রাকৃতিক খাবার দিয়ে গরুগুলোকে হৃষ্টপুষ্ট করতে ব্যস্ত খামারিরা। প্রতিবারের মতো এবারও স্থানীয় বাজার ছাড়াও ঢাকায় গরু বিক্রির আশায় খামারিরা প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
এদিকে খামারের বাইরেও জেলার চরাঞ্চলের প্রতিটি বাড়িতে লালন-পালন করা হচ্ছে দেশীয় ষাড় গরু ও ছাগল। গ্রামের নারীরা স্বাবলম্বী হতে এ সব গরু লালন-পালন করছেন। ভালো দাম পাওয়ার আশা তাদের।
খামারিরা জানান, কোরবানির পশু সুস্থ রাখতে ভ্যাকসিন, ভিটামিন ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিয়মিত দেওয়া হচ্ছে। ফলে এ জেলার পশুর প্রতি ক্রেতাদের আস্থা বাড়ছে। তবে, পশুখাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি খামারিদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভুট্টা, খৈল ও অন্যান্য খাদ্যের দাম বাড়ায় গরু পালনে খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবুও কোরবানির বাজারে ভালো দামের প্রত্যাশায় খামারিরা শেষ মুহূর্তের পরিচর্যায় কোনো কমতি রাখছেন না। জেলার বিভিন্ন এলাকায় ইতোমধ্যে পশু ব্যবসায়ী ও ব্যাপারীরা খামারে গিয়ে গরু দেখে দরদাম শুরু করেছেন। অনেক খামারি খামার থেকেই পশু বিক্রি করছেন।
টাঙ্গাইল সদর উপজেলা সাঁকরাইল গ্রামের নাজমুল এগ্রো ফার্মের স্বত্বাধিকারী নাজমুল ইসলাম জানান, দেশীয় খাবার দিয়েই গরু মোটাতাজা করছি। এখানে মোটাতাজাকরনে কোন ধরনের কৃত্রিম মেডিসিন ব্যবহার করা হয়নি। সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক খাদ্য ও নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় গরুগুলো লালন করা হয়েছে। আমার ফার্মে কোরবানির জন্য ৫১টি ষাঁড় প্রস্তুত করা হয়েছে। আমার ফার্মে প্রতিটি গরু দেড় লাখ থেকে দুই লাখ টাকা দামের মধ্যে। ইন্ডিয়ান গরু দেশে না আসলে আশা করি লাভবান হতে পারবো।
এ খামারে কর্মরত শ্রমিক মো. শাহিনুর ইসলাম বলেন, ১৮ বছর এ ফার্মে কাজ করছি। সন্তানের মতো করে গরুগুলোকে বড় করেছি। কোনো ওষুধ ছাড়াই শুধু ঘাস, ভুট্টা, খৈল আর কুঁড়া খাইয়েছি।
আরেক খামারি আব্দুল বাতেন জানান, কোনো ওষুধ ছাড়াই শুধু ঘাস আর কুঁড়া খাইয়েছি গরুকে। কিন্তু বাজারে গেলে সবকিছুর যে দাম, তাতে এবার কপালে কী আছে জানি না। সরকার যদি সীমান্ত বন্ধ রাখে, তবেই আমাদের মতো গরিব খামারিরা বাঁচবে।
পারিবারিক খামারের মালিক মিন্টু মিয়া বলেন, প্রতি বছর চার-পাঁচটা গরু পালি লাভের আশায়। এবার চারটি ষাঁড় গরু রয়েছে।
খামারী তোফাজ্জল হোসেন জানান, বর্তমানে তার খামারে আটটি গরু রয়েছে, যেগুলোর দাম দুই লাখ থেকে শুরু করে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। বড় দুটি গরুর ওজন ৬০০ কেজিরও বেশি।
জেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা জানান, ডা. মো. হেলাল উদ্দিন জানান, এ বছর জেলার চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত পশু প্রস্তুত রয়েছে। কোরবানির হাটে নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা ও নির্বিঘ্ন বেচাকেনা নিশ্চিত করতে প্রশাসন প্রস্তুত রয়েছে। পশু অসুস্থ হলে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা দেওয়ার ব্যবস্থাও থাকবে। তিনি আরও বলেন, খামারিদের দানাদার খাদ্য, কাঁচা ঘাস ও ভিটামিন ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। কোনো ধরনের নিষিদ্ধ রাসায়নিক ব্যবহার না করতে কঠোর নির্দেশনা রয়েছে। তবে হাটে বিদেশী গরুর অনুপ্রবেশ ঠেকানো গেলে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক খামারিরা তাদের হাড়ভাঙা খাটুনির সুফল ঘরে তুলতে পারবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
টাঙ্গাইল (সদর)-৫ আসনের সংসদ সদস্য মৎস্য ও প্রাণীসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু জানান, সারা দেশে এক কোটি ২৩ লাখের বেশি গবাদিপশু কোরবানির জন্য প্রস্তুত রয়েছে। চাহিদার চেয়ে বেশি পরিমানে পশু আমাদের মজুদ রয়েছে। কাজেই বাইরে থেকে কোরবানির পশু আনার দরকার নেই।
প্রতিমন্ত্রী আরও জানান, পশুর বাজার ব্যবস্থাপনা যাতে সঠিক থাকে সেই অনুযায়ী প্রত্যেক হাটে ডাক্তাররা দায়িত্ব পালন করবে। অন্যদিকে কোরবানির পশু কোনোভাবেই বাইরের থেকে অবৈধ পথে যাতে প্রবেশ করাতে না পারে। সে লক্ষ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বর্ডায় এলাকায় দায়িত্বরত বিডিআর বাহিনীকে সরকারের পক্ষ থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

মহব্বত হোসেন, টাঙ্গাইল