স্কুলছাত্রী হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচন, কথিত প্রেমিকসহ গ্রেপ্তার ৩
পাবনায় পদ্মা নদী থেকে কিশোরীর বস্তাবন্দী মরদেহ উদ্ধারের রহস্য মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই উন্মোচন করেছে পুলিশ। আর্থিক বিরোধের জের ধরে নবম শ্রেণির ছাত্রী রিয়া খাতুনকে (১৫) শ্বাসরোধে হত্যা করে মরদেহ গুম করা হয়েছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ। এ ঘটনায় নিহতের কথিত প্রেমিকসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার এবং মরদেহ গুমে ব্যবহৃত একটি প্রাইভেটকার জব্দ করা হয়েছে।
নিহত রিয়া খাতুন পাবনা শহরের পূর্ব রাঘবপুর গ্রামের মো. আজিজুল প্রামানিকের মেয়ে এবং স্থানীয় মাওলানা কাসিমুদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্রী।
গ্রেপ্তাররা হলেন- পূর্ব রাঘবপুর গ্রামের বাসিন্দা ও রিয়ার কথিত প্রেমিক মো. নাঈম (২০), একই গ্রামের মো. ইয়াসিন শেখ (২১) ও মো. তুহিন প্রামানিক (১৮)। গতকাল বুধবার (৩ জুন) দিনভর তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় জেলার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করে জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নাঈমের সঙ্গে স্কুলছাত্রী রিয়ার দীর্ঘদিন ধরে প্রেমের সম্পর্ক ছিল। গত মঙ্গলবার (২ জুন) বেলা ১১টার দিকে রিয়া প্রেমিক নাঈমের বাড়িতে বেড়াতে যান। সেখানে দুজনের ঘনিষ্ঠতার একপর্যায়ে কিছু আর্থিক লেনদেনের বিষয় নিয়ে তাদের মধ্যে তীব্র বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। জিজ্ঞাসাবাদের আসামিরা জানায়, কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে নাঈম ক্ষিপ্ত হয়ে ধারালো চাকু বের করে রিয়াকে ভয়ভীতি দেখান। এতেও রিয়া শান্ত না হলে নাঈম তাকে গলা টিপে শ্বাসরোধে হত্যা করেন।
হত্যাকাণ্ড ঘটানোর পর ঘটনা ধামাচাপা দিতে নাঈম তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী ইয়াসিন ও তুহিনকে নিজের বাড়িতে ডেকে আনেন। পরে তারা বাজার থেকে প্লাস্টিকের বস্তা ও ব্যাগ সংগ্রহ করে রিয়ার হাত বেঁধে মরদেহটি বস্তাবন্দী করেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, মঙ্গলবার গভীর রাতে একটি সাদা রঙের প্রাইভেটকারে মরদেহটি নিয়ে তারা পাবনা সদর উপজেলার ভাড়ারা ইউনিয়নের বলরামপুর এলাকায় পদ্মা নদীর তীরের উদ্দেশে রওনা দেন।
সেখানে নদীতে মরদেহটি ফেলে আসার পর ফেরার পথে তাদের বহনকারী প্রাইভেটকারটি হঠাৎ বিকল হয়ে পড়ে। গভীর রাতে স্থানীয়রা চার যুবকসহ গাড়িটি সন্দেহজনকভাবে ঘুরতে দেখেন এবং পরে গাড়িটি ধাক্কা দিয়ে বলরামপুর মুজিব বাঁধ পর্যন্ত পৌঁছে দেন। স্থানীয়দের এই সন্দেহের সূত্র ধরেই মূলত পুলিশ দ্রুত ঘটনার জট খুলতে সক্ষম হয়।
পরদিন বুধবার সকালে পদ্মার চরে কৃষকেরা কাজ করতে যাওয়ার সময় নদীর তীরে আটকে থাকা একটি নৌকার পাশে প্লাস্টিকের বস্তা ভাসতে দেখে পুলিশে খবর দেন। পুলিশ হাত-বাঁধা ও গলায় বাজারের ব্যাগ জড়ানো অবস্থায় অজ্ঞাত হিসেবে মরদেহটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠায়। তখন মরদেহের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া না গেলেও গলায় থাকা রুপার চেইন দেখে পরবর্তীতে স্বজনরা রিয়ার মরদেহ শনাক্ত করেন।
ঘটনার পরপরই পাবনার পুলিশ সুপার মো. ছুফি উল্লাহর সার্বিক নির্দেশনায় ডিবি, ডিএসবি এবং থানা পুলিশের সমন্বয়ে একটি চৌকস ছায়া তদন্ত টিম গঠিত হয়। বলরামপুর স্কুলের সিসিটিভি ফুটেজ, তথ্যপ্রযুক্তি এবং স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ডিবি পুলিশ ২৪ ঘণ্টার কম সময়ে মূল হত্যাকারী নাঈম ও তার দুই সহযোগীকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়।
পাবনার পুলিশ সুপার মো. ছুফি উল্লাহ জানান, এটি একটি বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড। আসামিরা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে রিয়াকে শ্বাসরোধে হত্যা ও মরদেহ গুমের কথা স্বীকার করেছে। এই ঘটনার পেছনে অন্য কোনো কারণ বা আরও কেউ জড়িত আছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে পুলিশের তদন্ত প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।

এ বি এম ফজলুর রহমান, পাবনা