গণমাধ্যমকে নিখুঁত করতে সব পক্ষকে ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন : তথ্যমন্ত্রী
তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেছেন, গণমাধ্যম সমাজ ও রাষ্ট্রের আয়না। সে কারণে এটিকে অবশ্যই নিখুঁত হতে হবে। কিন্তু গণমাধ্যমকে নিখুঁত করে গড়ে তোলার দায়িত্বও গণমাধ্যমকেই পালন করতে হবে। এজন্য সব পক্ষকে ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন। বস্তুনিষ্ঠ দৃষ্টিভঙ্গির ওপর দাঁড়াতে না পারলে ভবিষ্যতেও একটি স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যম কমিশন গঠন করা যাবে না।
আজ সোমবার (১৫ জুন) রাজধানীর তথ্য ভবনের ডিএফপি সম্মেলন কক্ষে ‘ন্যাশনাল এডিটরস কাউন্সিল (এনইসি)’ আয়োজিত ‘ফ্যাসিবাদ মোকাবিলায় মিডিয়ার ব্যর্থতা’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তথ্যমন্ত্রী। ১৬ জুন বাকশালী শাসনে সংবাদপত্র বন্ধের কালো দিবস উপলক্ষে এ সেমিনারের আয়োজন করা হয়।
এনইসির যুগ্ম আহ্বায়ক ও আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের সভাপতিত্বে এবং যুগান্তরের সম্পাদক কবি আব্দুল হাই শিকদারের পরিচালনায় সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রতিদিনের বাংলাদেশের সম্পাদক মারুফ কামাল খান।
তথ্যমন্ত্রী বলেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমার কাছে মনে হয়েছে, গণমাধ্যমকে নিখুঁতভাবে করে গড়ে তোলার যত উদ্যোগ, তা সব সময় কিছুটা ছিল আংশিক। যেহেতু এটি কখনোই পূর্ণাঙ্গতা পায়নি এবং সে কারণেই বাংলাদেশের গণমাধ্যম একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে আমরা পারিনি। অবশ্যই বিগত দিনের সব সরকারের এ দায়-দায়িত্ব বহন করা উচিত।
এজন্য সব পক্ষকে একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ করা প্রয়োজন উল্লেখ করে জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, কারণ আমরা যদি শুরুতেই আমাদের লক্ষ্যের ব্যাপারে ঐকমত্য তৈরি করতে না পারি এবং সংশ্লিষ্ট সব অংশীদারকে যদি একই মঞ্চে দাঁড় করতে না পারি, তাহলে এই কঠিন কাজটা অতীতে যে কারণে হয়নি, এবারেও সে কারণে আবার ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে পারে।
গণতন্ত্রকে কাঠামোবদ্ধ না করা পর্যন্ত আমরা গণতন্ত্র চর্চা করতে পারব না উল্লেখ করে তথ্যমন্ত্রী বলেন, এখানে যে সমস্যাটি প্রধানত কারণ হিসেবে কাজ করেছে তা হলো—আমরা ভিন্নমত সম্মিলিতভাবে চর্চা করার জন্য যে সংস্কৃতি এবং তাকে কাঠামোবদ্ধ করার যে কাজ, সেটিকে কখনোই আমরা প্রাতিষ্ঠানিক করতে পারিনি। আমি খুবই আশাবাদী এবারে আপনাদের এই (সেমিনারে দেওয়া) বক্তব্য এবং ইতোমধ্যে অন্য যার যার সঙ্গে আমি কথা বলেছি তাদেরও যে লক্ষ্য এবং কনক্লুশন আমি তার মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য খুঁজে পাইনি।
মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, বৈচিত্র্যের যে একটা সম্মিলিত অবস্থান—আমরা যদি সেটাকে একবার দাঁড় করিয়ে ফেলতে পারি এবং সেখানে যদি আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে একটা কমিশন দাঁড় করিয়ে ফেলতে পারি, তাহলেই সব সমস্যার সমাধানের একটা আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করে তা আমরা করতে পারব।
সভাপতির বক্তব্যে মাহমুদুর রহমান বলেন, আওয়ামী লীগের ইতিহাস হচ্ছে একনায়কতন্ত্র বাকশালের ইতিহাস। আওয়ামী লীগের ইতিহাস হচ্ছে ফ্যাসিবাদের ইতিহাস, সংবাদপত্র দলনের ইতিহাস। স্বাধীনতার পর থেকেই আমরা এটা দেখে এসেছি এবং আজকের যে বিষয়ে সেমিনার, সেই সংবাদত্রের কালো দিবস হয়েছিল ১৯৭৫ সালের ১৬ জুন। তাই, আওয়ামী লীগের সঙ্গে মানুষের অধিকার ছিন্ন করবার ইতিহাসটা স্বাধীনতার পরবর্তীকাল থেকেই চলছে। আজকের মূল প্রবন্ধে আমাদের বক্তব্য মোটামুটি দেওয়া হয়ে গেছে।
শেখ রেহানার কন্যা ও ইংল্যান্ডের সাবেক মন্ত্রী টিউলিপ সম্পর্কে একটি মন্তব্য করায় ২০১৭ সালে নিজের নামে ৩৫টি মামলা হওয়ার প্রসঙ্গ তুলে মাহমুদুর রহমান বলেন, কোনো একটি প্রসঙ্গে আমি বলেছিলাম—সংবাদপত্র বা মিডিয়ার প্রতি অসহিষ্ণুতা শেখ পরিবারের জিনের মধ্যে আছে। কারণ, শেখ সাহেব সরকারপত্র ধ্বংস করেছিলেন, তার কন্যা শেখ হাসিনা সংবাদপত্র নিয়ে কী করেছে, সবাই জানেন এবং টিউলিপও লন্ডনের একটি পত্রিকার সাংবাদিকের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছে। সেই প্রসঙ্গেই আমি বলেছিলাম, শেখ পরিবারে জিনের সমস্যা আছে, তারা মুক্ত গণমাধ্যম সহ্য করতে পারে না। এটা বলার কারণে আগের ১০০টির সঙ্গে আমার বিরুদ্ধে ৩৫টি নতুন মামলা হয়েছিল। এই ধরনের একটা মামলায় হাজিরা দিতে গিয়েই কুষ্টিয়াতে আক্রান্ত হয়েছিলাম।
এই সেমিনার আয়োজনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে আমার দেশ সম্পাদক বলেন, আমরা এই ধরনের রাষ্ট্র ব্যবস্থার পরিবর্তন চাই। আর এই পরিবর্তন চাইতে গেলে আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
মাহমুদুর রহমান বলেন, আমরা মিডিয়াকে কোটারিমুক্ত করে এটাকে জাতীয় চরিত্র দিতে চাই। এজন্য আমাদের সংগঠনের নাম ন্যাশনাল এডিটরস কাউন্সিল দিয়েছি এবং এতে প্রথমবারের মতো ঢাকার বাইরের সম্পাদকরাও আছেন।
মাহমুদুর রহমান আরও বলেন, আমরা মিডিয়ার প্রকৃত স্বাধীনতা চাই, অর্থাৎ আমার মতটা যাতে আমি প্রকাশ করতে পারি। আপনার যদি আমার মত পছন্দ না হয়, তাহলে আপনি লিখে আমার মতের প্রতিবাদ করবেন। তবে আমার কণ্ঠরোধ করবেন না। এটাই আমাদের চাওয়া। এটাই মিডিয়ার প্রকৃত স্বাধীনতা। এই স্বাধীনতা করতে হলে আমাদের অন্তত এই ইস্যুতে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
আমার দেশের এই সম্পাদক বলেন, সব সম্পাদকীয় নীতি এক হবে না। তবে মত প্রকাশের স্বাধীনতাসহ কিছু মৌলিক ইস্যুতে আমরা ঐক্যবদ্ধ হতে পারি। ফ্যাসিবাদী আমলে এই জিনিসটাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। যেমন, সে সময় প্রেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান করা হয়েছিল বিচারপতি নিজামুল হক নাসিমকে। অথচ শপথ ভঙ্গের কারণে তার ইমপিচমেন্ট হওয়া উচিত ছিল। শেখ হাসিনা সরকার মিডিয়াকে কীভাবে দেখতেন, তিনি বা তার সরকার দেখত সেটা আমরা এই নিয়োগ থেকে আমরা বুঝতে পারি।
এ বিষয়ে তথ্যমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে মাহমুদুর রহমান বলেন, সরকারের নিয়োগগুলো গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, নিয়োগগুলো মেসেজ দেয় যে সরকার আসলে কী বলতে চাচ্ছে, কী করতে চাচ্ছে। এই কারণেই নিয়োগের ব্যাপারে তারা যেন সতর্ক থাকে।
মাহমুদুর রহমান আরও বলেন, ফ্যাসিবাদের সহযোগীরা আত্মশুদ্ধি করে আমাদের ঐক্যে আসতে চাইলে আপত্তি নেই। তবে যারা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, বা গণহত্যাকে জায়েজ করেছেন, তাদের এই ঐক্যের মধ্যে নেওয়ার সুযোগ নেই। তাদের ক্রিমিনাল আইনে বিচার হতে হবে। আমরা আশাকরি, শেখ হাসিনা মিডিয়ার যে স্বাধীনতা ধ্বংস করেছিল, ড. ইউনূস সরকারের সময় সেটার অনেকাংশে পুনরুদ্ধার করেছেন, বর্তমান সরকারও সেটা অব্যাহত রাখবে।
সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন—নয়াদিগন্ত সম্পাদক সালাহউদ্দিন মোহাম্মদ বাবর, কালের কণ্ঠ সম্পাদক ও জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি কবি হাসান হাফিজ, ওয়াদা সম্পাদক শফিকুল আলম, ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) সভাপতি ওবায়দুর রহমান শাহীন, বিএফইউজে সাধারণ সম্পাদক কাদের গণি চৌধুরী, নিউ নেশন সম্পাদক মোকাররম হোসেন, মানবকণ্ঠ সম্পাদক শহীদুল ইসলাম, বাংলাদেশের খবর সম্পাদক সৈয়দ মেছবাহউদ্দিন আহমেদ, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সভাপতি আবু সালেহ আকন, পিআইবি চেয়ারম্যান ফারুক ওয়াসিফ, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সালেহ নোমান, খুলনা মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়ন সভাপতি রাশেদুল ইসলাম এবং নিউ টাইমস সম্পাদক সাইফুল ইসলাম। এ ছাড়া বিভিন্ন পত্রিকার সম্পাদক, নির্বাহী সম্পাদকসহ সিনিয়র সাংবাদিকরা সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন।

নিজস্ব প্রতিবেদক