বাজারে হাঁড়িভাঙা আম, উত্তরাঞ্চলে জমে উঠেছে কোটি টাকার বাণিজ্য
উত্তরাঞ্চলের খ্যাতিমান সুস্বাদু ও রসালো হাঁড়িভাঙা আম এবার আগেভাগেই বাজারে এসেছে। ভিন্ন স্বাদ ও গুণগত মানের কারণে ভোক্তাদের কাছে জনপ্রিয় এ আম কিনতে হাট-বাজারে দেখা যাচ্ছে ক্রেতাদের উপচেপড়া ভিড়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসছেন পাইকাররা। ভালো দাম পাওয়ায় হাসি ফুটেছে আমচাষিদের মুখে।
রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে এখন সারি সারি আমগাছে ঝুলছে থোকায় থোকায় হাঁড়িভাঙা আম। একসময় অভাব-অনটনে থাকা অনেক কৃষকের জীবন বদলে দিয়েছে এই আম। হাঁড়িভাঙা আম চাষকে ঘিরে উত্তরাঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতিতে এসেছে নতুন গতি।
রংপুরের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যখ্যাত হাঁড়িভাঙা আমের আনুষ্ঠানিক বাজারজাতকরণ সাধারণত ২০ জুন শুরু হলেও এবার তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে চাষিরা আগেভাগেই আম সংগ্রহ শুরু করেন। সোমবার (১৫ জুন) মিঠাপুকুর উপজেলার পদাগঞ্জ এলাকার একটি বাগান থেকে আম পেড়ে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন রংপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রুহুল আমিন। এরপরই পুরোদমে শুরু হয় আম সংগ্রহ ও বিপণন।
শুধু পদাগঞ্জ হাট নয়, হাঁড়িভাঙা আমের প্রধান উৎপাদন এলাকা খোড়াগাছ, পাইকারহাট, ময়েনপুর, চ্যাংমারী, বালুয়া মাসুমপুর, কুতুবপুর, গোপালপুর, লোহানীপাড়া, রামনাথপুর ও কালুপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় এখন আম বিক্রির ধুম চলছে। হাট-বাজারের চিত্র দেখে যে কারও মনে হতে পারে, পুরো এলাকা যেন হাঁড়িভাঙা আমের রাজ্যে পরিণত হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বাগান মালিক, ফড়িয়া, পরিচর্যাকারী, মৌসুমি বিক্রেতা, অনলাইন উদ্যোক্তা, পরিবহন ও কুরিয়ার ব্যবসায়ীরা সবাই ব্যস্ত আম কেনাবেচা ও সরবরাহ নিয়ে।
পদাগঞ্জ এলাকার আমচাষি মশিউর রহমান জানান, তিনি ১০ একর জমিতে হাঁড়িভাঙা আমের বাগান করেছেন। শিলাবৃষ্টি ও ঝড়ে কিছু ক্ষতি হলেও বাজারে ভালো দাম থাকায় সেই ক্ষতি পুষিয়ে লাভের আশা করছেন।
স্থানীয় পাইকারি ব্যবসায়ী রাঙ্গা মিয়া বলেন, ‘ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বড় বড় ক্রেতারা ইতোমধ্যে যোগাযোগ শুরু করেছেন। আশা করছি, এবার আমের চাহিদা ও দাম দুটোই সন্তোষজনক থাকবে।’
রংপুর নগরীর কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল সড়ক, সিটি বাজার, লালবাগ, মডার্ন মোড়, ধাপ বাজার ও শাপলা চত্বরসহ বিভিন্ন বাজারেও পাওয়া যাচ্ছে হাঁড়িভাঙা আম। এছাড়া পাড়া-মহল্লার অলিগলিতেও ফেরি করে আম বিক্রি করতে দেখা যাচ্ছে। তবে মৌসুমের শুরুতে অন্যান্য বছরের মতো এবারও দাম তুলনামূলক বেশি।
আমচাষি ও উদ্যোক্তা হানিফুর রহমান সজীব বলেন, আবহাওয়ার কারণে অনেকেই এবার আগেভাগে আম সংগ্রহ শুরু করেছেন। আমের আকারভেদে প্রতি মণ ১ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। হাঁড়িভাঙা আম অত্যন্ত সুস্বাদু। প্রতিটি আমের ওজন সাধারণত ১৫০ থেকে ৫০০ গ্রাম হয়ে থাকে। খুচরা বাজারে এর দাম আরও বেশি। তবে এই আম সংগ্রহের চার থেকে পাঁচ দিনের মধ্যেই পেকে যায়। সংরক্ষণ সুবিধা সীমিত হওয়ায় প্রতি বছর কিছু আম নষ্ট হয়।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর রংপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, নীলফামারী ও লালমনিরহাট জেলায় প্রায় ৬ হাজার হেক্টর জমিতে হাঁড়িভাঙা আমের চাষ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ৪৫ হাজার মেট্রিক টন।
প্রতি হেক্টরে গড়ে ১০ থেকে ১২ টন আম উৎপাদন হয়। সবকিছু অনুকূলে থাকলে চলতি মৌসুমে ৩০০ কোটি টাকারও বেশি হাঁড়িভাঙা আম বিক্রি হবে বলে আশা করছেন চাষি ও ব্যবসায়ীরা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘বর্তমানে বাংলাদেশের আম বিশ্বের ৩০টিরও বেশি দেশে রপ্তানি হচ্ছে। ভবিষ্যতে রপ্তানির পরিধি আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।’
রংপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রুহুল আমিন বলেন, ‘হাঁড়িভাঙা আমকে জেলা প্রশাসনের অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। রপ্তানি বৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন, সড়ক সংস্কার, ওয়াশ ব্লক নির্মাণ, ব্যাংকিং সুবিধা সম্প্রসারণ এবং ম্যাঙ্গো ট্রেন চালুসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
রংপুরের বিভাগীয় কমিশনার শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘হাঁড়িভাঙা আমের আবাদ আরও সম্প্রসারণ এবং বিদেশে রপ্তানি বাড়াতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এতে চাষিরা আরও লাভবান হবেন বলে আশা করছি।’
হাঁড়িভাঙা আমকে কেন্দ্র করে উত্তরাঞ্চলের পাঁচ জেলায় এখন মৌসুমি অর্থনীতির এক বড় চক্র গড়ে উঠেছে। বাগান মালিক থেকে শুরু করে শ্রমিক, পরিবহণকর্মী, কুরিয়ার ব্যবসায়ী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা—হাজারো মানুষের জীবিকা নির্ভর করছে এই আমের ওপর। ফলে হাঁড়িভাঙা শুধু একটি ফল নয়, উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তিতেও পরিণত হয়েছে।

ইউনাইটেড নিউজ অব বাংলাদেশ (ইউএনবি)