লকারের ৩২ হাজার টন স্বর্ণ বাজারে আনতে চান মোদি, কী লাভ ভারতের?
বিয়ে, উৎসব কিংবা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ- ভারতীয় পরিবারগুলোতে স্বর্ণের স্থান সবসময়ই অনন্য। প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ নতুন স্বর্ণ কেনার পাশাপাশি ভারতের সাধারণ মানুষ ও মন্দির ট্রাস্টগুলোর কাছে বিপুল অব্যবহৃত স্বর্ণ জমা আছে। এই অলস পড়ে থাকা স্বর্ণ পুনরায় বাজারে ফিরিয়ে আনতে নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। খবর এনডিটিভির।
সম্প্রতি এক বিবৃতিতে মোদি বলেন, বিদেশ থেকে নতুন স্বর্ণ আমদানির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল না হয়ে দেশের ভেতরেই যে স্বর্ণ রয়েছে, তা যেন রিসাইকেল বা পুনর্ব্যবহার করা হয়। সহজ কথায়, নতুন স্বর্ণ কেনার আগে দেশের সম্পদ দেশেই কাজে লাগানোর নীতি এটি।
বিভিন্ন শিল্প খাতের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে ভারতের সাধারণ পরিবার ও বিভিন্ন মন্দির ট্রাস্টগুলোর কাছে সম্মিলিতভাবে প্রায় ৩০ হাজার থেকে ৩২ হাজার টন স্বর্ণ জমা রয়েছে। যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় ৩ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার! কিছু কিছু হিসাব মতে এই পরিমাণ প্রায় ৩৫ হাজার টনও হতে পারে। এই বিপুল পরিমাণ স্বর্ণের সিংহভাগই বর্তমানে মানুষের ঘরের আলমারি, লকার কিংবা ব্যাংকের ভল্টে সম্পূর্ণ অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বিশাল মজুদের মাত্র ১ শতাংশ স্বর্ণও যদি প্রতি বছর রিসাইকেল করে দেশের মূল অর্থনীতিতে ফিরিয়ে আনা যায়, তবে ভারতের স্বর্ণ আমদানি এক ধাক্কায় প্রায় ২৫ থেকে ৩৩ শতাংশ পর্যন্ত কমে আসবে।
মুথুট এক্সিমের সিইও কেয়ুর শাহ জানান, গোল্ড রিসাইকেলিং হলো মূলত মানুষের কাছে থাকা পুরোনো গহনা, ভাঙা অলঙ্কার, কয়েন, বার কিংবা ইলেকট্রনিক্স পণ্য থেকে সোনা সংগ্রহ করে সেটিকে রিফাইনিং বা শোধনের মাধ্যমে ২৪-ক্যারেটের ৯৯ দশমিক ৯ শতাংশ খাঁটি স্বর্ণে রূপান্তর করা এবং পুনরায় তা বাজারে সরবরাহ চেইনে ফিরিয়ে আনা।
খনি থেকে নতুন স্বর্ণ তোলার প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এতে প্রচুর জ্বালানি অপচয়সহ পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি হয়। ফলে স্বর্ণ রিসাইকেল করলে পরিবেশের ওপর যেমন চাপ কমে, তেমনি দেশের বিদ্যমান সম্পদেরও সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত হয়।
এর মূল কারণ হলো ভারতের বিশাল আমদানি ব্যয়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, কেবল ২০২৫-২৬ অর্থবছরই নিজেদের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে ভারতকে প্রায় ৭ হাজার ২৪০ কোটি (৭২ দশমিক ৪ বিলিয়ন) মার্কিন ডলার খরচ করে স্বর্ণ আমদানি করতে হয়েছে।
সোয়স্তিকা ইনভেস্টমার্টের গবেষণা প্রধান সন্তোষ মীনা জানান, স্বর্ণ আমদানির জন্য ভারতকে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করতে হয়, যা দেশের বাণিজ্য ভারসাম্য ও চলতি হিসাবের ঘাটতির ওপর চরম চাপ সৃষ্টি করে। সুসংগঠিত উপায়ে দেশে স্বর্ণ রিসাইকেলিং বাড়ানো গেলে আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা কমবে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমবে। সামগ্রিকভাবে ভারত আত্মনির্ভরশীলতার দিকে এগিয়ে যাবে।
চয়েস ব্রোকিংয়ের কমোডিটি অ্যানালিস্ট কাভেরি মোর বলেন, সরকার মূলত ‘গোল্ড মনেটাইজেশন স্কিম’ এবং প্রধানমন্ত্রী মোদির আহ্বানের মাধ্যমে এই অলস সম্পদকে সচল করতে চায়, যাতে দেশের ভেতরের স্বর্ণ দিয়েই অভ্যন্তরীণ সরবরাহ চেইন তৈরি করা সম্ভব হয়।
ভারতে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে স্বর্ণকে মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে একটি ঢাল এবং আপদকালীন সুরক্ষাকবচ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে অনেক পরিবারেই যুগের পর যুগ ধরে পুরোনো, ভাঙা কিংবা সেকেলে ডিজাইনের গহনা জমা থাকে, যা মানুষ সাধারণত পরিধান করে না।
তবে বর্তমানে এই মানসিকতায় পরিবর্তন আসছে। বাজারে সোনার দাম রেকর্ড ছুঁয়েছে, যার ফলে ঘরে থাকা অলস গহনার আর্থিক মূল্যও এখন অনেক বেশি। জুয়েলার্সদের দেওয়া বিভিন্ন আকর্ষণীয় এক্সচেঞ্জ অফার (যেখানে পুরোনো স্বর্ণ দিলে কোনো প্রকার কর্তন ছাড়াই নতুন ডিজাইনের গহনা বা ক্যাশ টাকা দেওয়া হচ্ছে)।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক