ঢাকা     বুধবার   ১৭ জুন ২০২৬ ||  আষাঢ় ৩ ১৪৩৩ || ১ মহররম ১৪৪৮ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

রাশিয়ায় উচ্চ বেতনের প্রলোভন

চার বাংলাদেশি যুবককে রুশ বাহিনীতে ‘বিক্রি’র অভিযোগ

লালমনিরহাট সংবাদদাতা || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১২:৩২, ২৭ মে ২০২৬   আপডেট: ১২:৩২, ২৭ মে ২০২৬
চার বাংলাদেশি যুবককে রুশ বাহিনীতে ‘বিক্রি’র অভিযোগ

রাশিয়ায় বাংলাদেশি চার যুবক

পোশাক কারখানায় উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার চার যুবককে রাশিয়ায় পাচার করে দেশটির সেনাবাহিনীর কাছে ‘বিক্রি’ করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী যুবকদের পরিবার অভিযোগের আঙুল তুলছেন জামায়াতে ইসলামীর সহযোগী যুব সংগঠনের দুই নেতার দিকে। জনপ্রতি সাড়ে ৯ লাখ টাকা দিয়েও বর্তমানে ওই চার যুবক রাশিয়ায় চরম ঝুঁকিতে আছেন এবং তাদের সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন।

আরো পড়ুন:

ভুক্তভোগী পরিবারগুলো চরম উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে অভিযুক্ত দুই নেতাকে সংগঠন থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। 

মঙ্গলবার (২৬ মে) পাটগ্রাম প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে এই প্রতারণার বিচার এবং সন্তানদের অক্ষত অবস্থায় দেশে ফিরিয়ে আনার আকুতি জানিয়েছে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো।

ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ঢাকার উত্তরার আরএস ইন্টারন্যাশনাল (আরএল-১৪২৮) নামের একটি এজেন্সির মাধ্যমে রাশিয়ায় নিরাপদ ও বৈধ কাজের সুযোগ রয়েছে বলে আশ্বাস দেন পাটগ্রাম উপজেলার ইউনুস আলী এবং মাহিন ইসলাম। তাদের কথামতো ভিসা, টিকিট ও চাকরির ব্যবস্থা করার জন্য পরিবারগুলো ধার-দেনা ও জমি বিক্রি করে জনপ্রতি সাড়ে ৯ লাখ টাকা তুলে দেন তাদের হাতে।

গত ৪ মে পাটগ্রাম সদর ইউনিয়নের টেপুরগাড়ী এলাকার নাজমুল হক সৌরভ (২১), মেহেদী হাসান (২১), সর্দার পাড়ার আল আমিন (২০) এবং আব্দুল্লাহ আল মামুনকে (২২) বাড়ি থেকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর ৭ মে তারা রাশিয়ার উদ্দেশে রওনা হন। গত ৮ মে সকালে তারা মস্কোয় পৌঁছানোর পর পরিবারের সঙ্গে ভিডিও কলে স্বাভাবিকভাবেই কথা বলেন। কিন্তু, বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার পরপরই রুশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা তাদেরকে একটি হোটেলে নিয়ে যান এবং তাদের পাসপোর্ট, ভিসা ও মোবাইল ফোন কেড়ে নেন। তখনই যুবকরা বুঝতে পারেন, গার্মেন্টসের চাকরির পরিবর্তে তাদেরকে রুশ সেনাবাহিনীর কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে।

পরবর্তী সময়ে সেনাবাহিনীর এক ডেলিভারি ম্যানের মোবাইল ফোন ব্যবহার করে যুবকরা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বাড়িতে ফোন করে জানান, তারা চরম ঝুঁকিতে আছেন। বিভিন্ন সময়ে পাঠানো ক্ষুদে বার্তায় তারা বাঁচানোর আকুতি জানান।

ভুক্তভোগীদের পরিবার জানিয়েছে, বিপদের কথা শুনে তারা প্রথমে ইউনুস ও মাহিনের কাছে গেলে তারা বিষয়টি অস্বীকার করেন। গত ১৪ মে পরিবারগুলো ঢাকার আরএস ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সির কার্যালয়ে গেলে কর্মকর্তারা তাদেরকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন। তবে, কয়েকদিন পর পুনরায় সেখানে গেলে এজেন্সির কার্যালয় তালাবদ্ধ পাওয়া যায়।

উপায়ান্তর না দেখে গত ২১ মে ঢাকায় প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সামনে পাটগ্রামের ওই যুবকের পরিবারসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার প্রায় ৩০টি ভুক্তভোগী পরিবার মানববন্ধন করে। এ সময় সন্তানদের দেশে ফিরিয়ে আনার দাবিতে মন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপি দেওয়া হয়।

মঙ্গলবার পাটগ্রাম প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে নাজমুল হক সৌরভের বাবা দেলদার হোসেন বলেন, “ইউনুস সাড়ে ৯ লাখ টাকা নিয়ে আমার ছেলেকে রাশিয়ায় পাঠিয়েছে। এখন শুনছি, সেনাবাহিনীর কাছে বিক্রি করে দিয়েছে। আমরা দিন-রাত দুশ্চিন্তায় মরছি।”

মেহেদী হাসানের বাবা রাবিউল ইসলাম বলেন, “ভালো চাকরির কথা বলে আমার ছেলেকে পাঠানো হলো, এখন সে নিখোঁজ। আমরা আমাদের সন্তানদের ফেরত চাই।” 

সংবাদ সম্মেলনে পরিবারগুলো পাটগ্রাম পৌর জামায়াতে ইসলামীর আমির সোহেল রানার বিরুদ্ধেও মানবপাচারে সম্পৃক্ততার অভিযোগ তোলেন।

দল থেকে অব্যাহতি পাওয়া উপজেলা যুবনেতা ইউনুস আলী টাকা নেওয়ার কথা স্বীকার করে বলেছেন, “পরিবারগুলোর কাছ থেকে টাকা নিয়ে আমি মাহিনকে দিয়েছি, মাহিন এজেন্সিকে দিয়েছে। তারা বৈধ কাগজেই গেছে, তবে সেখানে গিয়ে প্রতারণার শিকার হয়েছে। দুই দেশের দূতাবাসে যোগাযোগ করে তাদেরকে উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।”

অপর অভিযুক্ত মাহিন ইসলাম দায় অস্বীকার করে বলেন, “ইউনুসের সঙ্গেই এজেন্সির পরিচয় ছিল, পুরো কাজ সে-ই করেছে। পরিবারগুলোর সঙ্গে আমার কোনো পরিচয় নেই।”

এ বিষয়ে পাটগ্রাম উপজেলা জামায়াতের আমির হাফেজ শোয়াইব আহমেদ বলেছেন, “এ ঘটনায় সংগঠনের কোনো দায় নেই। এটি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত বিষয়। ঘটনাটি জানার পরপরই গত ২০ মে সংগঠন থেকে অভিযুক্ত ইউনুস ও মাহিনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।”

পাটগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল হক বলেছেন, “ঘটনাটি মৌখিকভাবে শুনেছি। তবে, এখন পর্যন্ত ভুক্তভোগী কোনো পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ করা হয়নি। লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

ঢাকা/সিপন/রফিক

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়