ঈদে বাড়ি ফেরা
বুকের ভেতর গ্রামের বাড়ি, হৃদয়জুড়ে শৈশব
কাজী আশরাফ || রাইজিংবিডি.কম
ঈদের ছুটিতে বাড়ি যেতে গাবতলী টার্মিনালে বাসের অপেক্ষায় একটি পরিবার
কংক্রিটের শহর ছাড়ছে মানুষ; কিছুদিনের জন্য। ঈদে এমন দৃশ্য প্রতি বছর দেখা যায়। শহরে ফেরা তার প্রয়োজন। গ্রামে ফেরার আকুতি তার চিরকালের। কারণ ওই গ্রামেই তার নাড়ি পোঁতা। শহরে চারদিকের ব্যস্ত কোলাহল ছাপিয়ে বুকের ভেতর কেবলই বাজতে থাকে একটা চেনা সুর- বাড়ি ফিরতে হবে। ঈদে সেই সুর আরো জোরালো হয়। বুকের গহীনে লুকিয়ে থাকা সেই ধুলোমাটির গন্ধ, মায়ের আঁচলের ওম আর উঠোনে অপেক্ষায় থাকা প্রিয়জনের চেনা হাসির টান- সবকিছু শুধু নিজের জন্মভূমিতে ফেরার জন্য। ঈদ সেই উপলক্ষ্য এনে দেয়।
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে গাইবান্ধা যাচ্ছেন মোমেনা বেগম। তিনি তার গ্রামের শৈশবে কাটোনো সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তের কথা স্মরণ করে বলেন, ‘‘আমরা যখন গ্রামে বড় হয়েছি তখনকার দিনগুলো অনেক সুন্দর ছিল। আমরা বড় হয়েছি যৌথ পরিবারে। এখন সবাই জীবনের তাগিদে একেক জায়গায় থাকি। ঈদে আবার সবাই একসাথে মিলিত হই।’’
‘‘ঢাকায় থাকলে আমার মনটা সবসময় পড়ে থাকে গ্রামের বাড়ি। কারণ ঢাকায় কারো সঙ্গে মন খুলে কথা বলা যায় না। সবাই সবার মতো ব্যস্ত। একরকম জেলখানা মনে হয়। তাই যখন ঈদের ছুটি আসে তখন আর দেরি করি না। চলে যাই গ্রামের বাড়ি মুক্ত বাতাসে শ্বাস নিতে।’’
মোমেনা বেগমের মেয়ে সানজিদা ইসলাম উর্মি। তিনি বলেন, ‘‘শহরে ফ্ল্যাটে যতই থাকি, গ্রামের বাড়ির মাটি ও বাতাসের ঘ্রাণ সবসময়ই টানে। এই গ্রামেই তো আমার নাড়ি পোঁতা। সেখানের আলো বাতাস আমার পরিচিত। গ্রামে আমার এক ঝাঁক কাজিন অপেক্ষা করছে। সারা বছর আমরা বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকি। কিন্তু ঈদের এই ক’টা দিন আমরা সবাই এক হয়ে যাই।’’
‘‘আমাদের জন্ম ও বেড়ে ওঠা যে মাটিতে, সেখানকার বাতাসের সঙ্গে আমাদের আত্মার সম্পর্ক,’’ যোগ করেন উর্মি।
ঈদে ছুটি পেয়ে গ্রামে যাচ্ছেন বেসরকারি চাকরিজীবী হিমাদ্রি ঘোষ। তিনি বলেন, ‘‘কর্মব্যস্ত নাগরিক জীবনের সব ক্লান্তি এক নিমেষেই পাখির মতো উড়ে যায়, যখনই মনের ভেতর গ্রামের বাড়ির মাটির গন্ধ ভেসে আসে। ধর্ম যার যার হতে পারে, কিন্তু শৈশবের স্মৃতিজড়ানো আপন আঙিনায় ফিরে মা-বাবা আর ভাই-বোনদের বুকে টেনে নেওয়ার আকুলতা তো সবারই এক।’’
‘‘সেই চেনা ধুলিময় পথ ধরে যখন নিজের জন্মভিটায় পৌঁছাব, তখন মনে হবে এক দৌড়ে আমি আবার আমার সেই হারিয়ে যাওয়া শৈশবে ফিরে গেছি,’’ হিমাদ্রি ঘোষ যখন কথাগুলো বলছিলেন পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন স্ত্রী বৈশাখী বিশ্বাস। তিনিও স্বামীর সঙ্গে একমত। কিন্তু এই প্রজন্ম কি গ্রামের চিরায়ত রূপ দেখেছে?
হিমাদ্রি ঘোষের দুই সন্তান। রিদি ঘোষ, দিব্যজ্যোতি ঘোষ। দিব্যজ্যোতি অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র। তিনি বলেন, ‘‘গ্রামের বাড়ির কথা মনে হলেই আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে দীঘির টলটলে জল আর খোলা মাঠ। ঢাকায় তো সাইকেল চালানোর একটু ফাঁকা জায়গাও মেলে না। কিন্তু গ্রামে গেলেই কাজিনদের সঙ্গে দলবেঁধে সাইকেল নিয়ে ছুটে চলি। পুকুরে মনের সুখে সাঁতার কাটা আর বিকেলবেলা মাঠে ফুটবল খেলার যে আনন্দ, তার কাছে সব ভিডিও গেম হার মেনে যায়!’’
ঈদের আনন্দ পরিবারের সঙ্গে ভাগ করে নিতে ঢাকা ছাড়ছেন মানুষ। বাসের চাকা ঘুরছে, ইট-পাথরের ঢাকাকে পেছনে ফেলে দূরপাল্লার বাসগুলো ছুটে চলছে গ্রামের দিকে। ভোগান্তিহীন এক ঈদযাত্রায়, স্বস্তির চাদর গায়ে জড়িয়ে যখন মানুষ দেশে ফেরে, তখন ধর্ম, বয়স বা লিঙ্গের সব দেয়াল ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। থেকে যায় শুধু একটাই সত্য বুকের ভেতর- নিজের বাড়ি আর সেই মাটিতে মিশে থাকা শৈশবের স্মৃতি।
ঢাকা/তারা//