Published : 09 Feb 2026, 09:04 PM
দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকার ফলে বাংলা ভাষার সঙ্গে আমার সম্পর্কটা বদলেছে—কিন্তু সে বদল বিচ্ছেদের নয়, বরং এক অদ্ভুত ঘনিষ্ঠতার। বাংলা এখন আর শুধু যোগাযোগের ভাষা নয়; আমার স্মৃতি, শিকড়, নিজের সঙ্গে নিজের কথা বলার একান্ত পরিসর। প্রতিদিনের জীবনে যখন অন্য ভাষায় কাজ করি, ভাবি, টিকে থাকি—বাংলা তখন আমার অন্তর্গৃহ, যেখানে আমি ক্লান্ত হলে ফিরে আসি।
প্রবাস আমাকে শিখিয়েছে, দূরত্ব ভাষাকে দুর্বল করে না—বরং তাকে আরও প্রয়োজনীয় করে তোলে। হঠাৎ কোনো শব্দ, কোনো বাক্য, কোনো গান —ফিরিয়ে আনে দুপুরের রোদ, মায়ের ডাক, কিংবা রাস্তার মোড়ের চায়ের দোকান। কখনো শব্দ মনে পড়ে না, কখনো বাক্য ভেঙে যায়; বানান ভুল হয়, নতুন বানান জানা থাকে না—তবু এই অসম্পূর্ণতার ভেতরেই আমার প্রথম ভাবনাগুলো বাস করে। আমি নিজেকে চিনতে পারি এই বাংলাতেই। ভাষার মাস এলে আবেগটা তাই আরো আলাদা হয়ে ওঠে।
দীর্ঘ প্রবাস মানুষকে শেখায়—সে শুধু দেশ ছেড়ে আসেনি, ভাষাকেও ধীরে ধীরে পিছনে ফেলে এসেছে। প্রথমে শব্দগুলো পিছলে যায়, তারপর বাক্য, শেষে অনুভূতিও যেন অনুবাদের অপেক্ষায় থাকে। নিজের ভাষায় ভাবতে গিয়ে প্রশ্ন জাগে, এই শব্দগুলো কি সত্যিই আমার, নাকি বহুদিন আগে ফেলে আসা কোনো জীবনের স্মৃতিচিহ্ন?
যেন নিজেই নিজের অনুবাদ।
ঝুম্পা লাহিরির The Namesake–এর চরিত্রগুলোর মতোই প্রবাসী মানুষ একটি নাম নিয়ে বেঁচে থাকে—একটি পরিচয়, যা ঠিকমতো উচ্চারিত হয় না, আবার পুরোপুরি ভেঙেও যায় না। নামের মতোই ভাষাও হয়ে ওঠে একটি অস্থায়ী ঘর। সেখানে বাস করা যায়, কিন্তু মালিকানা দাবি করা যায় না। নতুন প্রজন্ম নতুন ভাষায় বড় হয়, পুরোনো ভাষা তাদের কাছে গল্পের মতো— শোনার, বলার নয়।
এই বিচ্ছিন্নতার ভেতর অনেক সময় কোয়েটজির Disgrace–এর মতো এক ধরনের নৈতিক ক্লান্তিও জন্ম নেয়। ভাষা তখন আর ক্ষমা করতে শেখে না, ব্যাখ্যা দিতেও ব্যর্থ হয়। কিছু অপরাধের ভাষা নেই, কিছু লজ্জার শব্দ নেই—সেই নীরবতা কেবল বহন করেই চলতে হয়।
প্রবাস মানে শুধু চলে যাওয়াই নয়—ফিরে এসেও নিজেকে আর আগের জায়গায় খুঁজে না পাওয়া। উত্তর- দক্ষিণ, কেন্দ্র- প্রান্ত—এই দ্বন্দ্ব ভাষার ভেতরেও বাসা বাঁধে। অতি আপন ভাষাও একদিন অচেনা লাগে। নবোকভের Speak, Memory–র মতো স্মৃতি তখন আশ্রয় হয়ে দাঁড়ায়, কিন্তু সে আশ্রয়ও ভঙ্গুর। স্মৃতি নিজেই এক পুনর্লিখন— স্মৃতিতে যা বেঁচে থাকে, তা অনেক সময় ঘটনার চেয়েও বেশি সত্য। প্রবাসী মানুষ তাই ভাষার মাধ্যমে অতীত উদ্ধার করে না, বরং অতীতকে নতুন করে নির্মাণ করে।
আর এই সবের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয় এক নিরবচ্ছিন্ন অস্থিরতা—এক অসম্পূর্ণ অনুভূতি যা কোনো বাক্যে শেষ হয় না, সবকিছু যেন এক দীর্ঘ নিঃশ্বাসে টেনে নেওয়া নীরবতা, প্রতিদিন নিজেকে একটু একটু করে অনুবাদ করা। আবার সেই নীরবতাও ভাষাকে দেয় এক নতুন অস্তিত্ব।
প্রবাস ভাষাকে ক্ষয় করে না; বরং নতুনভাবে সমৃদ্ধ করে—বিশেষত শব্দচয়ন, রূপক আর বাক্যভঙ্গিতে। অন্য ভাষার ভেতর দিয়ে জীবন যাপন করতে গিয়ে মাতৃভাষায় আসে নতুন ধারণা, নতুন অভিজ্ঞতা, পুরোনো শব্দের নতুন ব্যবহার। বাংলা–ইংরেজি বা অন্য ভাষার মিশ্রণ তাই “ভাঙা বাংলা” নয়—বরং ভাষার স্বাভাবিক বিবর্তন।
নস্টালজিয়া, ঘ্রাণ, স্বাদ, শব্দের গভীর অনুভব ভাষাকে আরও সংবেদনশীল ও কাব্যিক করে তোলে। পৃথিবীর বহু শক্তিশালী সাহিত্যই এসেছে প্রবাসী বা স্থানচ্যুত লেখকদের হাত ধরে। মানুষ যখন তার চেনা অবস্থান থেকে সরে দাঁড়ায় —শরীর, মন, ইতিহাস, বিশ্বাস বা যে কারণেই হোক—ভাষাও আর আগের জায়গায় থাকে না। নজরুলের সেনাবাহিনীতে যোগদান, মূল সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের বাইরে থেকে মুসলমান পরিচয়ের প্রান্তিকতা থেকে লেখা ভদ্র-বাংলার শালীনতা ভেঙেছে; যুক্ত হয়েছে আরবি-ফারসি-উর্দু শব্দ, এনেছে বিদ্রোহী ছন্দ। জীবনানন্দ বর্তমান থেকে সরে গিয়ে স্মৃতিকাতরতায় জন্ম দিয়েছেন নিঃসঙ্গ, ধীর কাব্যভাষা। শামসুর রাহমান বদলে যাওয়া শহর ও ইতিহাসের ভেতর নাগরিক কথ্যতা আর ব্যক্তিগত রাজনীতিকে এক করে এনেছেন আধুনিকতায়; আল মাহমুদ গ্রাম ও রাষ্ট্রের টানাপোড়েনে লোকজ ও আধুনিককে মিলিয়ে তৈরি করেছেন সংকর স্বর। যখন পুরোনো শব্দ অভিজ্ঞতাকে ধরতে পারে না, লেখক ভাষা ভাঙতে বাধ্য হন—আর সেই ভাঙন থেকেই জন্ম নেয় ভাষার নতুনত্ব।
আমি নিজে প্রবাসের অভিজ্ঞতা দাবি করি না— কারণ ভাবনা, ভাষা আর অনুভূতিতে আমার বাস যেন এখনো বাংলাতেই। তবু দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকা মানুষের লেখা ও অভিজ্ঞতা থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট: প্রবাসীরা দেশের ভেতরে থেকে ভাষা ব্যবহার করেন না বলেই হয়ত দেশের বাইরে থেকে ভাষাকে নতুন করে নির্মাণ করেন, এবং বিশ্বের কাছে তুলে ধরেন। এ যেন রবীন্দ্রনাথের শেষের কবিতা-র "ঘড়ায়-তোলা জল" আর "দীঘির জল"-এর সেই পার্থক্য।
যে ভাষা একসময় নিঃশ্বাসের মতো ছিল, তাকে টিকিয়ে রাখতে হয় স্মৃতি, অভ্যাস, অনুভূতি আর ইচ্ছের জোরে। প্রবাসে বাংলা আর শুধু কথা বলার মাধ্যম নয়; পরিচয়ের শেষ চিহ্ন, নিজের সঙ্গে নিজের কথা বলার একমাত্র অবলম্বন। তাই ভাষার মাস শুধু উদ্যাপন নয়— মনে করিয়ে দেয়, বাংলা আর স্বতঃস্ফূর্ত প্রাপ্তি নয়, বরং সচেতনভাবে ধরে রাখার সিদ্ধান্ত।