Published : 16 Jun 2026, 02:45 PM
কবি মুলতঃ শব্দশিল্পী আর ভাবের বাঁধন খুলে দিতে শব্দের কোনো বিকল্প নেই। সেই কারণে শব্দসাঁকোর মধ্য দিয়েই পৌঁছুতে হয় ভাবের চূড়ান্ত প্রকাশে এবং জীবনবোধের উন্মোচনে। আর সেই প্রকাশ বৃষ্টিধোয়া জুঁইফুল সাদা সকালের মতো, ঘাসে ফুটে ওঠা শিশিরের মতো, অন্ধকারে নৈঃশব্দের আলিঙ্গনে জাগ্রত জোনাকির মতো। তার মধ্যেই কবির বাকস্বাতন্ত্র্য, দর্শন বিকিরিত। কবি তাই একই সঙ্গে দ্রষ্টা ও স্রষ্টা। গভীর দর্শন না থাকলে শুধু শব্দ ও উপমায় প্রতিফলিত হয় না কবিতার যথার্থ ভাবপ্রকাশ। সত্তর দশকের অন্যতম বিশিষ্ট কবি মুজিবুল হক কবীর এ ব্যাপারে খুবই সতর্ক। তাঁর কবিতার সংবেদন শিরায় সমানভাবে প্রবাহিত শব্দ, ছন্দ ও উপমা। সেখানে আমরা দেখি বাঁকফেরা এক নদী। প্রেম ও প্রকৃতির যৌথ যাত্রায় অনাস্বাদিত এক ভুবনচিত্র। দেখি নিত্য সংগ্রামী জীবনের আখ্যান। সেই সংগ্রামের প্রতীকী শ্রেণিচরিত্র একজন রমাকান্ত কামার। হাঁপরের ওঠানামার মধ্যে যার জীবন শিখা জ্বলে নেভে। দেখি পুরাণ ও ঐতিহ্যের বন্ধন, সর্বোপরি, আধুনিক কবিতার প্রধান উপকরণ হতাশা ও নৈরাশ্য উদযাপন। অশান্ত, অতৃপ্ত এবং তৃষ্ণার্ত এক আত্মার ঘোর। সেই ঘোরের সঙ্গে পাঠক অনুভূতি এক না-ও হতে পারে। যেহেতু কবিতা বিনোদন নয়, ভাবের বন্ধন। তবে সহজ প্রকাশে অর্থ ও ভাববাহী কবিতার নজিরও আছে। সেখানে উপমার জৌলুস না-ও থাকতে পারে। এ ধরনের কবিতাকে কেউ কেউ আবার কবিতা-ই বলতে নারাজ। তাঁরা মনে করেন এটা নিছক বৃষ্টিময় ভাবোচ্ছ্বাস, রংধনুরাগ। কিন্তু যা অনায়াস তা যে স্বতঃস্ফূর্ত ও প্রাণময় এটাও স্বীকৃত। স্বীকৃত ভাব যখন গভীর ভাষাটা তখন তরল হয়, প্রকাশটা হয় সহজতর। বলাবাহুল্য, এটা বিমূর্ত থেকে মূর্ত হয়ে ওঠা। বিষয়ে ফেরা। বিষয় বৈচিত্র্যেভরা মুজিবুল হক কবীরের কবিতা আসলে আত্মোপলব্ধির বয়ান। বহুরূপী বাস্তবতার চালচিত্র অনুধাবনের খসড়া ইশতেহার। যেখানে সময়ও সন্দেহের বাইরে নয়;
প্রতিপলে অনুপলে কে যেন কড়া নাড়ে দরজায়
খুলে দেখি কেউ নেই, এমনকি হাওয়াও নেই।
তবে কি দাঁড়িয়ে আছে অন্য কেউ, অন্য কিছু
(ক্রান্তিকাল)
প্রয়োজন যখন ভাবের সংযোগ দুর্বোধ্যতার অভিযোগ সেখানে অমূলক। কবিতাকে তাই হৃদয়হগ্রাহী করে তোলার জন্য ভাষার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। মিষ্টি ও সুস্বাদু ভাষা কবিতাকে করে তোলে চরের জ্যোৎস্নার মতো ফুটন্ত ও আকর্ষণীয়। আল মাহমুদের কবিতার মধ্যে আমরা খুঁজে পাই ভাষার সেই দরাজ টান ও অভিনবত্ব।
শামসুর রাহমানও ভাষার সাধারণ্যেই অসাধারণ পাঠকপ্রিয়তা লাভ করেন। তবে এটা স্বীকার করতেই হবে প্রত্যেক কবি নিজস্ব প্যাটার্নেই কবিতা লিখতে অভ্যস্ত এবং সেইভাবেই চিহ্নিত তাঁর কাব্যশৈলী।
কবি মুজিবুল হক কবীর নিজেও একটি প্যাটার্নে ছন্দের আঁটসাঁট বাঁধনে কবিতা লিখে আসছেন এবং কখনই তাঁর প্যাটার্ন থেকে অর্থাৎ তাঁর বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে পারেননি বা বেরিয়ে আসতে চাননি। এর মধ্যেই তাঁর কাব্যশিল্প সুষমা ও শক্তি চিহ্নিত এবং তিনি স্বাতন্ত্র্যে উদ্ভাসিত। কাব্যনির্মাণে তাঁর বোঝাপড়াটা তাঁর জবানিতেই শুনুন;
কবিতায় শব্দ ডানা মেলে
জোনাকি পোকার মতো ঝোপঝাড়ে,
আমারই ভেতরে।
হৃদয়-সুড়ঙ্গপথে কত না সংকেত পাঠাই,
মানুষ ও প্রকৃতির পাঠশালা খুলে
নীরবে দাঁড়াই।
দেখি হলাহল, কোলাহল, চিৎকার
বস্তুর বিকার,
রক্তপাত, উৎপাত, নেতি ও নাস্তির খেলা
এ জগৎ কাদাজলে ঘোলা,
বহু পদচ্ছাপেভরা, স্মৃতি-মীমাংসিত ঘরে কিংবা
সিঁড়িটিতে পড়ে-থাকা রক্তভেজা লাশ-
এসবই আমার চেতনায় জ্বলে ওঠে,
ছুঁয়ে-ছেনে দেখি
জীবনের নোনা ঘাম
বেছে নিই অনন্ত সংগ্রাম।
জীবনের অনন্ত-সংগ্রামে কবির শুধু শব্দ নিয়েই খেলা, তার জ্যোতির্ময় দোলা উপভোগ করা। তাঁর বেশি তিনি চান কি? চাইলে তিনি বলতেন না :
বহুকালের পাথরচাপা একটি শব্দ
হঠাৎ করে জেগে ওঠে,
একটি শব্দ ভিন্নস্বাদের
জীবনভাষ্য, মহাকালের পাতায় ফোটে।
একটি শব্দ চোখের প্রান্তে থমকে দাঁড়ায়।
মীরার দু’চোখ রমাকান্তের চোখেই হারায়।
এই মীরা যদি সেই মীরা যাঁর ভজনে উথলে ওঠে দুঃখের দরিয়া তাহলে তো কথাই নেই। কবির কষ্টে তাঁর একাত্ম হবারই কথা।
একই অনুভূতির প্রকাশ দেখি তাঁর ‘ঘুমের ভিতরে’ কবিতায়ও। তবে পংক্তিতে যুক্ত হয়েছে পুরাণের প্রসঙ্গও।
কালের ভেলায় ভেসে যাই কবিতার হাত ধরে,
আমি সঙ্কুচিত-মুক্ত হাওয়ায় দাঁড়াবার জায়গা নেই-
নিবিড় নিসর্গে আস্তানা গেড়েছে গুপ্তচরে;
কোথায় দাঁড়াবো আমি? হাতে নেই শব্দবাণ,
নেই কোনো মহাভারতের অশ্বযান,
আছে খোলা প্রান্তরে একা দাঁড়িয়ে থাকা হিজলের ফুল
আছে আমার মুঠোতে নাগরিক জীবনের ক্লেশ
আর অস্থিরতা থেকে ফেরা রাইকিশোরীর চুল;
দ্বিমুখি টানে আমার কবিতা
সমান্তরাল রেললাইনের মতো চলে,
প্রতিদিন-প্রতিরাতে ঘুমের ভিতরে
শব্দ যেন কী কথা বলে।
বিপন্ন ও অস্থির জীবনে কবির আশ্রয় যখন শুধু কবিতায় শব্দ তো কথা বলবেই। আর যেহেতু কবির মুঠোয় নাগরিক জীবনের ক্লেশ দিনরাত্রি তখন রেল লাইনের মতোই চলবে যে সমান্তরাল। এটাই তো স্বাভাবিক।
মুজিবুল হক কবীর শুধু প্রেম ও প্রকৃতির কবি নন, অত্যন্ত রাজনীতি সচেতন কবিও। তাঁর কবিতায় যেমন উঠে এসেছে শ্রেণি সংগ্রামের কথা, বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জন্ম ইতিহাস তেমনি স্বাধীনতা উত্তরকালের সামাজিক অবক্ষয়, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তের চিত্রও। তাঁর ‘উৎসের দিকে’ কবিতার মধ্যে আমরা পাই সেই সময়ের উত্তাল এক বাংলা : যাই/ মিছিলে মিছিলে/ যখন আকাশ ছেয়ে ফেলে শূন্যচারী/ শকুন ও চিলে।
যেখানে সত্তরের নির্বাচনের পর বাংলার মানুষের রাজনৈতিক চেতনা মিশে গিয়েছিল ঐক্যের বন্ধনে, একই স্তরের, একই বিন্দুতে।
‘মূক্তিযোদ্ধার গল্প’ কবিতা তাঁরই ধারাবাহিকতা। যেখানে কবি প্রতিটি যুক্তিযোদ্ধার চোখের ভেতর জ্বলে উঠতে দেখেন ‘ধূর্ত ও চতুর বেড়ালের চোখ’। সবুজ পাতার ভিড়ে, জ্যোৎস্নায় ঝিলিক দিয়ে উঠতে দেখেন ‘মারাত্মক অস্ত্র’ আর সেখানে আকাশ ও নক্ষত্র কাঁপে ধাতব গুলির শব্দে।
বলাবাহুল্য কবিতাটির মধ্যে উঠে এসেছে মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গণ চিত্র। একজন কবির স্বাভাবিক তকমা হচ্ছে তিনি প্রেমি ও দ্রোহী। সৃজনে প্রেমের সংযোগ খুব স্বাভাবিক, হোক সে প্রেম কোনো নারীকে ঘিরে কিংবা দেশপ্রেম এটা ব্যক্তি থেকে সমষ্টির দিকে যাত্রা। তার আকর্ষণ হতে পারে তীব্র এবং নগ্ন। যেমন :
পাতা ছাওয়া ঘরে আসে শকুন্তলা
নিচ হাতে খোলে অন্তর্বাস
মহাকবি কালিদাস দ্যাখে- সর্বনাশ
দূরন্ত যৌবন
কী আনন্দঘন, সুধাভান্ড, আত্মসমর্পণ
[কালিদাস ও শকুন্তলা]
সামাজিক অবক্ষয়ের শিকার হওয়ার চেয়ে শকুন্তলার নগ্ন সৌন্দর্যের কাছে কবি কালিদাসের এই আত্মসর্ম্পণ খুব স্বাভাবিক এবং জরুরি। যেহেতু এটা ইন্দ্রিয়ের আকর্ষণ। কিন্তু যখন দেখি কবি সামাজিক অবক্ষয়ের চিত্রটি তুলে ধরেন কিংবা একটা অনিশ্চয়তার কথা বলেন তখন আমরা এটাকে স্বাভাবিক বলে ধরে নিতে পারি না। যদিও অস্বাভাবিকতারও একটা আকর্ষণ আছে :
নাগরিক মনে ধরেছে পচন
মারী ও মড়কে ঐহীবচন
আঁকড়ার দেশে নিয়েছে এখন ঠাঁই;
ঈশ্বর নেই, তবু তুমি কাকে জানালে বিদায়?
[তারাপদ রায়-১]
শুধু সত্তর দশকের অগ্রগণ্য কবিই শুধু নন, মুজিবুল হক কবীরের পরিচয় বহুবিধ। তিনি একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক, গদ্যকার, শিশুসাহিত্যিক এবং ছোটগল্পকারও। তাঁর সৃজন সম্ভার :
কাব্যগ্রন্থ : পা যে আমার অনড় পাথর (১৯৮৭); লোপামুদ্রা ও অন্যান্য কবিতা (১৯৯১); আমি ও আমার প্রতিবিম্ব (২০০০); রাতের শিরায় আগুন (২০০১); মুজিবুল হক কবীরের কবিতা (২০০৩); জলের অদ্ভুত সংগীত (২০১০); অগ্নিগর্ভ দিন (২০১১); নির্বাচিত কবিতা (২০১২); শূন্যে বেঁধেছি ঘর (২০১৫); আধেক হৃদয় দিয়েছি তোমাকে (২০১৯); আমাকে দাঁড়াতে দাও (২০২১)।
প্রবন্ধগ্রন্থ : ছন্দের ঘরবাড়ি (২০০২, ২০১৩); ছন্দের মায়ামৃগ ও অন্যান্য ভাবনা (২০১১); পর্ব থেকে পর্বান্তরে, (২০১৩); অনুভূতির ডালপালা (২০১৫); নির্বাচিত গদ্য (২০১৭); ছন্দশিল্প : রবীন্দ্রনাথ (২০২০); নজরুল: ছন্দের অন্তর্বয়ন (২০২০)।
অনুবাদ : সাধের ভেলায় (শিশুতোষ) (২০১১); সোনালি কাক (শিশুতোষ) (২০১২); এ নীরবতার বিস্তৃতি বহুদূর (২০১৩); জল রঙে আঁকি নক্ষত্রের খোঁপা (২০১৪); বুটপরা পুসি (২০২৩); ইংরেজি অনুবাদ : সিলেক্টেড পোয়েমস অব মুজিবুল হক কবীর (২০১৬); আই পেইন্ট ইন দ্য সাইলেন্ট ক্যানভাস (২০১৭)।
এর মধ্যে বাংলা ছন্দের ওপর তাঁর অসাধারণ গ্রন্থাবলি তাঁকে দিয়েছে আলাদা খ্যাতি ও উচ্চতা। খুবই পরিণত বয়সে, চর্চার প্রায় দেড় দশক পর বেরিয়েছে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘পা যে আমার অনড় পাথর’ (১৯৮৭)। তবে সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় সৃজনে আত্মমগ্নতা নিজের প্রতি অবিচল আস্থায় এখনও তিনি পাথরের মতোই অনড়। ফলে ধার ধারেন নি আত্মবিকার ও স্থুল প্রচারকামিতায়। ১৯৫২ সালের ১১ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ায় জন্ম কবি মুজিবুল হক কবীরের বয়স এখন পঁচাত্তর চলছে।