Published : 17 Jun 2026, 01:04 AM
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানে যুদ্ধ শুরুর সময় মার্কিন ভোটারদের বড় অংশকেই অসন্তুষ্ট করার ঝুঁকি নিয়েছিলেন। কারণ, তিনি অন্য দেশে হস্তক্ষেপ না করার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দিয়েও তা রাখতে পারেননি।
এখন ট্রাম্প যখন এই অজনপ্রিয় যুদ্ধ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন, তখন তিনি তারই শিবিরের আরেক পক্ষকে ক্ষেপিয়ে তুলছেন বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।
এই পক্ষে আছেন ট্রাম্পের নিজের দলেরই পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক কট্টরপন্থি রিপাবলিকানরা। যুদ্ধ বন্ধে ইরানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করা নিয়ে এই মিত্রদের বিরাগভাজন হয়ে রাজনৈতিক সংকটে পড়েছেন তিনি।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন-এর এক বিশ্লেষণে এমন পরিস্থিতির কথা উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সই হওয়া সমঝোতা স্মারকের শর্তগুলো নিয়ে খুব বেশি বিস্তারিত তথ্য এখনও সামনে আসেনি। তবে রিপাবলিকান কট্টরপন্থিরা এরই মধ্যে উদ্বেগ প্রকাশ করতে শুরু করেছেন যে, যুদ্ধ শেষ করার চেষ্টায় ট্রাম্প ইরানকে অনেক বেশি ছাড় দিয়ে ফেলেছেন।
কট্টরপন্থি ওই রিপাবলিকানরা এমন আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন যে, ট্রাম্প হয়ত ২০১৫ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা প্রশাসনের করা পারমাণবিক চুক্তির মতোই কোনও চুক্তি সই করতে চলেছেন, যে চুক্তিটিকে তারা এবং ট্রাম্প নিজেও এক দশকের বেশি সময় ধরে দুর্বল বলে উপহাস করে এসেছেন।
গত এপ্রিলের শুরুতে ট্রাম্প যখন তাড়াহুড়া করে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেন, তখনও কট্টরপন্থি রিপাবলিকানদের মধ্যে একই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। আবার মে মাসের শেষদিকে সম্ভাব্য চুক্তির রূপরেখা তৈরি হওয়ার সময়ও তেমনটিই ঘটেছিল।
এখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার প্রাথমিক শান্তি চুক্তি আগামী শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে সই হওয়ার দ্বারপ্রান্তে থাকার এই সময়ে সমালোচনা আরও তীব্র হচ্ছে।
গত রোববার সাউথ ক্যারোলাইনার রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম এক্সে একটি পোস্টে এই সমালোচনার সূত্রপাত করেন, যা পরোক্ষভাবে আক্রমণাত্মক বলেই প্রতীয়মান হয়েছে।
ইরানের সঙ্গে ট্রাম্পের চুক্তিতে পৌঁছানোর প্রচেষ্টার প্রশংসা করলেও ইসরায়েলপন্থি সিনেটর গ্রাহাম বলেন, তিনি ‘কিছুটা উদ্বিগ্ন’। কারণ, চুক্তির বিষয়ে ইরানের দেওয়া সংস্করণের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের সংস্করণের মিল নেই।
লিন্ডসে গ্রাহাম জোর দিয়ে বলেন, এ ধরনের যে কোনও চুক্তিতে অবশ্যই কংগ্রেসে ভোট হতে হবে। তিনি এমন পদক্ষেপ নেওয়া ‘অপরিহার্য’ উল্লেখ করে বলেছেন, “চুক্তি সইয়ের মূল কারিগর ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স এবং তার সহযোগী আলোচকদের অবশ্যই চূড়ান্ত চুক্তিটি কংগ্রেসে উপস্থাপন করার প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে হবে।”
জে ডি ভ্যান্সের পররাষ্ট্রনীতি লিন্ডসে গ্রাহামের তুলনায় অনেক বেশি যুদ্ধবিরোধী। আর ট্রাম্পের যে মিত্ররা তার কর্মকাণ্ড পছন্দ করছেন না, তারা সাধারণত প্রেসিডেন্টকে ব্যক্তিগতভাবে দোষারোপ না করে তার আশপাশের মানুষকে দোষারোপ করেন।
ফক্স নিউজের উপস্থাপক মার্ক লেভিনও ইরানে যুদ্ধের একজন প্রভাবশালী সমর্থক। রোববার তিনি ট্রাম্পের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া প্রকাশের ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ নিয়েছেন। লেবাননে হিজবুল্লাহকে লক্ষ্যবস্তু করার জন্য ট্রাম্প ইসরায়েলের সমালোচনা করলে মার্ক লেভিন তাতে আপত্তি জানান।
এরপর থেকে তিনি বারবার প্রশ্ন তুলছেন, ট্রাম্প প্রশাসন কেন শান্তি চুক্তির মূল লিখিত রূপটি প্রকাশ করছে না? লেভিন বলেন, “আমি বেশ কয়েক দিন ধরে জিজ্ঞেস করছি, আমরা দেশের মানুষেরা কেন এই অসার এমওইউ দেখতে পাচ্ছি না? সত্যি বলতে, আমি এর আগে কখনও এমন কিছু দেখিনি। যদি এটি শান্তির জন্য দুর্দান্ত ফল বয়ে আনে, তবে তা প্রকাশ করুন।”
রক্ষণশীল ধারার পত্রিকা ‘ন্যাশনাল রিভিউ’-এর সম্পাদকরাও জানতে চেয়েছেন, কেন সমঝোতা স্মারকের বিস্তারিত তথ্য এখনও সামনে আনা হচ্ছে না।
ইরানকে এখনও বেসামরিক কাজে ব্যবহারের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অনুমতি দেওয়া হবে- ট্রাম্পের এমন ইঙ্গিতকে রক্ষণশীল এই সম্পাদকরা ‘হতাশাজনক’ বলে অভিহিত করেছেন। তাছাড়া, চুক্তির আওতায় যে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না, এমন আগাম ইঙ্গিতেরও তারা সমালোচনা করেছেন।
সম্পাদকরা লিখেছেন, “সব মিলিয়ে ট্রাম্প সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রকে ওবামার সেই ব্যর্থ ইরান চুক্তিতেই ফিরিয়ে নিচ্ছেন, যা তিনি নিজেই প্রথম মেয়াদে ছিঁড়ে ফেলেছিলেন। প্রেসিডেন্টের যতসব কড়া কথা ও হুমকির পর সেটি যদি সত্য হয়, তবে তা হবে অপমানজনক।”
শান্তি আলোচনার আরেক সমালোচক ট্রাম্প প্রশাসনের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও সোমবার কিছুটা শান্ত থাকলেও স্পষ্টতই সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। এক্সে তিনি লিখেছেন, “আমি প্রার্থনা করি, যে কোনও সমাধানই যেন আমাদের সব ত্যাগের মহিমা অক্ষুন্ন রাখে এবং মার্কিন জনগণের স্বার্থ রক্ষা করে।”
ট্রাম্পের কিছু ঘনিষ্ঠ কট্টরপন্থি মিত্র প্রশাসনকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, তারা যেন ইরানের কথা বিশ্বাস না করে বা ইরান কোনও লিখিত চুক্তির শর্ত মেনে চলবে, এমন যেন মনে না করে।
যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় রক্ষণশীল রাজনৈতিক ভাষ্যকার এরিক এরিকসন বলেছেন, “ট্রাম্প ইরানের কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন। যারা মার্কিনিদের হত্যা করে, তারা এই চুক্তি পছন্দ করছে।”
একইভাবে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের সাবেক সহযোগী মার্ক থিসেন সোমবার ফক্স নিউজে সতর্ক করে বলেন, “ট্রাম্পের তৈরি চুক্তির রূপরেখা অনেকটাই ওবামার চুক্তির মতো।”
“চুক্তির বিস্তারিত খুঁটিনাটিগুলো কী এবং কী নিয়ে আলোচনা হয়েছে তা দেখতে আমি উদ্গ্রীব, তবে আমি শঙ্কিত,” বলেন থিসেন।
আলোচকেরাই এখনও সমঝোতা স্মারকের ভেতরে থাকা খুঁটিনাটি বিষয়গুলো পুরোপুরি হাতে পাননি। আর তার মধ্যেই চলছে চুক্তি নিয়ে এই নানা আলোচনা-সমালোচনা। আসল সমস্যা সবসময় লুকিয়ে থাকে ভেতরের সূক্ষ্ম শর্তগুলোতে। সেখানে সবসময় খুঁত ধরার মতো কিছু না কিছু থাকেই।
কর্মকর্তারা চুক্তির মূল লিখিত বিষয় প্রকাশ না করা পর্যন্ত এতে ঠিক কী আছে, তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। তবে এ মুহূর্তে ট্রাম্পকে তার চুক্তিকে নিজ দলের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করতে কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হচ্ছে, যে চুক্তি নিয়ে বেশিরভাগই মানুষই খুশি নয়।