Published : 16 Jun 2026, 08:56 PM
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে জ্বালানি রপ্তানি সচল রাখতে গোপনে ‘জাহাজ থেকে জাহাজে’ তেল স্থানান্তরের একাধিক কার্যক্রম তদারকি করেছে।
এই অভিযানে আকাশ, জলপথের ড্রোন এবং হেলিকপ্টার ব্যবহারের মাধ্যমে তেলের বহরগুলোকে হরমুজ প্রণালির বাইরে অপেক্ষমাণ ট্যাংকারগুলোর দিকে নিয়ে গেছে মার্কিন বাহিনী।
হরমুজ প্রণালির কাছে এই অভিযানে একটি ‘শাটলিং’ পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে, যা দীর্ঘদিন ধরে নিষেধাজ্ঞা এড়াতে কাজে লাগিয়ে এসেছে ইরান।
এই তেল স্থানান্তর যেসব জায়গায় হয়েছে সেগুলোর দুটি নির্দিষ্ট স্থান শনাক্ত করেছেন অভিযানের বিষয়ে অবগত ১১ জন। একটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ উপকূলের কাছে, অন্যটি ওমানের সোহার বন্দরের কাছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের পর্যালোচনা করা জাহাজ চলাচলের তথ্য ও স্যাটেলাইটে তোলা ছবি অনুযায়ী, এই কার্যক্রম শুরু হয় মে মাসের শুরুতে এবং অন্তত ৯২টি জাহাজ তেল স্থানান্তরের কাজে ব্যবহার হয়েছে।
গত ১১ জুন পর্যন্ত দুই স্থানে একই সময়ে ১৭ জোড়া জাহাজকে তেল স্থানান্তর করতে দেখা গেছে বলে স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণ করে জানিয়েছে রয়টার্স।
গত ৯ জুন ইরান গুলি করে ভূপাতিত করেছে একটি অ্যাপাচি হেলিকপ্টার, যার জেরে যুক্তরাষ্ট্র পাল্টা বোমা হামলা চালিয়েছিল। ওই হেলিকপ্টার মূলত এই অভিযানেরই অংশ ছিল বলে জানিয়েছেন, হামলার বিষয়ে অবগত এক সাবেক মার্কিন কর্মকর্তাসহ চারজন।
তবে অভিযানে অ্যাপাচির নির্দিষ্ট ভূমিকা কী ছিল, তা রয়টার্স নিশ্চিত হতে পারেনি। রয়টার্সের প্রশ্নের জবাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, অফশোর ‘জাহাজ থেকে জাহাজে’ তেল স্থানান্তর কার্যক্রমে সেন্ট্রাল কমান্ডের কোনও বাহিনী অংশ নিচ্ছে না।
মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, হেলিকপ্টারের দুই ক্রু সদস্যকে একটি ড্রোন নৌযান উদ্ধার করে। এই ‘জাহাজ থেকে জাহাজে’ তেল স্থানান্তরের ব্যাপ্তি, এর কার্যপ্রণালি ও অভিযানে অ্যাপাচির সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে এর আগে কোনও খবর প্রকাশ হয়নি।
হোয়াইট হাউজ এ বিষয়ে প্রশ্ন সেন্টকমের কাছে পাঠিয়েছে। অন্যদিকে, তেল স্থানান্তর নিয়ে মন্তব্যের অনুরোধে ইরান সরকার কোনও জবাব দেয়নি।
মার্কিন নেতৃত্বাধীন ওই অভিযান চলাকালে ফুজাইরাহ বন্দর একাধিকবার ইরানের হামলার মুখে পড়েছে। গত সপ্তাহান্তে ব্রিটিশ সামুদ্রিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ভ্যানগার্ড জানায়, ওমান উপকূলের কাছে একটি ট্যাংকারে অজ্ঞাত উৎস থেকে একটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে।
এক বিবৃতিতে ভ্যানগার্ড জানায়, জাহাজের ক্রুরা নিরাপদ ছিল এবং ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে কিছু তেল বেরিয়ে গেলেও পরিবেশগত ক্ষতি হয়নি। তবে আক্রান্ত ট্যাংকারটি ‘জাহাজ থেকে জাহাজে’ তেল স্থানান্তর অভিযানের অংশ ছিল কিনা, তা উল্লেখ করেনি তারা।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছিল। বিশ্বের মোট উৎপাদিত জ্বালানি তেল ও তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ (২০শতাংশ) এই হরমুজ প্রণালি দিয়েই পরিবাহিত হয়।
হরমুজ অবরুদ্ধ থাকার ফলে বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে এবং বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে।
জাহাজ থেকে জাহাজে স্থানান্তর কার্যক্রম ঝুঁকিপূর্ণ এবং এ কাজে দক্ষতা না থাকলেও এ পদক্ষেপকে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে স্বাভাবিক তেল সরবরাহ আবার শুরু করতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
ট্রাম্প বলেছেন, এ সপ্তাহে ঘোষিত ইরানের সঙ্গে শান্তিচুক্তির আওতায় আগামী শুক্রবার হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া হবে। তবে চুক্তির বিস্তারিত এখনও অস্পষ্ট। চুক্তি এই তেল স্থানান্তরে কোনও প্রভাব ফেলেছে কি না, তা রয়টার্স নির্ধারণ করতে পারেনি।
গত ২০ মে রয়টার্সের প্রকাশিত এক অনুসন্ধানে বলা হয়েছিল, হরমুজ প্রণালির বিপরীত দিকে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণে ইরান নিজস্ব ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। এ ব্যবস্থায় দ্বীপে চেক পয়েন্ট বসানো হয়েছে, কূটনৈতিক সমঝোতা করা এবং কিছু ক্ষেত্রে ফি আদায়ও করা হচ্ছে।
অভিযানের সঙ্গে জড়িত ৮ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তেল স্থানান্তর কার্যক্রম যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সরাসরি নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছে।
ট্যাংকারগুলোকে হরমুজে প্রবেশের আগে একটি নির্ধারিত স্থানে ভিড়তে হয়।
এরপর নির্দিষ্ট বিরতিতে যাত্রা করতে হয়, যাতে প্রতিটি জাহাজের মধ্যে ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার মিটার দূরত্ব থাকে। এক সূত্র ও স্যাটেলাইট ছবি থেকে এই তথ্য পাওয়া গেছে। চার কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এ সময় জাহাজগুলোর ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রাখা হয় এবং আলো কমিয়ে দেওয়া হয়।
একাধিক ওয়েপয়েন্টের মাধ্যমে মার্কিন সামরিক বাহিনী ট্যাংকারগুলোর অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করে। এগুলো প্রণালি পাড়ি দিয়ে ইরান ঘোষিত নিয়ন্ত্রণসীমার বাইরে পৌঁছলে এরপর সেগুলো অপেক্ষমাণ তেল গ্রহণকারী জাহাজের কাছে গিয়ে ভিড়ে।
এই জাহাজগুলো হচ্ছে- মূলত ‘ভেরি লার্জ ক্রুড ক্যারিয়ার’ (ভিএলসিসি)। সেখানেই শুরু হয় তেল স্থানান্তর। পুরো প্রক্রিয়া শেষ হতে ২৪ থেকে ৪০ ঘণ্টা সময় লাগে। খালি হয়ে যাওয়া ট্যাংকারগুলো আবার প্রণালি পেরিয়ে ফিরে যায় এবং নতুন করে বোঝাই হওয়া ভিএলসিসি জাহাজগুলো গন্তব্যে রওনা হয়।
এই ‘জাহাজ-থেকে-জাহাজে’ স্থানান্তর সম্ভব হচ্ছে মূলত সেইসব শিপিং প্রতিষ্ঠানের কারণে, যারা ইরানের অবরোধের ঝুঁকি থাকার পরও হরমুজ প্রণালি পেরিয়ে অপেক্ষমাণ ট্যাংকারগুলোর কাছে তেল পৌঁছে দিতে রাজি আছে। তবে এই অভিযান ঝুঁকিপূর্ণ।
“আপনি জানেন না যে, কখন ইরান ড্রোন বা এমনকি গানবোট ব্যবহার করে জাহাজগুলোর প্রণালি পার হওয়া রুখে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেবে,” বলেছেন, সামুদ্রিক ঝুঁকি বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট- এর সিনিয়র ফেলো নোম রেইডান, যিনি রয়টার্সের অনুসন্ধানও পর্যালোচনা করেছেন।
ইরান বহু বছর ধরে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তরের কৌশল ব্যবহার করে আসছে। কারণ, এ পদ্ধতিতে তেলের উৎস লুকানো যায়।
সাধারণত ইরান একবারে এক জোড়া জাহাজ ব্যবহার করে, যাতে শনাক্ত হওয়ার ঝুঁকি কম থাকে এবং যুদ্ধের আগে তাদের রপ্তানির পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম ছিল।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন অভিযানে বিপুল পরিমাণ তেল স্থানান্তর করা হচ্ছে। তারা উপসাগরীয় উৎপাদকদের ইরানের সম্ভাব্য প্রতিশোধমূলক হামলা থেকে তুলনামূলক বেশি সুরক্ষা দিচ্ছে। ফলে তারা আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে অশোধিত তেল, কনডেনসেট ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য পাঠাতে পারছে।
রয়টার্স ২ মে থেকে ১১ জুনের মধ্যে তোলা এক ডজনের বেশি স্যাটেলাইট ছবি পর্যালোচনা করেছে। এগুলোতে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন উপসাগরীয় ট্যাংকার বহর ও আন্তর্জাতিকভাবে পরিচালিত যেসব জাহাজ তেল নিয়েছে, তাদের মধ্যে জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তর হতে দেখা গেছে।
রয়টার্স আরও এলএসইজি ও কেপলারের শিপিং তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেছে, একই সময়ে ওই এলাকায় ট্যাংকারগুলোর মধ্যে একাধিকবার সাক্ষাৎ হয়েছে।
ছবি বিশ্লেষণের ভিত্তিতে রয়টার্স হিসাব করেছে, মে মাসের শুরু থেকে এই অফশোর নেটওয়ার্কের মাধ্যমে অন্তত ৯ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য স্থানান্তরিত হয়ে থাকতে পারে।
এই হিসাব করা হয়েছে ট্যাংকারগুলোর বহনক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে। তবে এই পরিমাণ এখনও যুদ্ধপূর্ব সময়ে প্রণালিটি দিয়ে পরিবাহিত দৈনিক গড় প্রায় ২ কোটি ব্যারেলের তুলনায় অনেক কম।
গত শুক্রবার থিংকট্যাংক ‘কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস’- এর প্রেসিডেন্ট মাইকেল ফ্রমান বলেন, পুরোনো সব নিয়ম দুর্বল হয়ে পড়ায় এখন অপ্রত্যাশিতভাবে যুক্তরাষ্ট্রও চীন, রাশিয়া, উত্তর কোরিয়া এমনকি ইরানের ব্যবহৃত চোরাচালানের কৌশল অবলম্বন করছে।
চীন, রাশিয়া, উত্তর কোরিয়া ও ইরানের তথাকথিত ‘ডার্ক ফ্লিট’ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের এখনকার নেওয়া পদ্ধতির পথিকৃৎ। আর এই কৌশল দেশগুলো নিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা এড়াতে।
এই কার্যক্রম সম্পর্কে প্রত্যক্ষ জ্ঞান রয়েছে- এমন ছয় কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র অংশগ্রহণকারী জাহাজগুলোকে নৌ সামরিক নিরাপত্তা না দিয়ে বরং আকাশপথে নজরদারি, স্ক্রিনিং মেনে চলা এবং পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে সহায়তা দিয়েছে। তেল স্থানান্তরের কাজে মার্কিন সামরিক সদস্যরা সরাসরি জড়িত ছিলেন এমন কোনও প্রমাণ পায়নি রয়টার্স।
শিপিং রেকর্ড পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এই কাজে তেল গ্রহণকারী জাহাজগুলোর দিক থেকে অংশ নিয়েছে আন্তর্জাতিক ট্যাংকার অপারেটররা। এর মধ্যে গ্রিসভিত্তিক ডাইনাকম ট্যাংকারস ম্যানেজমেন্ট যুদ্ধ শুরুর পর থেকে কীভাবে সৃজনশীল উপায়ে প্রণালির মধ্য দিয়ে তেল পরিবহন করা যায়, তার পথ খোঁজায় তাদের চেষ্টার বিষয়ে ইঙ্গিত দিয়েছে।
গত ১ জুন এথেন্সে আয়োজিত ক্যাপিটাল লিংক শিপিং সম্মেলনে প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা জর্জ প্রোকোপিউ বলেন, নৌ চলাচলের স্বাধীনতা থাকা অত্যাবশ্যক। কেউ এর ওপর টোল বা অন্য কোনও বোঝা চাপিয়ে দিতে পারে না।
তিনি আরও বলেন, “আমরা সেবা দিতে এখানে আছি এবং প্রাচীনকাল থেকেই অবরোধ ভাঙার ঐতিহ্য গ্রিসের আছে। আমি এ বিষয়ে বিস্তারিত বলতে চাই না। তবে ইঙ্গিতগুলোই আমি কি বোঝাতে চাইছি তা বোঝার জন্য যথেষ্ট বলে মনে করি।”