মৌলভীবাজারে ‘বার্ড পার্ক অ্যান্ড ইকো ভিলেজ’ নামে দেশের প্রথম পাখি উদ্যানটি ইতোমধ্যে দর্শনার্থীদের মন জয় করেছে। পবিত্র ঈদুল ফিতরের ছুটিতে গত পাঁচ দিনে রেকর্ডসংখ্যক দর্শনার্থীর আগমন ঘটছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা পর্যটক ও দর্শনার্থীদের মন জয় করেছে পরিবেশ ও প্রকৃতিবান্ধব এই বার্ড পার্কটি। পরিবেশ ও প্রাণ-প্রকৃতির প্রতি মানুষের ভালোবাসা জাগিয়ে তোলার লক্ষ্যে ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে বার্ড পার্ক অ্যান্ড ইকো ভিলেজের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়।
মৌলভীবাজার সদর উপজেলার ১১ নম্বর মোস্তফাপুর ইউনিয়নের আজমেরু গ্রামে এর অবস্থান। নিভৃত ও অবহেলিত হাওরের কাছাকাছি আজমেরু গ্রামটি আজ থেকে মাত্র এক দশক আগেও ছিল অনেকটা জনমানবহীন এক জনপদ। কিন্তু বর্তমানে এই গ্রামটিই প্রাণ-প্রকৃতির রঙিন সৌন্দর্যের আভায় আচ্ছাদিত। প্রতিদিনই শত-শত মানুষের আনাগোনা ছায়াঘেরা গ্রামটিতে। এমনিতেই দেশীয় নানা প্রজাতির পাখি আর মানুষের যুগ-যুগ ধরে সখ্য নিভৃত এ গ্রামের বাসিন্দাদের। হাওরপাড়ের গ্রামটিতে খাল-বিলে, রাস্তার পাশে, ফসলের জমিতে, পুকুরে প্রতিদিন বিকাল বেলা দেশীয় ও পরিযায়ী পাখিদের মেলা বসে। পাখিদের কলরবে বছরজুড়েই মুখর থাকে গ্রামটি। ওই গ্রামেই মৌলভীবাজারের কিছু স্বপ্নবান তরুণ ও প্রবাসী উদ্যোক্তা গড়ে তুলেছেন পরিবেশ ও প্রকৃতিবান্ধব মনোমুগ্ধকর পার্ক ‘বার্ড পার্ক অ্যান্ড ইকো ভিলেজ’।
মৌলভীবাজার শহর থেকে শ্রীমঙ্গল উপজেলামুখী সড়কে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার অথবা শ্রীমঙ্গল থেকে মৌলভীবাজারমুখী সড়কে ১৫ কিলোমিটার গেলেই সদর উপজেলার মোকামবাজার। বাজার সংলগ্ন মসজিদের পাশ দিয়ে পশ্চিম দিকে অফিসবাজারগামী ছোট পিচঢালা আঁকাবাঁকা সড়কে প্রায় দেড় কিলোমিটার গেলেই আজমেরু গ্রামটির অবস্থান। এ গ্রামেই চারদিকে সবুজ ফসলের মাঠ, ধানের জমির মাঝখানে মনোমুগ্ধকর ‘বার্ড পার্ক অ্যান্ড ইকো ভিলেজ’। গ্রাম্য সড়ক লাগোয়া এ পার্কটির সামনের অংশে রয়েছে একটি মসজিদ। এরপরেই পার্কটির অবস্থান। মূল গেট দিয়ে বার্ড পার্কটিতে প্রবেশ করলে প্রথমেই অভ্যর্থনা ও রেস্টুরেন্ট ভবন। এ ভবনের পেছনে পাখি ও প্রাণীদের রাজ্য। এখানে ইচ্ছে করলেই পাখিদের ছুঁয়ে দেখা যায় এবং কাঁধে নিয়ে ঘোরা যায় পার্কের নির্দিষ্ট এলাকায়।
সরেজমিনে দেখা গেছে, পাখিময় এ রাজ্যটি দেখতে প্রতিদিনই এখানে ভিড় করছেন দেশি-বিদেশি পর্যটক, ভ্রমণ ও সৌন্দর্যপিপাসু নারী-পুরুষ-শিশুরা। প্রায় সাড়ে ছয় একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত পার্কের ভেতরে শুধু পাখি আর প্রাণী নয়, এখানে আছে পাশ্চাত্য নকশায় অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন মসজিদ। স্থানে স্থানে রয়েছে বক, ধনেশ বা ঈগল প্রভৃতি প্রাণীর দৃষ্টিনন্দন পাথুরে ভাস্কর্য। এছাড়া রয়েছে রঙিন বাঁশের গোলকধাঁধা, ছোট ওয়াচ ভবন, ছবি কর্নার, কৃত্রিমভাবে নির্মিত সুবিশাল ঝরনা, ঝরনার পাশেই রঙিন মাছের পুকুর, বার্ড লার্নিং জোন, ইল্যুশন মিউজিয়াম, ঈগল পয়েন্ট, টেম পাখির এভিয়ারি, বিশাল লেক, লেকে নৌকা চালানোর সুবিধা, হার্ট সেফ, মাছ ধরার সুবিধা, কাঠের তৈরি ঝুলন্ত সেতু, কিডস জোন, বড়দের খেলার স্থান, ছোট পক্ষিশালা, স্যুভেনির শপ, কনফারেন্স হল, মাঠ, রেস্তোরাঁসহ নানা কিছু।
প্রায় সাত কোটি টাকা বিনিয়োগে গড়ে তোলা এ পার্কে রোপণ করা হয়েছে জারুল, হিজল, সাদা ও দুষ্প্রাপ্য হলুদ শিমুলসহ দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ধরনের ফল ও ফুলের গাছ। বার্ড পার্কটিতে রয়েছে দামী পাখি গোল্ড ম্যাকাও, ব্ল্যাক সোয়ান (কালো রাজহাঁস), সালফার ক্রেস্টেড কাকাতুয়া, গ্রে পেরট (ধূসর টিয়া), পিজেন্টসহ অসংখ্য প্রজাতির পাখি। এছাড়া যেসব পাখি ও বৈধভাবে লালন-পালনের প্রাণী রয়েছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো মেক্সিকোর অ্যামাজন তোতা, আফ্রিকার উটপাখি, লাভবার্ড বা প্রেমপাখি, ব্রাজিলের জেন্ডে কনিউর, দক্ষিণ আমেরিকার গিনিপিগ, পাইনঅ্যাপল কনিউর, লালপেট কনিউর, সান চিক কনিউর, সবুজ-গাল কনিউর, লাল কনিউর, খরগোশ, ফ্রান্সের ফেঞ্চ মন্ডেইন কবুতর, স্যাটিনেট কবুতর, অলঙ্কারিক কবুতর, উত্তর-পূর্ব দক্ষিণ আমেরিকার সান কনিউর বা সোনালি কনিউর, অস্ট্রেলিয়ার ইমু পাখি, ককাটিয়েল, হীরক ঘুঘু বা ডায়মন্ড ঘুঘু, অস্ট্রেলিয়ান রিংনেক ঘুঘু, অস্ট্রেলিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার রেইনবো লরিকেট বা রংধনু তোতা, চীনের রেশমি মুরগি, উজবেকিস্তানের বুখারা ট্রাম্পেটার কবুতর, ভারতীয় উপমহাদেশের হলুদ টিয়া পাখি, বোম্বাই কবুতর, মুখি কবুতর, জ্যাকোবিন কবুতর, ভারত ও আফ্রিকার সাদা টিয়া পাখি, ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নীল টিয়া পাখি, নেদারল্যান্ডের ফুলানো কবুতর, পাউটার কবুতর, যুক্তরাষ্ট্রের শোকিং কবুতর, প্রদর্শনী কবুতর, ইংল্যান্ডের ইংলিশ ফ্যানটেল কবুতর, আমেরিকান ঝুঁটি হাঁস, দেশীয় রাজহাঁস, চীনা হাঁস, টার্কি লালন-পালনের বৈধ পারমিট নিয়ে বাংলাদেশি ময়ূর, চিত্রা হরিণ প্রভৃতি।
বার্ড পার্ক অ্যান্ড ইকো ভিলেজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহেদ আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘‘আমার অত্যন্ত পছন্দের একটি কাজ হলো আমি দেশ-বিদেশে ট্রাভেলিং করা। আমি মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, সৌদি আরবসহ কয়েকটি দেশে বার্ড পার্ক দেখেছিলাম। তখন আমি চিন্তা করলাম, তারা যদি করতে পারে, তাহলে আমরা কেন পারব না? তখন আমি শখের বসে নানা জাতের কবুতর এবং ককাটিয়েল পাখি লালন-পালন করতাম। এর থেকেই আসলে আমার বার্ড পার্ক করার স্বপ্ন শুরু। তারপর আজমেরু গ্রামে এ পার্ক নির্মাণ করি। আমাদের এ বার্ড পার্কে রয়েছে খুবই দামী প্রজাতির কিছু পাখিসহ প্রায় ৭০’-এর অধিক প্রজাতির বিদেশি পাখি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ব্ল্যাক সোয়ান বা কালো রাজহাঁস, গোল্ড ম্যাকাও ইত্যাদি। ম্যাকাও পাখির এক দিনের ছানার দামই দেড় লক্ষ টাকার বেশি। কোনো দেশি পাখি আমরা লালন-পালন করি না। তবে প্রতিদিন বিকালে অসংখ্য দেশীয় ও পরিযায়ী পাখি পার্কের পুকুর ও লেকে দলবেঁধে আসে।’’
জাহেদ আহমেদ চৌধুরী আরও বলেন, ‘‘জেলার পর্যটনকে সমৃদ্ধ করা এবং পরিবেশ ও প্রাণ-প্রকৃতির প্রতি মানুষের ভালোবাসা তৈরি করা হলো আমাদের মূল উদ্দেশ্য। আমরা চাই মানুষ পাখি ও প্রাণীকে ভালোবাসুক, সংরক্ষণ করুক। এই ব্যতিক্রমী বার্ড পার্কে প্রবেশ ফি জনপ্রতি ৩৫০ টাকা। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত দর্শনার্থীরা এখানে টিকিট কেটে প্রবেশ করতে পারেন। শিশুরা কিডস জোনে খেলাধুলা করতে পারে। মূল ভবনের দ্বিতীয় তলায় রেস্তোরাঁয় স্বাস্থ্যসম্মত খাবারের ব্যবস্থা রয়েছে।’’
কেকে/এসএ