গ্রীষ্মের শুরুতেই ফুলের রঙে রঙিন হয়ে উঠেছে মৌলভীবাজার শহর ও পর্যটন নগরী শ্রীমঙ্গল। কৃষ্ণচূড়া, সোনালু, জারুল, রাধাচূড়া, কনকচূড়া, ক্যাসিয়া জাভানিকা, কুচি, বাটারকাপ ট্রি, মরু ক্যাসিয়া, অশোকমঞ্জরি, রাঁধাচূড়া, কাঞ্চন ও কাঠগোলাপ ফুলের অপূর্ব সমারোহে প্রকৃতি যেন নতুন সাজে সেজেছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, মৌলভীবাজার-সিলেট রোড, শহরের কোর্ট রোড, মনু নদীসংলগ্ন শান্তিবাগ ওয়াকওয়ে, কোদালীপুল এলাকা এবং শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ সড়কজুড়ে ফুলে ভরে উঠেছে রাস্তার দুই পাশ। বাতাসে দুলছে সোনালুর ঝুলন্ত হলুদ পুষ্পমালা, কৃষ্ণচূড়ার আগুনরাঙা ফুল আর ক্যাসিয়া জাভানিকার গোলাপি আভা। যানবাহনে চলাচলকারীরা জানালার বাইরে তাকালেই চোখে পড়ছে রঙিন ফুলের সারি, যা তপ্ত গ্রীষ্মেও দিচ্ছে প্রশান্তির অনুভূতি।
চা-বাগানঘেরা এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে আরও জীবন্ত করে তুলেছে মৌসুমি ফুলের সমারোহ। পথচারীরা ফুলে সাজানো পথে হাঁটতে হাঁটতে থেমে মোবাইল ক্যামেরায় বন্দি করছেন প্রকৃতির এই রূপ।
স্থানীয়রা জানান, প্রতি বছর গ্রীষ্মের শুরুতে শ্রীমঙ্গলের সড়কগুলো যেন প্রাকৃতিক ফুলবাগানে পরিণত হয়। কৃষ্ণচূড়া, যাকে গুলমোহর নামেও ডাকা হয়, মূলত মাদাগাস্কার অঞ্চলের গাছ। শীতে পাতা ঝরে গেলেও গ্রীষ্মের শুরুতেই আগুনরঙা ফুলে ভরে ওঠে এর শাখা। সাধারণত এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত এর ফুল ফোটে।
একই গোত্রের কনকচূড়া কাঁচা হলুদ রঙের ফুলে সমুজ্জ্বল হয়ে ওঠে শান্তিবাগ ওয়াকওয়ে এলাকায়। সোনালু ফুলের ঝুলন্ত পুষ্পমালা গ্রীষ্মের অন্যতম আকর্ষণ। হিমালয় অঞ্চলের উৎপত্তি হলেও এখন এটি স্থানীয় পরিবেশের অংশ হয়ে গেছে। পাঁচ পাপড়ির হলুদ ফুল ও লাঠির মতো ফলের কারণে অনেকেই একে ‘বানরলাঠি’ নামে চেনেন। ঔষধি গুণের পাশাপাশি এর সৌন্দর্যই মানুষের কাছে প্রধান আকর্ষণ।
জারুল ফুল এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত ফুটে থাকে। শ্রীলঙ্কা আদি নিবাস হলেও মৌলভীবাজার শহরের ওয়াপদা থেকে কুসুমবাগ সড়ক, ভানুগাছ রোড ও শ্রীমঙ্গল শহরে এর বেগুনি রঙ মন জুড়িয়ে দেয়। ফুলে সুগন্ধ না থাকলেও দৃষ্টিনন্দন রূপে এটি আলাদা আবেদন সৃষ্টি করে।
বিরল কুর্চি ফুল এবার শহরের ওয়াকওয়েতে শুভ্র সৌন্দর্য ছড়িয়েছে। দেখা গেছে, ওয়াকওয়ের ভেতরে ও বাইরে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গাছের সমারোহ। দুষ্প্রাপ্য সাদা কুরচি, বাটারকাপ ট্রি, মরু ক্যাসিয়া, অশোকমঞ্জরি, কাঠগোলাপ, রাঁধাচূড়া ও কাঞ্চন ফুলের বাহারি সৌন্দর্যে মুখর পুরো এলাকা। মনু নদের বাঁ পাড় ঘেঁষে লাগানো হিজল, করস, জারুল ও কদম গাছ নতুন সবুজ পাতায় সজীব হয়ে উঠেছে।
বিশেষ আকর্ষণ হয়ে উঠেছে সুগন্ধী সাদা কুরচি ফুল। ক্ষুদ্রাকৃতির গাছটিতে সবুজ পাতাকে ছাপিয়ে থোকায় থোকায় ফুটেছে দুধসাদা ফুল। বাতাসে ভেসে থাকা মিষ্টি সুগন্ধ দর্শনার্থীদের মোহিত করছে। কুরচি পাহাড়ি অঞ্চলে বেশি জন্মালেও শহুরে পরিবেশে এ ফুল দুষ্পাপ্য। গিরিমল্লিকা নামেও পরিচিত এই গাছের উচ্চতা সাধারণত ১০ থেকে ২০ ফুট পর্যন্ত হয় এবং বর্ষা জুড়েই কয়েক দফা ফুল ফোটে।
প্রকৃতিবিষয়ক লেখক মোকারম হোসেন বলেন, কুরচি বাংলাদেশের বন ও পাহাড়ের দুর্লভ ফুল। নগরের সৌন্দর্যবর্ধনে এই ফুলের পরিকল্পিত রোপণ প্রয়োজন। নিসর্গবিদ দ্বিজেন শর্মার ভাষায়, পলাশ-শিমুলের রং ঝরে যাওয়ার পর প্রকৃতির রঙিন ঘোষণা দেয় কুরচি।
ওয়াকওয়েতে লাগানো অশোক গাছগুলোতেও এখন কমলা রঙের অশোকমঞ্জরির বাহার। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার স্থানীয় এই বৃক্ষ বসন্ত ও হেমন্তে বেশি ফুল দেয়। পাশাপাশি নজর কাড়ছে বাটারকাপ ট্রি ঝুলন্ত হলুদ ফুলের ভারে নুয়ে পড়েছে ডালপালা। মরু ক্যাসিয়াতেও চলছে হলুদের উৎসব।
এছাড়া কাঞ্চন, রক্তকাঞ্চন, অর্কিড কাঞ্চন ও কাঠগোলাপের গাছজুড়ে গোলাপি, বেগুনি ও সাদা ফুলের সমারোহ দেখা গেছে। বৃষ্টির ছোঁয়ায় নদীর পাড়ের ঝাউ, কদম ও হিজল গাছও সতেজ হয়ে উঠেছে।
ওয়াকওয়েতে আগত দর্শনার্থী রাফা, জাকারিয়া এবং জাকওয়ান জানান, শহরের কোলাহল থেকে মুক্তির এক অনন্য জায়গা হয়ে উঠেছে শান্তিবাগ ওয়াকওয়ে। স্থানীয়রা জানান, সকালে স্বাস্থ্যসচেতন মানুষ হাঁটতে ও শরীরচর্চা করতে আসেন, আর বিকেলে শিশু-কিশোর, তরণ-তরুণী ও পরিবার নিয়ে মানুষ সময় কাটাতে ভিড় করেন।
ঢাকা থেকে পরিবার নিয়ে বেড়াতে আসা ব্যাংকার মহিউদ্দিন জামিল বলেন, শ্রীমঙ্গলের খোলামেলা পরিবেশ ও ফুলের সৌন্দর্য মন ভরে দেয়।
কলেজছাত্রী নাহার জামান জানান, প্রতিদিন কলেজে যাওয়ার পথে ফুলের দেশেই হাঁটছেন বলে মনে হয়। রাজশাহী থেকে আগত পর্যটক ইয়াছিন মিয়ার মতে, ভানুগাছ সড়কের ফুলেল সৌন্দর্য তার জীবনের অন্যতম সেরা ভ্রমণ অভিজ্ঞতা।
বাংলাদেশ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রধান শিক্ষক কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি ও সিন্দুরখান কুঞ্জবন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক একরামুল কবীর বলেন, বিকেলের আলো কৃষ্ণচূড়ার ওপর পড়লে মনে হয় যেন আগুন জ্বলছে এই সৌন্দর্য ক্লান্তি দূর করে দেয়। এছাড়া জারুল, সোনালো এবং ক্যাসিয়া জাভানিকার অপরুপ সৌন্দর্য নজর কাড়ছে পথচারী ও দর্শনার্থীদের।
কেকে/ এমএস