নোয়াখালীর চাটখিল উপজেলার ঐতিহ্যবাহী শতবর্ষী কালিয়াতল মেলা এখন তার আগের জৌলুস হারিয়েছে। একসময় এ মেলাকে কেন্দ্র করে জমজমাট হয়ে উঠত পুরো এলাকা, কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে সেই প্রাণচাঞ্চল্য ম্লান হয়ে গেছে।
একটি বটগাছকে কেন্দ্র করে শতবর্ষী এ মেলার আয়োজন করত গ্রামবাসী। বর্তমানে বট গাছটি মেলার চিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এ গাছের নিচে বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন (পহেলা বৈশাখ) হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন কালিপূঁজা করে নতুন বছরে তাদের কার্যক্রম শুরু করেন। এটি নোয়াখালী জেলার চাটখিলের ৯নং খিলপাড়া ইউনিয়নের খিলপাড়া-দেলিয়াই সড়কের পাশে খিলপাড়া বাজার থেকে ১ কিলোমিটার দক্ষিণপূর্বে শংকরপুর গ্রামে অবস্থিত।
বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আগে এ মেলায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ব্যবসায়ী ও দর্শনার্থীরা ভিড় জমাতেন। গ্রামীণ সংস্কৃতির নানা উপকরণ, হস্তশিল্প, খেলনা, মিষ্টি এবং লোকজ বিনোদনের আয়োজন থাকত ব্যাপকভাবে। বিশেষ করে নাগরদোলা, পুতুলনাচ ও যাত্রাপালার মতো আয়োজন ছিল মেলার প্রধান আকর্ষণ।
জানা গেছে, শত বছরের বেশি সময় ধরে এখানে ‘কালিয়াতল মেলা’ নামে প্রতি বছর বাংলা নববর্ষের ১ম দিনে বৈশাখী মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। মেলায় তার ঐতিহ্য ধারণকারী বটগাছ থাকলেও অন্যান্য ঐতিহ্য হারিয়ে গেছে। মেলার নামে যে জায়গা রয়েছে তার মেলার চারপাশের জমির মালিকরা অনেকাংশ দখল করে নিয়েছে। মেলার মাঠে লাগিয়েছে সুপারি গাছসহ বিভিন্ন গাছপালা। এ মেলায় চাটখিলের দক্ষিণাঞ্চল লক্ষ্মীপুরসহ বিভিন্ন এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন পূঁজা দিত। একজন পুরোহিত এ পূঁজা পরিচালনা করত। মেলা বসত বিভিন্ন ধরনের দোকানপাট। বিশেষ করে মাটির তৈরি বিভিন্ন জিনিসপত্র। মেলায় আসা লোকজন বাড়ি যেতে মাটির হাঁড়িতে করে মুড়ি আর জিলাপি নিয়ে যেত। মেলার পাশে কুরিবাড়ি লোকজন এ মেলা পরিচালনা করত। জুয়ার আসর বসত জমজমাট।
আরও জানা গেছে, পহেলা বৈশাখ ভোর বেলায় ঢোলের আওয়াজ শুনে গ্রামের লোকজন ছুটে আসত এবং দূরের লোকজন রিকশায় করে মেলায় আসত। সকাল ৯টা থেকে ১০টার মধ্যেই মেলায় লোকজনে পরিপূর্ণ হয়ে যেত। এখন আর সে ঐতিহ্য নেই। মেলার জমি অনেকাংশে দখল হয়ে গেছে। কুরিবাড়ির লোকজন বিভিন্ন কারণে বাড়ি থেকে বিভিন্ন স্থানে গিয়ে বসবাস করায় এ মেলার এখন তত্ত্বাবধান হয় না, মেলাও জমে না। এটি পরিচালনার জন্য স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ ও সরকারিভাবে কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শতবর্ষী এ মেলায় বিভিন্ন ধরনের খেলার আয়োজন করা হতো। তার মধ্যে অন্যতম ছিল সনাতন পদ্ধতিতে জুয়ার বোর্ড বসানো। যদিও এ খেলার নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে, এরপরও এ জুয়ার বোর্ড ছিল কালিয়াতল মেলার অন্যতম আকর্ষণ। পেশাদার জুয়ারীরা এখানে আসত।
স্থানীয়রা আরও জানায়, স্থানীয় একশ্রেণির যুবক জায়গা দখল করে বিভিন্ন স্থান থেকে আসা দোকানদারদের কাছে বিক্রি করত। আগের দিন সন্ধ্যায় ব্যবসায়ীরা তাদের দোকানের জায়গা বুঝে নিতো। এর পরপরই শুরু হতো দোকান সাজানোর বিশাল কর্মযজ্ঞ।
প্রবীণ ব্যাক্তিরা জানান, পহেলা বৈশাখের দিন মেলা হবে কি না—তা নির্ভর করে স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী খিলপাড়া বাজারের হাটের দিনের ওপর। ঐতিহ্যবাহী খিলপাড়া বাজারে সপ্তাহে মঙ্গল ও শুক্রবার—এ দুদিন হাট বসে। পহেলা বৈশাখ যদি মঙ্গল ও শুক্রবার থেকে যেকোনো একদিন হয়, তাহলে মেলা হবে বৈশাখের দ্বিতীয় দিন। এ দুদিন ব্যতীত অন্য দিন পহেলা বৈশাখ হলে মেলা হবে বৈশাখের প্রথম দিন।
প্রবীন শিক্ষক বয়োজ্যেষ্ঠ বাবু ব্রজলাল দাস জানান, মেলাটি ঠিক কবে থেকে এখানে হয়েছে—তা তিনিও জানেন না। তবে তিনি ধারণা করছেন এটি ব্রিটিশ আমল থেকে চলে আসছে।
বৃদ্ধ শফিক উল্লাহ জানান, তিনি ছোটবেলা থেকে এ মেলাটি দেখে আসছেন। তবে আগে যেভাবে মেলাটি জমত এখন সেভাবে জমে না। মেলায় দোকানপাটও তেমন বসে না। এ নিয়ে স্থানীয় লোকজনের আগ্রহ ও অংশগ্রহণ কমে গেছে। স্থানীয় বখাটেদের উৎপাতের কারণে মহিলাসহ দূরদান্ত থেকে কেউ আসে না।
খিলপাড়া বাজারের ব্যবসায়ী ও বিএনপি নেতা মনির হোসেন জানান, মেলাটি রক্ষাণাবেক্ষণ এবং এটি যাতে পূর্বের ঐতিহ্য নিয়ে ফিরে আসতে পারে—সে ব্যাপারে দলের ঊর্ধ্বতন নেতৃবন্দের সঙ্গে আলোচনা করব। সকল শ্রেণি পেশার লোকজনকে নিয়ে এ মেলার ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগ নেওয়া হবে।
উপজেলা প্রশাসন, স্থানীয় ইউপি কার্যালয়ে সরকারিভাবে এ মেলার রেকর্ড আছে কি না জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মিজানুর রহমান জানান, এ মেলা সম্পর্কে উপজেলা পরিষদে কোনো রেকর্ড নাই, তিনি খোঁজখবর নিয়ে মেলাটির ঐতিহ্য রক্ষায় পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণ করবেন।
কেকে/এজে