মৌলভীবাজার শহর সংলগ্ন মনু নদের পাড় ঘেঁষে নির্মিত শান্তিবাগ ওয়াকওয়ে এখন যেন এক জীবন্ত ফুলের উদ্যান। বসন্তের আবেশ আর ঋতু পরিবর্তনের ছোঁয়ায় ওয়াকওয়ের পশ্চিম প্রান্ত থেকে পূর্ব সীমা পর্যন্ত ফুটেছে নানা রঙ ও প্রজাতির ফুল, যা প্রতিদিন আকৃষ্ট করছে প্রকৃতিপ্রেমী মানুষকে।
সরেজমিনে দেখা যায়, ওয়াকওয়ের ভেতরে ও বাইরে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গাছের সমারোহ। দুষ্প্রাপ্য সাদা কুরচি, বাটারকাপ ট্রি, মরু ক্যাসিয়া, অশোকমঞ্জরি, কাঠগোলাপ, রাঁধাচূড়া ও কাঞ্চন ফুলের বাহারি সৌন্দর্যে মুখর পুরো এলাকা। মনু নদের বাঁ পাড় ঘেঁষে লাগানো হিজল, করস, জারুল ও কদম গাছ নতুন সবুজ পাতায় সজীব হয়ে উঠেছে।
বিশেষ আকর্ষণ হয়ে উঠেছে সুগন্ধী সাদা কুরচি ফুল। ক্ষুদ্রাকৃতির গাছটিতে সবুজ পাতাকে ছাপিয়ে থোকায় থোকায় ফুটেছে দুধসাদা ফুল। বাতাসে ভেসে থাকা মিষ্টি সুগন্ধ দর্শনার্থীদের মোহিত করছে। কুরচি পাহাড়ি অঞ্চলে বেশি জন্মালেও শহুরে পরিবেশে এ ফুল দুষ্প্রাপ্য। গিরিমল্লিকা নামেও পরিচিত এই গাছের উচ্চতা সাধারণত ১০ থেকে ২০ ফুট পর্যন্ত হয় এবং বর্ষা জুড়েই কয়েক দফা ফুল ফোটে।
প্রকৃতিবিষয়ক লেখক মোকারম হোসেন বলেন, ‘কুরচি বাংলাদেশের বন ও পাহাড়ের দুর্লভ ফুল। নগরের সৌন্দর্যবর্ধনে এই ফুলের পরিকল্পিত রোপণ প্রয়োজন। নিসর্গবিদ দ্বিজেন শর্মার ভাষায়, পলাশ-শিমুলের রং ঝরে যাওয়ার পর প্রকৃতির রঙিন ঘোষণা দেয় কুরচি।’
ওয়াকওয়েতে লাগানো অশোক গাছগুলোতেও এখন কমলা রঙের অশোকমঞ্জরির বাহার। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার স্থানীয় এই বৃক্ষ বসন্ত ও হেমন্তে বেশি ফুল দেয়। পাশাপাশি নজর কাড়ছে বাটারকাপ ট্রি—ঝুলন্ত হলুদ ফুলের ভারে নুয়ে পড়েছে ডালপালা। মরু ক্যাসিয়াতেও চলছে হলুদের উৎসব।
এ ছাড়া কাঞ্চন, রক্তকাঞ্চন, অর্কিড কাঞ্চন ও কাঠগোলাপের গাছজুড়ে গোলাপি, বেগুনি ও সাদা ফুলের সমারোহ দেখা গেছে। বৃষ্টির ছোঁয়ায় নদীর পাড়ের ঝাউ, কদম ও হিজল গাছও সতেজ হয়ে উঠেছে।
ওয়াকওয়েতে আগত দর্শনার্থীরা জানান, শহরের কোলাহল থেকে মুক্তির এক অনন্য জায়গা হয়ে উঠেছে শান্তিবাগ ওয়াকওয়ে। সকালে স্বাস্থ্যসচেতন মানুষ হাঁটতে ও শরীরচর্চা করতে আসেন, আর বিকেলে শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণী ও পরিবার নিয়ে মানুষ সময় কাটাতে ভিড় করেন।
ওয়াকওয়ে গার্ডেনের মালি আপন আহমদ, আতাউর রহমান নয়ন ও ফারাবি আহমদ জানান, এখানে দেশি-বিদেশি ৩৬৪ প্রজাতির গাছ রয়েছে। পাম, বাগানবিলাস, হলুদ শিমুল, কৃষ্ণচূড়া, জাকারান্ডা, মাউন্টেন পিংকসহ বহু বিরল গাছ দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করছে।
ওয়াকওয়ে প্রহরি বিজয় মোদক বলেন, ‘প্রতিদিন সকাল-বিকেলে প্রচুর মানুষ এখানে আসেন এবং ফুলের সঙ্গে ছবি তুলে সময় উপভোগ করেন।’
মৌলভীবাজার পৌরসভা সূত্রে জানা যায়, মনু সেতু এলাকা থেকে প্রধান ডাকঘর পর্যন্ত প্রায় ৮০০ মিটার এলাকাজুড়ে সৌন্দর্যবর্ধনে প্রায় ১০ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। বেঞ্চ, শৌচাগার ও ক্যাফেটেরিয়া সুবিধা যুক্ত হওয়ায় এটি এখন শহরের অন্যতম বিনোদনকেন্দ্র। প্রকৃতি, নদী ও ফুলের সম্মিলনে শান্তিবাগ ওয়াকওয়ে এখন মৌলভীবাজারের প্রাণের ঠিকানা হয়ে উঠেছে।
কেকে/ এমএস