রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে ঘিরে গত কয়েকদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমে তুমুল আলোচনা চলছে। কোথাও বলা হচ্ছে চিকিৎসকরা লাশ জিম্মি করেছিলেন, কোথাও বলা হচ্ছে একজন চিকিৎসকের ওপর হামলার বিচার চাইতেই আন্দোলনে নেমেছিলেন ইন্টার্নরা। কিন্তু আসলে সেদিন ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত কী কী ঘটেছিল?
ঘটনার শুরু রাত ৩টা ৩৫ মিনিটে। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় এক নারী রোগীকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে আনা হয়। প্রাথমিক পরীক্ষা শেষে তাকে হৃদরোগ বিভাগে পাঠানো হয়। রাত ৩টা ৪৬ মিনিটে তার ইসিজি করা হয় এবং কয়েক মিনিটের মধ্যেই কর্তব্যরত চিকিৎসক চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরি করেন। চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী রোগীর অক্সিজেন স্যাচুরেশন ছিল মাত্র ৫৬ শতাংশ। স্বজনদের দ্রুত অক্সিজেন মাস্ক ও প্রয়োজনীয় ওষুধ আনতে বলা হয়। রোগীর ইতিহাস থেকে জানা যায়, তিনি দুই দিন আগেই হার্ট অ্যাটাক করেছিলেন এবং দীর্ঘ সময় পর তাকে হাসপাতালে আনা হয়েছে। পরিস্থিতি অত্যন্ত সংকটাপন্ন হওয়ায় রাত ৪টা ৫ মিনিটে তাকে সিসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে চিকিৎসকরা সিপিআরসহ জরুরি চিকিৎসা দিতে থাকেন। কিন্তু সব চেষ্টা ব্যর্থ করে রাত ৪টা ২০ মিনিটের দিকে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
চিকিৎসকদের দাবি, মৃত্যুর কিছুক্ষণ পর রোগীর ছোট ছেলে হাসপাতালে ফিরে এসে কোনো ধরনের বাকবিতণ্ডা ছাড়াই সিসিইউতে থাকা দুই চিকিৎসকের ওপর অতর্কিত হামলা চালান। এক ইন্টার্ন চিকিৎসক ঘাড়ের পেছনে আঘাত পান এবং পরে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাকে নিউরোসার্জারি বিভাগে ভর্তি করা হয়। হাসপাতাল সূত্রের দাবি, হামলার পর অভিযুক্ত ব্যক্তি হাসপাতাল ছেড়ে চলে যান এবং মায়ের মরদেহ সেখানেই রেখে যান।
সকাল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। তাদের দাবি ছিল, একজন চিকিৎসকের ওপর হামলা চালিয়ে কেউ নির্বিঘ্নে চলে যেতে পারে না। অভিযুক্তকে হাসপাতালে ফিরে এসে ক্ষমা চাইতে হবে এবং তারপরই মরদেহ হস্তান্তর করা হবে। হাসপাতালের নথিতে থাকা ফোন নম্বরে যোগাযোগ করা হলে অভিযুক্তের সঙ্গে কথা হয় বলে দাবি করেন চিকিৎসকরা। কিন্তু তিনি হাসপাতালে ফিরে আসেননি।
এদিকে রোগীর বড় ছেলে হাসপাতালে এসে জানান, তার ভাই ভুল করেছে এবং সে পালিয়ে গেছে। তিনি মরদেহ গ্রহণ করতে চান। কিন্তু ইন্টার্ন চিকিৎসকরা তাদের অবস্থান থেকে সরে আসেননি। তাদের বক্তব্য ছিল, যে ব্যক্তি হামলা করেছে তাকেই এসে ক্ষমা চাইতে হবে। পরে বিষয়টি হাসপাতালের পরিচালক ও প্রশাসনের কাছে যায়। একপর্যায়ে মরদেহ মর্গে স্থানান্তর করা হয় যাতে সংরক্ষণে কোনো সমস্যা না হয়।
ঘটনার মধ্যে নতুন মোড় আসে যখন রোগীর স্বজনরা এবং স্থানীয় কিছু ব্যক্তি লাশ হস্তান্তরের দাবিতে তৎপর হন। বিভিন্ন মহল থেকে হাসপাতাল প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। অন্যদিকে চিকিৎসকরা অভিযুক্তকে হাজির করার দাবিতে অনড় থাকেন। তাদের দাবি ছিল, পুলিশি নিরাপত্তায় তাকে হাসপাতালে এনে ক্ষমা চাইতে বলা হোক।
পরিস্থিতি ক্রমেই উত্তপ্ত হতে থাকে। বাইরে রোগীর স্বজনরা অভিযোগ করতে থাকেন যে চিকিৎসা না পেয়ে রোগীর মৃত্যু হয়েছে এবং পরে মরদেহ আটকে রাখা হয়েছে। অন্যদিকে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের বক্তব্য ছিল, তাদের একমাত্র দাবি চিকিৎসকের ওপর হামলার বিচার এবং প্রকাশ্যে ক্ষমা প্রার্থনা।
শেষ পর্যন্ত প্রশাসনের উদ্যোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে হাসপাতালে আনা হয়। তবে তখন পরিস্থিতি এতটাই উত্তেজনাপূর্ণ ছিল যে তাকে সাধারণ শিক্ষার্থী ও চিকিৎসকদের সামনে আনা সম্ভব হয়নি বলে জানানো হয়। পরে একটি ভিডিও প্রকাশ করা হয় যেখানে দেখা যায় অভিযুক্ত ব্যক্তি ক্ষমা চাইছেন এবং কান ধরে উঠবস করছেন। কিন্তু এতে ক্ষোভ আরও বেড়ে যায়। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ ছিল, তাদের সামনে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ানোর কথা বলা হলেও তা করা হয়নি।
এরপর হাসপাতাল প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। ইন্টার্ন চিকিৎসকরা অভিযোগ করেন, চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন ব্যর্থ হয়েছে। তারা দাবি করেন, ভবিষ্যতেও এমন ঘটনা ঘটলে তাদের নিরাপত্তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। পরিস্থিতির একপর্যায়ে শিক্ষার্থী ও ইন্টার্ন চিকিৎসকরা অনির্দিষ্টকালের জন্য কর্মবিরতির ঘোষণা দেন।