সম্প্রতি আমার এক নিকট আত্মীয় প্রয়াত হয়েছেন। স্ত্রী জানতে চেয়েছেন, স্বামীর নামে কেনা সঞ্চয়পত্রের নমিনি হিসেবে এখন তাঁর করণীয় কী? এ প্রশ্ন অনেকেরই। এ নিয়ে আলোচনা করার আগে সঞ্চয়পত্রসংক্রান্ত কিছু দরকারি তথ্য একঝলক দেখে নেওয়া যাক।
সঞ্চয়পত্রের বিভিন্ন স্কিম : মধ্যবিত্তের নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সঞ্চয়পত্র বিবেচিত হয়। বর্তমানে জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের অধীনে চার ধরনের সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের সুযোগ আছে। এগুলো হচ্ছে পরিবার সঞ্চয়পত্র, পেনশনার সঞ্চয়পত্র, পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র এবং তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র। এর মধ্যে তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রের মেয়াদ তিন বছর। বাকি সব সঞ্চয়পত্রের মেয়াদ পাঁচ বছর। সঞ্চয়পত্রের ক্রেতা প্রাপ্তবয়স্ক এবং বাংলাদেশি নাগরিক হতে হবে। নাবালক বা নাবালকের পক্ষে কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির সঞ্চয়পত্র কেনার বিধান নেই। সঞ্চয়পত্রের স্কিমভিত্তিক ক্রয়সীমা আছে। এই সীমা পরিবার সঞ্চয়পত্রের ক্ষেত্রে ৪৫ লাখ টাকা ও পেনশনার সঞ্চয়পত্রের ক্ষেত্রে ৫০ লাখ টাকা। পরিবার সঞ্চয়পত্র ও পেনশনার সঞ্চয়পত্র যুগ্ম নামে কেনা যায় না। এ ছাড়া তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র এবং পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রের ক্রয়সীমা উভয় ক্ষেত্রে একক নামে ৩০ লাখ টাকা এবং যুগ্ম নামে ৬০ লাখ টাকা নির্ধারণ করেছে সরকার। এ ছাড়া সমন্বিত অর্থাৎ সব স্কিম মিলে বিনিয়োগের ঊর্ধ্বসীমা আছে। পেনশনার সঞ্চয়পত্র বাদে বাকি তিনটি স্কিমে সমন্বিত বিনিয়োগের ঊর্ধ্বসীমা একক নামে ৫০ লাখ টাকা এবং যৌথ নামে ১ কোটি টাকা। আগেই বলা হয়েছে, পেনশনার সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের ঊর্ধ্বসীমা ৫০ লাখ টাকা নির্ধারিত আছে। মুনাফার হার নির্ধারণের সময় পুঞ্জীভূত অর্থাৎ সব স্কিমের মোট বিনিয়োগ বিবেচনাপূর্বক প্রযোজ্য হার নিরূপণ করা হয়।
সঞ্চয়পত্রের মুনাফা : সরকার সঞ্চয়পত্র ইস্যু করে জনগণের কাছ থেকে অর্থ ধার করে। ২০১৯ সালে ‘জাতীয় সঞ্চয় স্কিম অনলাইন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’ চালুর পর সঞ্চয়পত্র কেনা, ভাঙানো ও পুনর্বিনিয়োগ সহজতর হয়েছে। মুনাফার হার নির্ধারণ পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। ছয় মাস পর পর (জানুয়ারি থেকে জুন এবং জুলাই থেকে ডিসেম্বর ভিত্তিতে) সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার পুনর্নির্ধারণ করা হয়। তবে ইস্যুকালীন বিদ্যমান মুনাফার হার বিনিয়োগের পূর্ণ মেয়াদের জন্য বলবৎ থাকে। সঞ্চয়পত্র যেকোনো সময় ভাঙানো যায়। তবে মেয়াদপূর্তির আগে নগদায়ন করা হলে হ্রাসকৃত হারে মুনাফা প্রাপ্য হয়। পরিবার সঞ্চয়পত্র এবং পেনশনার সঞ্চয়পত্রের মুনাফা মাসিক ভিত্তিতে এবং তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রের মুনাফা ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে পরিশোধ করা হয়। আর পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রের মুনাফা পরিশোধ করা হয় মেয়াদান্তে। পুনর্বিনিয়োগের জন্য আবেদন করা না হলে মুনাফাসহ আসল টাকা মেয়াদপূর্তিতে ক্রেতার ব্যাংক হিসাবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জমা হয়। পুনর্বিনিয়োগের ক্ষেত্রে পুনর্বিনিয়োগের তারিখের মুনাফার হার প্রযোজ্য হবে।
ক্রেতা মারা গেলে নমিনির করণীয় : সঞ্চয়পত্রের নমিনি সর্বোচ্চ তিনজন পর্যন্ত নিযুক্ত করা যায়। নাবালককেও নমিনি করা যায়। এ ক্ষেত্রে একজন প্রাপ্তবয়স্ক প্রত্যয়নকারী প্রয়োজন হয়, যার জাতীয় পরিচয়পত্র জমা রাখা হয়। যেকোনো সময় নমিনি পরিবর্তনও করা যায়। সঞ্চয়পত্রের ক্রেতার মৃত্যুর পর নমিনি সঞ্চয়পত্র নগদায়ন করে মুনাফাসহ আসল টাকা গ্রহণ করতে পারেন। নমিনির ব্যাংক হিসাবে এটা জমা হবে। নগদ উত্তোলনের কোনো সুযোগ নেই। নগদায়নের জন্য সঞ্চয়পত্র ইস্যুকারী ব্যাংক বা জাতীয় সঞ্চয় ব্যুরো অফিসে নির্ধারিত ফরমে আবেদন করতে হবে। আবেদনপত্রের সঙ্গে যেসব কাগজপত্র জমা দিতে হবে তার মধ্য আছে; ডাক্তার বা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রদত্ত ক্রেতার মৃত্যুসনদ, জন্ম-মৃত্যুনিবন্ধন কার্যালয় (ইউনিয়ন পরিষদ/সিটি করপোরেশন) প্রদত্ত অনলাইন মৃত্যুসনদ, কবরস্থানের রসিদ/শ্মশানের প্রত্যয়নপত্র, মৃত ব্যক্তির (ক্রেতার) জাতীয় পরিচয়পত্র ও ছবি, নমিনির জাতীয় পরিচয়পত্র ও ছবি, সঞ্চয়পত্রের ফটোকপি, নমিনির ব্যাংক হিসাব নম্বরসহ একটি চেকের পাতার ফটোকপি ও হিসাব বিবরণী। উল্লেখ্য সব ডকুমেন্ট ও ছবি সত্যায়িত হতে হবে। সঞ্চয়পত্র তাৎক্ষণিক নগদায়ন না করে মেয়াদ পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত চলমান রেখে নিয়মমাফিক মাসিক বা ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে মুনাফা গ্রহণ করতে পারবেন নমিনি। তবে এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ আবেদন করতে হবে। মেয়াদান্তে আসল টাকা নমিনির ব্যাংক হিসাবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জমা হবে। তবে এই অর্থ সঞ্চয়পত্রে পুনর্বিনিয়োগের কোনো সুযোগ নেই।
♦ লেখক : সাবেক ব্যাংকার ও প্রাবন্ধিক