ফ্রান্সে বিশ্বকাপ ঘিরে বাংলাদেশীদের উচ্ছ্বাস ও আবেগ

প্যারিসে অধ্যয়নরত বাংলাদেশী শিক্ষার্থী মোহাম্মদ হাসান জানান, ‘বাংলাদেশে থাকাকালে মূলত আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের খেলা দেখতাম। কিন্তু ফ্রান্সে এসে এখানকার ফুটবল ঐতিহ্য ও সমর্থকদের আবেগ আমাকে মুগ্ধ করেছে। এখন ফ্রান্সের ম্যাচও সমান আগ্রহ নিয়ে উপভোগ করি।’

মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন, প্যারিস (ফ্রান্স)
বিশ্বকাপ জয়ে উচ্ছ্বাসে ফরাসি ফুটবল দল
বিশ্বকাপ জয়ে উচ্ছ্বাসে ফরাসি ফুটবল দল |নয়া দিগন্ত

ফুটবল বিশ্বকাপ কেবল একটি আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়, এটি কোটি মানুষের আবেগ, স্বপ্ন ও উচ্ছ্বাসের নাম। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা ফুটবলপ্রেমীদের মতো ফ্রান্সে বসবাসরত বাংলাদেশীরাও বিশ্বকাপকে ঘিরে বিশেষ উৎসাহে মেতে ওঠেন। প্রবাস জীবনের ব্যস্ততা, কর্মব্যস্ত দিনযাপন এবং নানা বাস্তবতার মধ্যেও বিশ্বকাপ এলেই বাংলাদেশী কমিউনিটিতে তৈরি হয় এক ভিন্ন আবহ। মনে হয়, হাজার মাইল দূরে থেকেও তারা বাংলাদেশের সেই চিরচেনা ফুটবল উন্মাদনার অংশ হয়ে উঠেছেন।

ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসসহ সারসেলস, সাঁ-দনি, ওবেরভিলিয়ে, বো-বিনি, মেট্রো ওশ, গার দ্য নর, মার্সেই, লিয়োঁ,স্ট্রাসবুর্গ ও তুলুজের মতো শহরগুলোতে বসবাসরত বাংলাদেশীদের মধ্যে বিশ্বকাপ নিয়ে আলোচনা শুরু হয় আসর শুরুর অনেক আগেই। কে জিতবে বিশ্বকাপ, কোন দল সবচেয়ে শক্তিশালী, কোন খেলোয়াড় সেরা পারফরম্যান্স দেখাবেন এসব নিয়ে চায়ের আড্ডা থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যন্ত সরগরম হয়ে ওঠে। বিশেষ করে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলকে ঘিরে বাংলাদেশীদের আবেগ এখনো আগের মতোই প্রবল। প্রবাসেও এই দুই দলের সমর্থকদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ তর্ক-বিতর্ক ও খুনসুটি বিশ্বকাপের অন্যতম আকর্ষণ হয়ে দাঁড়ায়।

প্যারিসে বসবাসরত ব্যবসায়ী শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘বিশ্বকাপের সময় মনে হয় আবার শৈশবে ফিরে গেছি। বাংলাদেশে বন্ধুদের সাথে রাত জেগে খেলা দেখার স্মৃতি এখনো আমাকে আলোড়িত করে। এখন প্রবাসে থেকেও বন্ধু ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে একসাথে খেলা দেখি।’

তার মতে, বিশ্বকাপ মানুষের মধ্যে দূরত্ব কমিয়ে আনে এবং সবাইকে এক সুতোয় গেঁথে ফেলে।

ফ্রান্সে বসবাসের কারণে অনেক বাংলাদেশীর মধ্যে ফরাসি জাতীয় দলের প্রতিও আলাদা আগ্রহ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ফ্রান্সে জন্মগ্রহণ বা বেড়ে ওঠা বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত তরুণদের প্রথম পছন্দই থাকে ফরাসি জাতীয় দল। তারা নিজেদেরকে একইসাথে ফরাসি সমাজের অংশ এবং বাংলাদেশী সংস্কৃতির ধারক হিসেবে মনে করে। ফলে বিশ্বকাপের মঞ্চে ফ্রান্স থাকলে তাদের বেশির ভাগই দেশটির প্রতি জোরালো সমর্থন জানায়। স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা কর্মস্থলে তারা ফরাসি বন্ধুদের সাথে একাত্ম হয়ে দলের সাফল্য উদযাপন করে।

তবে বিশ্বকাপ থেকে ফ্রান্স বিদায় নিলে সমর্থনের চিত্রে পরিবর্তন আসে। তখন অনেকেই পরিবার ও কমিউনিটির দীর্ঘদিনের আবেগের সূত্র ধরে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের সমর্থকে বিভক্ত হয়ে পড়েন। কেউ আর্জেন্টিনার নান্দনিক ফুটবল ও ঐতিহ্যের প্রতি আকৃষ্ট হন, আবার কেউ ব্রাজিলের আক্রমণাত্মক ও শৈল্পিক খেলায় মুগ্ধ হয়ে তাদের সমর্থন করেন। ফলে বিশ্বকাপের শেষভাগে ফ্রান্সের বাংলাদেশী কমিউনিটিতে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল সমর্থকদের প্রাণবন্ত আলোচনা, বন্ধুত্বপূর্ণ তর্ক এবং উৎসবমুখর পরিবেশ লক্ষ্য করা যায়।

প্যারিসে অধ্যয়নরত বাংলাদেশী শিক্ষার্থী মোহাম্মদ হাসান জানান, ‘বাংলাদেশে থাকাকালে মূলত আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের খেলা দেখতাম। কিন্তু ফ্রান্সে এসে এখানকার ফুটবল ঐতিহ্য ও সমর্থকদের আবেগ আমাকে মুগ্ধ করেছে। এখন ফ্রান্সের ম্যাচও সমান আগ্রহ নিয়ে উপভোগ করি।’

বিশ্বকাপ উপলক্ষে ফ্রান্সের বিভিন্ন বাংলাদেশী সংগঠন ও সামাজিক গোষ্ঠী নানা আয়োজন করে থাকে। কোথাও বড় পর্দায় খেলা দেখার ব্যবস্থা করা হয়, কোথাও আবার বন্ধু ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বিশেষ মিলনমেলার আয়োজন করা হয়। এসব অনুষ্ঠানে শুধু খেলা দেখা নয়, বরং প্রবাসীদের মধ্যে সম্পর্ক আরো দৃঢ় হয়। অনেকের মতে, বিশ্বকাপ তাদের জন্য একটি সামাজিক উৎসব, যেখানে দীর্ঘদিন পর পরিচিতজনদের সাথে দেখা করার সুযোগ তৈরি হয়।

প্রবাস জীবনের নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও ফুটবলের প্রতি বাংলাদেশীদের ভালোবাসা এতটুকু কমেনি। অনেক সময় ম্যাচের সময়সূচি কর্মঘণ্টার সাথে মিলে যায়, ফলে সবাই সরাসরি খেলা দেখতে পারেন না। তবুও কেউ মোবাইলে খেলার আপডেট অনুসরণ করেন, কেউ কাজ শেষে ম্যাচের পুনঃপ্রচার দেখেন। গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলোর সময় অনেকেই ছুটি নেয়ার চেষ্টা করেন বা কাজের সময়সূচি পরিবর্তন করে নেন। ফুটবলের প্রতি এই ভালোবাসাই প্রমাণ করে যে বিশ্বকাপ তাদের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

ফ্রান্স একটি বহুজাতিক ও বহুসাংস্কৃতিক দেশ। এখানে বিভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতিগত পরিচয়ের মানুষ একসাথে বসবাস করেন। বিশ্বকাপের সময় ফুটবল সেই বৈচিত্র্যের মধ্যে একটি সাধারণ ভাষা হিসেবে কাজ করে। বাংলাদেশীরা ফরাসি, আফ্রিকান, আরব এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশের মানুষের সাথে ফুটবল নিয়ে আলোচনা করেন, মতবিনিময় করেন এবং একে অপরের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানার সুযোগ পান। ফলে বিশ্বকাপ শুধু খেলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, এটি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সম্প্রীতি বৃদ্ধির ক্ষেত্রও তৈরি করে।

প্রবাসী বাংলাদেশীদের অনেকেই মনে করেন, বিশ্বকাপ নতুন প্রজন্মকে খেলাধুলার প্রতি আগ্রহী করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। বিশেষ করে ফ্রান্সে বেড়ে ওঠা বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত শিশু-কিশোরদের মধ্যে ফুটবলের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। তারা বিভিন্ন ক্লাবে খেলছে, ফুটবল প্রশিক্ষণ নিচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক ফুটবলের সাথে পরিচিত হচ্ছে। অভিভাবকদের আশা, খেলাধুলা তাদের সুস্থ ও ইতিবাচক জীবন গঠনে সহায়তা করবে।

সব মিলিয়ে ফুটবল বিশ্বকাপ ফ্রান্সে বসবাসরত বাংলাদেশীদের জন্য শুধু একটি ক্রীড়া আসর নয়, এটি আবেগ, স্মৃতি, বন্ধুত্ব এবং সামাজিক সম্প্রীতির এক অনন্য উপলক্ষ। প্রবাসে থেকেও তারা বিশ্বকাপের মাধ্যমে নিজেদের শিকড়, সংস্কৃতি এবং শৈশবের স্মৃতির সাথে নতুন করে সংযুক্ত হন। তাই বিশ্বকাপ এলেই ফ্রান্সের বাংলাদেশী কমিউনিটিতে তৈরি হয় উৎসবের আমেজ, আর প্রিয় দলের জয়ের স্বপ্ন নিয়ে তারা অপেক্ষা করেন ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চের প্রতিটি রোমাঞ্চকর মুহূর্তের জন্য।