সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

প্রাণঘাতীর পরিবর্তে ‘নন-লিথাল’ অস্ত্র ব্যবহারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিএসএফ

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘সীমান্তে বিএসএফের হাতে নিরীহ বাংলাদেশী নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং এটি মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।’

সংসদ প্রতিবেদক

Location :

Dhaka City
সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ
সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ |নয়া দিগন্ত

‘ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কর্তৃক সীমান্তে বাংলাদেশী নাগরিক হত্যা মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন’ উল্লেখ করে এ বিষয়ে জোরালো প্রতিবাদ অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি জানান, প্রাণঘাতী অস্ত্রের পরিবর্তে ‘নন-লিথাল’ বা অমরণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়ে একাধিকবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিএসএফ।

বুধবার (১৭ জুন) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনের (বাজেট) ৯ম দিনে কয়েকজন সংসদ সদস্যের তারকাচিহ্নিত ও লিখিত প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব তথ্য তুলে ধরেন। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন।

সীমান্ত হত্যা মানবাধিকারের লঙ্ঘন

সরকারি দলের মহিলা আসনের সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনির লিখিত প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘সীমান্তে বিএসএফের হাতে নিরীহ বাংলাদেশী নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং এটি মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।’

তিনি জানান, বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের প্রতিটি সীমান্ত সম্মেলনে বিষয়টি অত্যন্ত জোরালোভাবে উত্থাপন করা হয়েছে। দ্বিপক্ষীয় বৈঠকগুলোতে বাংলাদেশ সরকার সীমান্তে আত্মরক্ষার অজুহাতে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের তীব্র বিরোধিতা করেছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘বিএসএফের গুলিতে নিহতদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তার বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক চুক্তি না হলেও প্রতিটি পর্যায়ে জবাবদিহিতা ও ক্ষতিপূরণের বিষয়টি নিয়ে পরোক্ষভাবে চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে।’

তিনি আরো জানান, বাংলাদেশের ধারাবাহিক কূটনৈতিক ও কৌশলগত চাপের মুখে বিএসএফ সীমান্তে প্রাণঘাতী অস্ত্রের পরিবর্তে ‘নন-লিথাল’ বা অমরণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়ে একাধিকবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘সীমান্তে অপ্রীতিকর ঘটনা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে বাংলাদেশ সরকার ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে এবং এ বিষয়ে কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।’

কারাগারে ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি বন্দি

কুমিল্লা-৪ আসনের এনসিপি দলীয় সদস্য মো: আবুল হাসনাতের (হাসনাত আব্দুল্লাহ) প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, গত ৭ জুন পর্যন্ত দেশের ৭৫টি কারাগারের অনুমোদিত ধারণক্ষমতা ৪৫ হাজার ১৩৬ জন। এর মধ্যে পুরুষ বন্দির জন্য ৪৩ হাজার ১০৭ এবং নারী বন্দির জন্য ২ হাজার ২৯টি আসন রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে এসব কারাগারে মোট ৭৭ হাজার ৪০ জন বন্দি আটক রয়েছেন। এর মধ্যে পুরুষ ৭৪ হাজার ৩৬ এবং নারী ২ হাজার ৭৭ জন। অর্থাৎ ধারণক্ষমতার প্রায় ১ দশমিক ৭ গুণ বন্দি বর্তমানে কারাগারগুলোতে অবস্থান করছেন।

তিনি বলেন, অতিরিক্ত বন্দির কারণে কিছু কারাগারে আবাসন সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে। এ সমস্যা নিরসনে বিশেষ কেন্দ্রীয় কারাগার, কেরানীগঞ্জ, সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগার-২, ফেনী জেলা কারাগার-২ এবং খুলনা জেলা কারাগার-২ ইতোমধ্যে চালু করা হয়েছে। এছাড়া কিশোরগঞ্জ জেলা কারাগার-২, মাদারীপুর জেলা কারাগার-২ এবং পিরোজপুর জেলা কারাগার-২ শিগগিরই চালু করা হবে।

মন্ত্রী আরো জানান, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা ও জামালপুর কারাগারের পুনর্নির্মাণ এবং নরসিংদীতে নতুন কারাগারের নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। এসব প্রকল্প শেষ হলে বন্দি ধারণক্ষমতা আরো ২ হাজার ৯৫৫ জন বৃদ্ধি পেয়ে মোট ৪৮ হাজার ১৩১ জনে উন্নীত হবে। এ ছাড়া রাজশাহী, রংপুর, নোয়াখালী, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি কারাগার পুনর্নির্মাণ প্রকল্পও গ্রহণ করা হয়েছে, যা বাস্তবায়িত হলে ধারণক্ষমতা আরো বাড়বে।

প্রবাসীদের পাসপোর্ট ফি কমানোর প্রস্তাব বিবেচনায়

সরকারদলীয় সংসদ সদস্য খায়রুল কবির খোকনের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘প্রবাসী বাংলাদেশীদের জন্য পাসপোর্ট ফি কমানোর বিষয়ে পাসপোর্ট অধিদফতর থেকে প্রাপ্ত একটি প্রস্তাব বর্তমানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পর্যালোচনাধীন রয়েছে।’

তিনি জানান, গত ৪ জুন পর্যন্ত দেশে সক্রিয় পাসপোর্টধারীর সংখ্যা ২ কোটি ৫৪ লাখ ৩৩ হাজার ৬৩ জন।

প্রবাসীদের পাসপোর্ট সেবা সহজ করতে বিভিন্ন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনগুলোতে মোবাইল এনরোলমেন্ট কিট (এমইকে) ব্যবহার করে আবেদন গ্রহণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ মিশনগুলোতে আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পাসপোর্টসেবা দেওয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

দ্রুত পাসপোর্ট পৌঁছে দিতে আন্তর্জাতিক কুরিয়ার প্রতিষ্ঠান ফেডএক্সের মাধ্যমে বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস ও মিশনগুলোতে পাসপোর্ট পাঠানো হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

এ ছাড়া আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসীদের বাসায় পাসপোর্ট পৌঁছে দেয়ার (হোম ডেলিভারি) ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। একই সাথে ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী সব বাংলাদেশী নাগরিকের জন্য ১০ বছর মেয়াদি পাসপোর্ট ইস্যুর ব্যবস্থা ইতোমধ্যে কার্যকর করা হয়েছে।

মাদককারবারিদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান চলমান রয়েছে

‘মাদককারবারিদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান চলমান রয়েছে’ উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৬-২০২৭ অর্থ বছরের প্রথম ৬০ দিনে অবৈধ মাদককারবারিদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হবে। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত সারাদেশে ৩০ হাজার ৭৪৪টি মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করে ৯ হাজার ২৫১টি মামলা দায়ের করে ৯ হাজার ৬৮৫জন মাদক চোরাকারবারীকে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হয়েছে।

সরকারি দলের সদস্য খায়রুল কবির খোকনের (নরসিংদী-১) টেবিলে উত্থাপিত লিখিত প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব তথ্য জানান।

তিনি জানান, মাদকের বিস্তাররোধে মাদক কারবারিদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। মাদকের বিরুদ্ধে বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের কঠোর অবস্থান এবং জিরো টলারেন্স বাস্তবায়নের লক্ষ্যে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের পক্ষ থেকে নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন কর্মকৌশল প্রণয়ন করা হয়েছে। এই কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী উপজেলা/জেলাভিত্তিক অবৈধ মাদক কারবারিদের তালিকা এবং মেট্রোপলিটন এলাকার থানাভিত্তিক মাদক কারবারিদের তালিকা প্রস্তুত/হালনাগাদ করা হচ্ছে।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘বর্তমান সরকার মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে। যেকোনো অপরাধী বা মাদক কারবারিদের তালিকা হালনাগাদ করা একটি চলমান প্রক্রিয়া। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাসমূহ অপরাধীদের তালিকা প্রস্তুত করে পরিকল্পনা মোতাবেক তালিকা হালনাগাদ করে থাকে।

মাদক, অস্ত্র উদ্ধার ও সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের গ্রেফতারের লক্ষে গত ১ মে হতে দেশব্যাপী সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা মোতাবেক বিশেষ অভিযান চলমান রয়েছে বলে তিনি জানান।