‘শ্রমিক অধিকার সুরক্ষায় শ্রম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ ও ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট প্রস্তাবনা, শ্রমজীবী মানুষের প্রত্যাশা ও বাস্তবতা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান সভাপতির বক্তব্যে বলেছেন, দেখলাম শ্রম সংস্কার কমিশন নির্বাচনের আগে দেশের বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের কাছে গেছে, তাদের বক্তব্য গ্রহণ করেছে এবং প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতেহারে শ্রমিক অধিকারের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার জন্য কাজ করেছে। এর ফলে প্রায় সব রাজনৈতিক দলই তাদের ইশতেহারে শ্রমিক অধিকারের বিষয়টি স্থান দিয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন গত ১৮ মে জাতীয় প্রেসক্লাবে শ্রমিকদের বাজেট ভাবনা নিয়ে একটি আলোচনা সভার আয়োজন করেছিল। পরবর্তীতে ২৪ মে একই স্থানে আমরা শ্রমিকবান্ধব বাজেট প্রস্তাবনা উপস্থাপন করি। সেই প্রস্তাবনাগুলো বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক ও গণমাধ্যমে গুরুত্বের সাথে প্রকাশিত হয়েছে।
অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান বলেন, আমরা সরকারকে প্রায় ৩০টি সুপারিশ দিয়েছিলাম, যাতে শ্রমিকদের অগ্রাধিকার দেয়া হয়। এর মধ্যে শ্রমিকদের ডিজিটাল ডাটাবেজ প্রণয়ন, নারী শ্রমিকদের জন্য বাস সার্ভিস চালু এবং ১৫ লাখ জেলে পরিবারকে ভিজিএফ সুবিধার আওতায় আনার বিষয়গুলো বাজেটে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া সামাজিক অবকাঠামো ও নিরাপত্তা খাতে ১ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের কথাও বলা হয়েছে। তবে এর বাইরে শ্রমিকদের ভাগ্য পরিবর্তন, বৈষম্য দূরীকরণ এবং তাদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো বাজেটে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি। বিগত ১০ বছরের বাজেট পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, শ্রমিক খাতে বরাদ্দের ক্ষেত্রে এবারের বাজেট তুলনামূলকভাবে আরো পিছিয়ে রয়েছে।
তিনি বলেন, প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ নতুন শ্রমিক শ্রমবাজারে যুক্ত হচ্ছে। সেই হিসাবে গত ১০ বছরে প্রায় ২ কোটি শ্রমিক যুক্ত হয়েছে। অথচ ১০ বছর আগে শ্রমিক খাতে বরাদ্দ ছিল মোট বাজেটের ০.০০৬ শতাংশ, যা বর্তমানে কমে ০.০০৪ শতাংশে নেমে এসেছে। আমরা যে বৈষম্যহীন বাংলাদেশের প্রত্যাশা করি, এই বাজেট কোনোভাবেই সেই লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক হবে না।
তিনি আরো বলেন, এ বাজেট বাংলাদেশের শ্রমিকদের বাস্তবতা ও প্রয়োজনকে সামনে রেখে প্রণয়ন করা হয়নি। যারা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে বাজেট প্রণয়ন করেন, সেখানে কোনো শ্রমিক প্রতিনিধির অংশগ্রহণ থাকে না। ফলে এটি শ্রমিকবান্ধব নয়, বরং একটি এলিটবান্ধব বাজেটে পরিণত হয়েছে।
তিনি সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের উদ্দেশে বলেন, শ্রমিকদের ভোটে আপনারা এমপি হয়েছেন, মন্ত্রী হয়েছেন। তাই শ্রমিকদের পক্ষে আপনাদের সোচ্চার হতে হবে। যদি শ্রমিকদের পক্ষে কথা না বলেন, তাহলে আমরা বলতে বাধ্য হব—আপনারা শ্রমিকবান্ধব জনপ্রতিনিধি হতে পারেননি।
সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা আশা করি সরকার আমাদের যৌক্তিক দাবিগুলো গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করবে। আমরা জাতীয় বাজেটে শ্রমিক খাতে অন্তত ১০ শতাংশ বরাদ্দের দাবি জানিয়েছিলাম। পাশাপাশি মজুরি সুরক্ষা তহবিল গঠন, পেশাভিত্তিক বীমা চালু এবং শ্রমিকদের জন্য কার্যকর সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার প্রস্তাবও দিয়েছিলাম। কিন্তু এসব দাবির প্রতিফলন এবারের বাজেটে আমরা দেখতে পাইনি।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রধান সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেন, জাতীয় ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ এবং সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার আওতায় কর্মহীন, অবসরপ্রাপ্ত ও বয়স্ক শ্রমিকদের অন্তর্ভুক্ত করা না হলে বাংলাদেশে একটি বৈষম্যহীন ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। আমি মনে করি, এ বিষয়গুলোকে গুরুত্ব না দিলে শ্রমিকদের জীবনের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা যাবে না।
কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক লসকর মো: তসলিমের পরিচালনায় আরো উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি ও বাংলাদেশ রিক্সা-ভ্যান শ্রমিক ঐক্য পরিষদ সভাপতি অধ্যাপক হারুনুর রশিদ, শ্রম সংস্কার কমিশন সদস্য এ এম ফয়েজ আহমদ, লেবার ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক সাকিল আখতার চৌধুরী, কৃষিজীবি শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি গোলাম রব্বানী, পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন সভাপতি কবির আহমদ, দর্জি শ্রমিক ফেডারেশন সভাপতি অ্যাডভোকেট আলমগীর হোসেন, হোটেল ও হাসপাতাল শ্রমিক ইউনিয়ন সভাপতি আব্দুস সালাম, রিক্সা ভ্যান শ্রমিক ঐক্য ফেডারেশন সাধারণ সম্পাদক মাওলানা মহিবুল্লাহ, বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মচারী সমিতির সভাপতি আজহারুল ইসলাম, বাংলাদেশ প্রগতিশীল নির্মাণ শ্রমিকের সভাপতি নুজরুল আমিন, বাংলাদেশ প্রগতিশীল গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশন সভাপতি সোহেল রানা মিঠু, রেলওয়ে এমপ্লয়িজ লীগের সহ-সভাপতি ওমর ফারুক, বিটিসিএল আদর্শ শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি নুরুল ইসলাম, ডিপিডিসির সভাপতি আ ন ম বজলুর রহমান, ডেসকো আউটসোর্সিং সভাপতি আবুল হোসেন, নৌযান শ্রমিক নেতা ওসমান গণি, জামিল মাহমুদ, হাফিজুর রহমান প্রমুখ।


