বি-৫২ বোমারু বিমান : সাত দশক আকাশে দাপিয়ে বেড়ানো ঘাতক

যুক্তরাষ্ট্র এখন নতুন প্রজন্মের বি-২১ রেইডার বোমারু বিমান তৈরি করছে, যা স্টিলথ প্রযুক্তিনির্ভর এবং রাডারে ধরা পড়া কঠিন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, বি-২১ আসার পরও বি-৫২ অবসর নিচ্ছে না। বরং পরিকল্পনা রয়েছে, এই বিমানকে আধুনিক করে ২০৫০ সালের পরেও ব্যবহার করার।

নয়া দিগন্ত অনলাইন

মার্কিন সময় ১৫ মে। সোমবার। সময় ১১টা ২০ মিনিট। ক্যালিফোর্নিয়ার মোজাভে মরুভূমির এডওয়ার্ডস বিমানঘাঁটি তখনো পুরোপুরি গরমে ঝলসে ওঠেনি। নিয়মিত পরীক্ষামূলক মিশনের অংশ হিসেবে রানওয়ে ছাড়ে মার্কিন বিমানবাহিনীর একটি বি-৫২ স্ট্র্যাটোফোর্ট্রেস বোমারু বিমান। উদ্দেশ্য ছিল নতুন প্রজন্মের এইএসএ রাডার সিস্টেম পরীক্ষা করা। কিন্তু উড্ডয়নের ঠিক পরপরই ঘটে বিপর্যয়। বিমানের ভেতরে আগুন ধরে যায়। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বিশাল দেহের বিমানটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রানওয়ের ওপর আছড়ে পড়ে। মুহূর্তেই পুরো কাঠামো আগুনে ঢেকে যায়। আকাশে উঠে যায় ঘন কালো ধোঁয়া, যা বহু মাইল দূর থেকেও দেখা যাচ্ছিল। পরে উপগ্রহ ও আকাশ থেকে ধারণ করা ছবিতে দেখা যায় রানওয়ের একটি বড় অংশ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে এবং বিমানটির প্রায় কিছুই অবশিষ্ট নেই।

এই দুর্ঘটনায় বিমানে থাকা আটজন আরোহী নিহত হন। তাদের মধ্যে ছিলেন সামরিক কর্মকর্তা, সরকারি বেসামরিক কর্মী এবং প্রতিরক্ষা ঠিকাদাররা। মার্কিন বিমানবাহিনীর ৪১২তম টেস্ট উইংয়ের ডেপুটি কমান্ডার কর্নেল জেমস হেইস একে “ভয়াবহ ট্র্যাজেডি” হিসেবে বর্ণনা করেন এবং জানান যে এমন দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে ফেরার সম্ভাবনা কার্যত ছিল না। দুর্ঘটনার পরপরই তদন্ত শুরু হয় এবং জানানো হয় যে চূড়ান্ত প্রতিবেদন আসতে ছয় মাস বা তার বেশি সময় লাগতে পারে।

এই ঘটনাটি শুধু একটি সামরিক দুর্ঘটনা নয়, বরং আবারও আলোচনায় এনে দিয়েছে এমন এক বিমানকে, যা আধুনিক যুদ্ধের ইতিহাসে একই সঙ্গে বিস্ময়, শক্তি এবং বিতর্কের প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। সেই বিমানটির নাম বি-৫২ স্ট্র্যাটোফোর্ট্রেস।

বি-৫২ স্ট্র্যাটোফোর্ট্রেসের জন্ম শীতল যুদ্ধের উত্তাল সময়ে। ১৯৫০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের পারমাণবিক প্রতিযোগিতা যখন চরমে, তখন এমন একটি বোমারু বিমানের প্রয়োজন হয় যা এক মহাদেশ থেকে আরেক মহাদেশে গিয়ে ভারী অস্ত্র, এমনকি পারমাণবিক বোমা বহন করে আঘাত হানতে পারে। সেই কৌশলগত প্রয়োজন থেকেই তৈরি হয় বি-৫২। প্রথম উড্ডয়ন হয় ১৯৫২ সালে এবং ১৯৫৫ সালে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে মার্কিন বিমানবাহিনীতে যুক্ত হয়। মোট ৭৪৪টি বিমান তৈরি করা হয়েছিল এবং এর একটি সংস্করণ, বি-৫২এইচ, এখনো সক্রিয়ভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। “স্ট্র্যাটোফোর্ট্রেস” নামের অর্থ আকাশের দুর্গ । নামটি এই বিমানের বিশাল আকার ও বহনক্ষমতার সঙ্গে পুরোপুরি মানানসই।

B-52---2

বি-৫২ স্ট্র্যাটোফোর্ট্রেসের বিমানের ডানার বিস্তার প্রায় ৫৬ মিটার এবং দৈর্ঘ্য প্রায় ৪৯ মিটার। এটি একবার জ্বালানি নিয়ে প্রায় ১৪ হাজার ১৬০ কিলোমিটার পর্যন্ত উড়তে পারে। আকাশে জ্বালানি পুনরায় গ্রহণ করলে এর কার্যত পাল্লা পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে পৌঁছাতে সক্ষম হয়। একটি বি-৫২ প্রায় ৩২ হাজার কিলোগ্রাম পর্যন্ত অস্ত্র বহন করতে পারে। এতে প্রচলিত বোমা, স্মার্ট বোমা এবং ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র বহনের ক্ষমতা রয়েছে। এই বিশাল ক্ষমতার কারণে একে অনেক সময় “উড়ন্ত অস্ত্রাগার” বলা হয়।

বি-৫২ এত পুরোনো হওয়া সত্ত্বেও এখনো কেন ব্যবহৃত হচ্ছে, এর উত্তর হলো ধারাবাহিক আধুনিকীকরণ এবং কৌশলগত প্রয়োজন। বিমানটির কাঠামো পুরোনো হলেও এর রাডার, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং অস্ত্র ব্যবহারের সক্ষমতা বহুবার আপগ্রেড করা হয়েছে। আজকের যুদ্ধে এটি আর শত্রুর আকাশসীমার ভেতরে ঢুকে বোমা ফেলে না, বরং দূর থেকে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে আঘাত হানে। এই কারণে পুরোনো হওয়া সত্ত্বেও এটি এখনো কার্যকর।

ভিয়েতনাম যুদ্ধ এই বিমানের ইতিহাসে সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায়। ১৯৭২ সালের “অপারেশন লাইনব্যাকার টু”-এর সময় উত্তর ভিয়েতনামের ওপর ব্যাপক বোমাবর্ষণ করা হয়, যেখানে বি-৫২ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। হাজার হাজার টন বোমা ফেলা হয় শহর, গ্রাম এবং অবকাঠামোর ওপর। এই ধরনের হামলাকে “কার্পেট বোমিং” বলা হয়, যেখানে পুরো এলাকা একসাথে বিস্ফোরণে ঢেকে ফেলা হয়। সমর্থকদের মতে এটি যুদ্ধ শেষ করার কৌশল ছিল, কিন্তু সমালোচকদের মতে এতে বিপুল সংখ্যক বেসামরিক মানুষ নিহত হন এবং ব্যাপক মানবিক বিপর্যয় ঘটে।

এরপর ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধেও বি-৫২ ব্যবহৃত হয়। ইরাকের বিরুদ্ধে জোট বাহিনীর অভিযানে দূর থেকে বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়। ২০০১ সালে আফগানিস্তান যুদ্ধ এবং ২০০৩ সালের ইরাক আক্রমণেও এই বিমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পাহাড়ি অঞ্চল থেকে শুরু করে শহুরে এলাকা পর্যন্ত বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে এটি ব্যবহার করা হয়।

ইরানকে ঘিরে উত্তেজনার সময়ও বি-৫২ বারবার মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা হয়েছে। এটি অনেক সময় সরাসরি যুদ্ধের প্রস্তুতির চেয়ে বেশি ছিল রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরির একটি মাধ্যম। তবে ইরানের সাবেক রাহবার আলী খামেনির বাসভবনে বি-৫২ দিয়ে হামলা হয়েছে এমন কোনো নির্ভরযোগ্য বা আনুষ্ঠানিক প্রমাণ নেই। বাস্তবে এটি মূলত সম্ভাব্য সামরিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়, সরাসরি সংঘটিত ঘটনা নয়।

এই দীর্ঘ ইতিহাসের পাশাপাশি বি-৫২ বহু দুর্ঘটনারও সাক্ষী। গোল্ডসবোরো, পালোমারেস এবং থুলে ঘাঁটির মতো ঘটনায় পারমাণবিক অস্ত্রবাহী বিমান দুর্ঘটনার মুখে পড়েছিল, যা শীতল যুদ্ধের সময় বড় ধরনের উদ্বেগ সৃষ্টি করেছিল। বিভিন্ন সামরিক গবেষণা অনুযায়ী, এর ইতিহাসে কয়েক ডজন বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে বহু বিমান সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে।

বর্তমানে বি-৫২ সাধারণত পাঁচ থেকে আটজন ক্রু নিয়ে পরিচালিত হয়। এতে ইজেকশন সিট রয়েছে। তবে সব পরিস্থিতিতে এটি কার্যকর নয়। বিশেষ করে কম উচ্চতায় বা উড্ডয়নের সময় দুর্ঘটনা ঘটলে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা খুব সীমিত। এডওয়ার্ডস ঘাঁটির সাম্প্রতিক দুর্ঘটনাও সেই বাস্তবতাই আবার সামনে এনেছে।

এই বিমানের দাম নির্ধারণ করা কঠিন, কারণ এটি এখন আর নতুন করে তৈরি হয় না। তবে শেষ দিকের সংস্করণগুলোর উৎপাদনমূল্য ছিল প্রায় ৯ থেকে ১০ মিলিয়ন ডলার। মূল্যস্ফীতি ধরলে বর্তমানে একটি নতুন বি-৫২ তৈরি করতে শত মিলিয়ন ডলারেরও বেশি খরচ হতে পারে। এটির আধুনিকীকরণ কর্মসূচিতে ইতোমধ্যে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র এখন নতুন প্রজন্মের বি-২১ রেইডার বোমারু বিমান তৈরি করছে, যা স্টিলথ প্রযুক্তিনির্ভর এবং রাডারে ধরা পড়া কঠিন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, বি-২১ আসার পরও বি-৫২ অবসর নিচ্ছে না। বরং পরিকল্পনা রয়েছে, এই বিমানকে আধুনিক করে ২০৫০ সালের পরেও ব্যবহার করার।

এডওয়ার্ডস ঘাঁটির সাম্প্রতিক দুর্ঘটনা আবারো একটি প্রশ্ন সামনে এনেছে—এত পুরোনো একটি যুদ্ধবিমানকে কতদিন আকাশে রাখা উচিত। কিন্তু ইতিহাস বলছে, বি-৫২ শুধু একটি বিমান নয়, এটি শীতল যুদ্ধ থেকে শুরু করে আধুনিক ভূরাজনীতি পর্যন্ত বিস্তৃত এক দীর্ঘ সামরিক ইতিহাসের উড়ন্ত সাক্ষী, যা এখনো আকাশে উড়ে চলেছে এবং সম্ভবত আরও বহু বছর উড়তে থাকবে। তবে পাশাপাশি এও বলছে, যতদিন এটি উড়বে, ততদিন বি-৫২ শুধু একটি বিমান থাকবে না। এটি থাকবে আধুনিক যুদ্ধ, শক্তি রাজনীতি এবং আকাশে মানুষের আধিপত্যের এক দীর্ঘ, অস্বস্তিকর স্মারক হিসেবে।

সূত্র : মার্কিন বিমানবাহিনীর তথ্যপত্র, এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা